শিশুদের থ্যালাসেমিয়া রোগ

Print
থ্যালাসেমিয়া একটি জন্মগত ত্রুটি, বংশগত রোগ।এই রোগে “এডাল্ট হিমোগ্লোবিন” পরিমাণ মতো তৈরি হতে পারে না। শিশুর এই অসুখের জন্য মা এবং বাবা সমান অংশে দায়ী। মা এবং বাবা দু’জনই বৈশিষ্ট্যগুলো “জিন” নামক এককের সাহায্যে সন্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয়। মা এবং বাবা প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রাপ্ত অসুস্থ “জিন” নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুটি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়ে থাকে। জন্মের সময় শিশুটি সুস্থই থাকে কিন্তু থ্যালাসেমিয়ার প্রকাশ ও তীব্রতাভেদে ৪-৬ মাস হতে ৩-৪ বছর বয়সের মধ্যে শিশুটি ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তার কর্ম চাঞ্চল্য কমতে থাকে। এর সাথে ৬-৭ মাস বয়স থেকে শিশুটির প্লীহা ক্রমশ বড় হতে থাকে। ঠিকমত চিকিৎসা শুরু না করলে চেহারার মধ্যে একটু একটু পরিবর্তন আসে। কপালের সামনে ও মাথার দু’পাশে খানিকটা উঁচু দেখায়। হাড় পাতলা হয়ে যেতে পারে। চেহারায় একটা হলদে ভাব দেখা যায়। শরীরের ডিফেকটিভ লোহিত কণিকাগুলো অত্যধিক হারে ভেঙে গিয়ে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেবার কারণে কখনো কখনো জন্ডিস দেখা যায়। তবে এটা ছোঁয়াছে নয়। শিশুর ঠিকমতো বৃদ্ধি হয় না। এ রোগের জন্য ডাক্তাররা রক্ত পরীক্ষা করতে বলেন। রক্তের হিমোগ্লোবিন, ব্লাডফিল্ম, এইচবি ইলেট্রোপরেসিস, হাতের ও মাথার এক্সরে করিয়ে এ রোগের ধারণা পাওয়া যায়। রক্তের ফিল্মের মাইক্রোসাইটক হাইপোক্রোমিক এনিমিয়া ও এর সাথে নরমোব্লাস্ট দেখা দেয় এবং উচ্চমাত্রার রেটিলোসাইট দেখা যায়। শিশুর থ্যালাসেমিয়া ডায়গনোসিস ও সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অবশ্যই জেনেটিক জ্ঞানসম্পন্ন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত।
চিকিৎসা : শিশুর রক্তশূন্যতা বা শিশু ফ্যাকাশে হয় বলে রক্ত বাড়ানোর চেষ্টায় বিভিন্ন ধরনের আয়রন সিরাপ বা অনেকের কাছে রক্তের সিরাপ বলে বিবেচিত শিশুকে খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়, যা থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্য মারাত্মকরকমের ক্ষতিকর। শিশুকে আয়রন সমৃদ্ধ কোন খাবার খেতে দেয়া যাবে না। যেমন-কলিজা, মাংস, কলা ইত্যাদি। শিশুকে রং-চা খেতে দেবেন। বিশেষ করে আহারের পর পর। কেননা বারংবার রং চা কিংবা কফি শরীরে লোহা শোষণে বাধা দেয়। প্রেসক্রিপশনে ফলিক এসিড প্রয়োজন। জিংক দিতে পারলে ভালো। মাল্টিভিটামিন দেয়া যেতে পারে। শিশুকে হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন দেয়া উচিত। কারণ, এসব শিশুকে প্রায়ই রক্ত দিতে হয় এবং কিছুদিন অন্তর অন্তর রক্ত দেয়াই এ রোগের প্রধান চিকিৎসা। সাধারণভাবে ৮/১০ সপ্তাহ পর পর রক্তের সঞ্চালন করে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ৮-১০ গ্রামের উপরে রাখতে হয়। এভাবে রক্ত চেহারার পরিবর্তন হওয়া, প্লীহা ও যকৃত অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়া থেকে রোধ করা যায়। তবে রক্ত দেয়ার ব্যাপারে কতগুলি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন প্রফেসনাল রক্তদাতার কাছ থেকে রক্ত দেয়া উচিত নয়। হেপাটাইটিস-বি এইডস জীবাণুমুক্ত প্যাকসেল রক্ত যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে দেহে প্রবেশ করাতে হবে। হার্টফেলিওরের আশংকা থাকলে আস্তে আস্তে ট্রান্সফিউশন দেওয়া দরকার। বার বার এভাবে রক্ত দিতে দিতে শরীরে আয়রনের মাত্রা খুব বেড়ে যায়। প্রতিব্যাগ রক্তের মাধ্যমে ২০০ মিলিগ্রাম লোহা শরীরে প্রবেশ করে যা শরীরের কোন কাজে লাগে না। বরং শরীরের লিভার, অগ্ন্যাশয় ও অন্যান্য বিভিন্ন জায়গায় জমে গিয়ে অনেক অসুখের সৃষ্টি করে তার ক্ষতি সাধন করে। যেমন-ব্রোঞ্জ রঙের চামড়া, হার্টফেলিওর, ডায়বেটিস দেখা দিতে পারে। রক্তের এই লোহাকে শরীর থেকে বের করে দেবার জন্য নতুন নতুন ওষুধ বের হয়েছে। মুখে খাওয়া ও ইনফিউশন পাম্পের সাহায্যে শরীর থেকে লোহা বের করার ওষুধ খুবই সুফল পাওয়া যাচ্ছে। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীকে ঘন ঘন রক্তদানের কারণে শরীরে হার্ট ও অন্যান্য জায়গায় অপ্রয়োজনীয় পানি জমা হতে পারে, তাই প্রতিবার রক্ত সঞ্চালনের শেষের দিকে লেসিকজাতীয় ইনজেকশন দিতে হবে রোগীর শিরায়। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন হচ্ছে এ রোগের সম্পূর্ণ নিরাময়কারী নির্দিষ্ট চিকিৎসা। শিশুকে রক্ত দেয়ার পূর্বে তা করা হলে ৫০/৭০ ভাগ ক্ষেত্রেই ভাল ফল পাওয়া যায় তবে আমাদের দেশে তা এখনো সাধ্যাতীত রয়ে গেছে। সফল অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ব্যতীত অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সাহায্যে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে ফলোআপ চিকিৎসা ও সঠিকভাবে রক্ত সঞ্চালন, শরীরে লোহার পরিমাণ সঠিক রাখলে এসব রোগী দীর্ঘজীবন লাভ করে। থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসা ব্যয়সাপেক্ষ। এ জন্য সন্তানের জন্মের পর থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসা করিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করার চেয়ে অনেক বেশি শ্রেয় এরকম একটি শিশুর জন্ম না হতে দেয়া। অসুখটি নতুন নয়। শুধুমাত্র সামাজিক সচেতনতার সাহায্যে ভাবী পিতামাতারা যথেষ্ট সংখ্যক এগিয়ে এলেই এ রোগে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিবাহে প্রস্তুত নারী ও পুরুষ উভয়েরই উচিত বিয়ের আগে নিজেদের রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নেয়া। যদি তাদের মধ্যে এ রোগের জিন থাকে অর্থাৎ তারা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাদের মধ্যে কখনই বিবাহ হওয়া উচিত নয়। এটাও যদি কেউ করেন তাদের জন্য আরো একটি ব্যাপারের ওপর বর্তমানে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। সেটা হলো ইনট্রাইউটেরাইন ডায়াগনোসিস। গর্ভাবস্থায় ৮-১০ সপ্তাহের মধ্যে জরায়ুর ভিতরকার ভ্রুণ থেকে এক ফোঁটা রক্ত বের করে তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। এতে যদি এই রোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে স্বামী ও স্ত্রীকে গর্ভপাতের পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। প্রত্যেকবার গর্ভাবস্থায় এ পরীক্ষাটা করতে হবে। মনে রাখতে হবে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ সম্ভাবনা থাকে না এ রোগ নিয়ে জন্মাবার।
মা-বাবার প্রতি অনুরোধ : একটি অসুস্থ শিশু যদি জন্মেই থাকে তাহলে যতœ ও চিকিৎসার ব্যাপারে দুজনকেই দৃষ্টি দিতে হবে। দুজনের রয়েছে সমান দায়িত্ব। কেননা, এ রোগের জন্য শুধুমাত্র মাকে দায়ী করা যাবে না। বাবাও সমভাবে অংশীদারি। বাচ্চাকে সর্বদা হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করতে হবে। যাতে সে তার অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে না পারে। প্রয়োজনে পুনরায় সন্তান গ্রহণে বিরত থাকুন। কিন্তু সন্তান গ্রহণ করার প্রয়োজন দেখা দিলে গর্ভাবস্থায় প্রথম দিকে ভ্রুণ পরীক্ষা করে গর্ভস্থ সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত নয় নিশ্চিত হোন। অন্যথায় আরো একটি অসুস্থ সন্তানের আগমন পুরোপুরিভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে আপনার সংসার জীবন। চট্টগ্রামে ৬৫, জামালখান রোডে থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে থ্যালাসেমিয়া সেবা কেন্দ্র-বাংলাদেশ নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী চিকিৎসালয়। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর অভিভাবকদের এ কেন্দ্রের সেবা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে করে এসব শিশুর জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নেয়া যায়।

ষ প্রফেসর ডা. মাহমুদ এ. চৌধুরী আরজু ফেলো: থ্যালাসেমিয়া রোগ (ইউকে), বিভাগীয় প্রধান, ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, প্রধান ফিজিশিয়ান (অবৈতনিক), থ্যালাসেমিয়া সেবা কেন্দ্র-বাংলাদেশ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 281 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ