সরকারি হাসপাতালে স্বস্তি বেসরকারিতে সংকট

Print

দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোয় নার্সের তীব্র সংকট ছিল। এ সংকট কাটাতে চলতি মাসে সাড়ে ৯ হাজার নার্স নিয়োগ দেয় সরকার। সরকারি চাকরি নিয়ে রাজধানীর নামিদামি বেসরকারি প্রায় ১০টি হাসপাতাল থেকে কয়েকশ’ নার্স চলে গেছেন। এ থেকে বাদ যায়নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ও। স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় এ হাসপাতাল থেকেও প্রায় দেড়শ’ নার্স সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। প্রশিক্ষিত নার্স না থাকায় হার্ট, কিডনিসহ জটিল রোগের অস্ত্রোপচারে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন সত্ত্বেও কয়েকটি হাসপাতাল রোগীদের অস্ত্রোপচার দু’তিন মাস পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুসারে সরকার চলতি মাসে সাড়ে ৯ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়ে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় পদায়ন করেছে। সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে নার্সদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা স্বভাবতই খুশি। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান বাড়তে শুরু করেছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সরকারি হাসপাতালে নার্সের তীব্র সংকট ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাড়ে ৯ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একযোগে এত সংখ্যক নার্স নিয়োগ দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম। এ নিয়োগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি রক্ষার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকার যে বদ্ধপরিকর তারও প্রমাণ দেওয়া হলো।
ধাপে ধাপে নার্স নিয়োগ করা হলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় সংকট সৃষ্টি হতো না_ বিশেষজ্ঞদের এমন অভিমত তুলে ধরে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ওই প্রক্রিয়ায় আগামী পাঁচ বছরেও এত সংখ্যক নার্স নিয়োগ দেওয়া যেত না। বেসরকারি হাসপাতালে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা সাময়িক। নতুন নার্স নিয়োগ দিয়ে তারা বর্তমান সংকট দূর করতে পারবেন বলে মনে করেন মন্ত্রী।
রাজধানীর ১০টি বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার একযোগে সাড়ে ৯ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়ায় তাদের প্রতিষ্ঠানে সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন সেবার সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষিত নার্সরা চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। এসব নার্সের হার্টের ভাল্ভ লাগানো, রিং পরানো, বাইপাস সার্জারি, আইসিইউ, সিসিইউসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় সহায়তা করতে উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছিল। এ জন্য তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নার্সদের বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ায় সংকটে পড়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞ নার্সদের অনেককেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমন সব হাসপাতালে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের সেবাদানের কোনো সুযোগই নেই।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুল মালিক বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের নার্সরা বিশেষায়িত রোগের ওপর বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। দু-তিন বছর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের গড়ে তোলা হয়েছিল। এই প্রশিক্ষিত নার্সরা চলে যাওয়ায় তাদের প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা বিঘি্নত হচ্ছে। জরুরি অস্ত্রোপচার বিঘি্নত হচ্ছে। নতুন নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া চললেও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলতে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগবে।
সংকট নিরসনে ধাপে ধাপে নার্স নিয়োগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি এবং বেসরকারি সব হাসপাতালই মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিবেদিত। ফলে সরকার একযোগে এত নার্স নিয়োগ না দিয়ে ধাপে ধাপে দিলে বেসরকারি হাসপাতালও ধাপে ধাপে নার্স নিয়োগ দিয়ে এ সংকট দ্রুত মোকাবেলা করতে পারত।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠান বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে প্রায় দেড়শ’ নার্স সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আজাদ খান বলেন, সরকারি চাকরি হলে কাউকে তো আর আটকে রাখা যায় না। প্রশিক্ষিত নার্স চলে যাওয়ায় অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদেরও সমস্যা হচ্ছে। তবে সমস্যা মোকাবেলায় আমরা আগে থেকে নার্স নিয়োগের পদক্ষেপ নিয়েছি। তাদের দিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।
স্কয়ার হাসপাতালের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ডা. মোহাম্মদ ফয়সাল জামান বলেন, স্কয়ার হাসপাতাল থেকে প্রায় দুইশ’ নার্স চাকরি ছেড়েছেন। তারা নতুন করে নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন। বর্তমানে সেবা স্বাভাবিক রাখতে কর্মরত নার্স ও কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। সেবা নিশ্চিত করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ল্যাবএইড হাসপাতালের সহকারী মহাব্যবস্থাপক সাইফুর রহমান লেলিন বলেন, যেসব নার্স বেসরকারি চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, তাদের সবাই প্রশিক্ষিত ছিলেন। রাতারাতি কোনো প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারে না। ছয় মাস থেকে এক বছর লাগবে এ সংকট উত্তরণে। রোগী সেবায় উপযোগী করতে দ্রুততার সঙ্গে নার্স নিয়োগ দিয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।
হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকেও অনেক প্রশিক্ষিত দক্ষ নার্স সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। এদিকে ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, তাদের হাসপাতালে আইসিইউ, সিসিইউ ও কার্ডিয়াক ইউনিটে কাজ করতেন এমন প্রায় ১০ জন নার্স সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি। গ্রামের যেসব হাসপাতালে তাদের পদায়ন করা হয়েছে, সেখানে বিভাগ এবং কাজ না থাকায় তারা যোগদান করেননি। আবার অভিজ্ঞ ক’জনকে বাড়তি বেতন দিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে। তার পরও প্রায় দুইশ’ নার্স তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে চলে গেছেন। অন্যদের মতো তাদেরও সমস্যা হচ্ছে।
স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকেও প্রায় দেড়শ’ নার্স চাকরি ছেড়ে সরকারি হাসপাতালে যোগদান করেছেন। বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল হঠাৎ চলে যাওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে নার্সিং শিক্ষার্থীদের দিয়ে সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে নার্স নিয়োগের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে পদায়ন করা ক’জন নার্সের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক নার্সকে গ্রামের কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। সেখানে তারা কোনো কাজ করতে পারছেন না। এতে পদায়নকৃত নার্সরা কোনো কাজে লাগছেন না। রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আইসিইউতে কাজ করতেন এমন একজন নার্সকে ভোলার মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদায়ন করা হয়েছে। এ ধরনের আরও কয়েকশ’ নার্সকে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পদায়ন করা হয়েছে। যে বিষয়ে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে, ওই কর্মস্থলে সে ধরনের কাজ নেই। আবার মেডিকেল কলেজে পদায়ন করা অনেক নার্সের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
সেবা পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে নিয়োগ দেওয়া ৯ হাজার ৪৭৮ নার্সের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৯৭৬ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৬৯৫ জন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৪৮৫ জন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৩৮৩ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৩৩১ জন, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৩১৬ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২০৫ জনসহ সারাদেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নার্সদের পদায়ন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার বলেন, একযোগে অধিকসংখ্যক নার্স নিয়োগ এবং পদায়নের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। এখন যাচাই-বাছাই চলছে। বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সদের নিজ নিজ কাজের জায়গায় বদলি করার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। তখন আর কোনো সমস্যা থাকবে না বলে মনে করেন তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 152 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি