সরকারি ৮ হাসপাতালে দুই কাজীর রাজত্ব

Print

তৎপর ২০ ঠিকাদার ও তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী

রাজবংশী রায়

সন্ত্রাসীদের কবল থেকে রক্ষা পেতে লাইসেন্স করা অস্ত্র ব্যবহার করেন সরকারি একটি হাসপাতালের পরিচালক। আউটসোর্সিং, পথ্য, যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন কেনাকাটা নিয়ে প্রভাবশালী ঠিকাদার ও তাদের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো এতই মারমুখো যে, আশঙ্কিত তিনি। শুধু এই একটি নয়_ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার আটটি সরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষকেই তটস্থ থাকতে হয় এসব ঠিকাদার ও তাদের সন্ত্রাসীদের ভয়ে। বিভিন্ন সরবরাহ কাজ নিয়ে এসব হাসপাতালে তৎপর রয়েছে অন্তত ২০ জন ঠিকাদার ও তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী। এ নিয়ে হামেশাই সংঘর্ষ ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। তবে সবাইকে পেছনে ফেলে এসব হাসপাতালে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন দুই সহোদর ঠিকাদার কাজী কবিরুল ইসলাম ও কাজী জাহিদ হাসান তারিফ। অন্য ঠিকাদাররাও ভীতসন্ত্রস্ত তাদের নিয়ে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব হাসপাতালের প্রায় ৯০ শতাংশ ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে তারা বলেছেন, ‘আমরা সরকারি নিয়মকানুন মেনেই দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ করে থাকি।’
জাতীয় কিডনি ডিজিজেস ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ইউরোলজির পরিচালক অধ্যাপক ডা. নূরুল হুদা লেলিন  জানান, দরপত্র আহ্বান করার পর বিভিন্ন অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে কাজ চেয়ে একাধিকবার তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি তার ছেলে কোথায় পড়েন, স্ত্রী কোথায় চাকরি করেন_ এসব উল্লেখ করে কাজ না দিলে তাদেরও হত্যা করা হবে বলে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। ঠিকাদারদের হুমকিসহ কেনাকাটা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মজনিত সমস্যায় প্রায় দেড় বছর আগে

পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন একই হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রফিকুল আবেদীন। তিনি  বলেন, ‘শুধু কিডনি হাসপাতাল নয়, শেরেবাংলা নগরের সব সরকারি হাসপাতালেরই একই অবস্থা। এ হাসপাতালগুলোতে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা চ্যালেঞ্জিং। কয়েকটি ঠিকাদার গ্রুপের ভয়ে পরিচালক ও চিকিৎসকদের ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে হয়। এ কারণে অনেকে দায়িত্ব নেন না। নিলেও বেশি দিন থাকতে পারেন না।’

এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শেরেবাংলা নগর এলাকার হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বস্তি ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছেন। এর পর ওই এলাকার পরিবেশ ভালো হয়েছে। হাসপাতালকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা থাকলে পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে তা সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি।

শতকোটি টাকার কেনাবেচা :সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলো থেকে জানা গেছে, হৃদরোগ হাসপাতালে বছরে খাদ্য বাবদ প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখ, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচারে প্রায় ছয় কোটি, মেডিসিনে প্রায় দুই কোটি এবং আউটসোর্সিংয়ে প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পথ্যে প্রায় দেড় কোটি, কেমিক্যাল ও এমএসআরে প্রায় সোয়া দুই কোটি, আউটসোর্সিংয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার বরাদ্দ থাকে। কিডনি হাসপাতালে বরাদ্দ থাকে পথ্যে প্রায় ৪৫ লাখ, কেমিক্যাল ও এমএসআরে এক কোটি ২০ লাখ, ফার্নিচারে ৪০ লাখ টাকা এবং আউটসোর্সিং বাবদ ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে প্রায় দুই কোটি টাকা, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) পথ্য, আউটসোর্সিং, ফার্নিচারসহ প্রায় এক কোটি টাকার বিভিন্ন কাজ থাকে। নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালে প্রায় ৭০ লাখ টাকার খাবার এবং প্রায় ৫০ লাখ টাকার ফার্নিচার; টিবি হাসপাতালে আউটসোর্সিং বাবদ প্রায় ৩০ লাখ টাকা, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে খাদ্য বাবদ প্রায় ৩০ লাখ টাকার পণ্যসামগ্রীসহ বছরে প্রায় শতকোটি টাকার কেনাকাটা করা হয়।

কাজীদের দাপট : শেরেবাংলা নগর থানার ২৭ নম্বর ওয়ার্ড শাখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তারিক হাসান কাজল, দুই সহোদর কাজী কবির এবং কাজী তারিফ, রুবেল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মোহাম্মদ টিটুল, খলিলুর রহমানসহ অন্তত ২০ জন ঠিকাদার এসব হাসপাতালে পথ্য ও দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহের কাজ করেন। তবে ৯০ শতাংশ সরবরাহের কাজ হয় কাজী সহোদরদের প্র্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কাজী এন্টারপ্রাইজ, কবির এন্টারপ্রাইজ, প্রভী ইন্টারন্যাশনাল, কারিকা অ্যাসোসিয়েট, ট্রেড লিংক, রিলেশন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, জে ডিলাক্স চ্যানেল নামে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে এসব আউটসোর্সিং, পথ্য ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটা করা হয়।

আট হাসপাতালের মধ্যে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কাজীদের দাপট সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালের অন্তরা ফার্মেসি লাগোয়া দুটি কক্ষ এবং আন্ডারগ্রাউন্ডে গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান দখল করে কাজী কবির অফিস করেছেন। এ হাসপাতালের নিরাপত্তা রক্ষী নেওয়া হয়েছে তারই কোম্পানি থেকে। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটও তার সঙ্গে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হৃদরোগ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান  জানান, পরিচালক হিসেবে তিনি মাত্র এক মাস আগে যোগ দিয়েছেন। খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে তিনি কথা বলবেন। আফজালুর রহমানের আগে পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক ডা. এসটিএম আবু আজম। তিনি  জানান, হাসপাতালের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা তার আগের পরিচালকের সময় দখল করা হয়। কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও তা উদ্ধার করা যায়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একজন ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর হৃদরোগ হাসপাতালে দরপত্রে অংশ নিতে গেলে তাকেসহ আরও দু’জনকে কাজী কবির অস্ত্রের মুখে বের করে দেন। চলতি বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দরপত্র আহ্বান করার পর তিনি তাতে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। এ সময় কাজী কবির ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকে তাকে দরপত্রে অংশ নিলে মেরে ফেলার হুমকি দেন।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও রয়েছে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ২০০৮ সাল থেকে এখানকার ক্যান্টিন ও ফার্মেসি তাদের দখলে রয়েছে। এ ছাড়া নিটোর, চক্ষু বিজ্ঞান, কিডনি, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নিউরো সায়েন্সেন্স হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে এ চক্রটি।

একাধিক মামলা কাজীদের নামে : পুলিশ সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে রাজধানীর কাজীপাড়া এলাকায় ঠিকাদার কাজী হাফিজ দোলন হত্যা মামলায় আসামি কাজী সহোদররা। ২০০৭ সালে জুন মাসে কাজী কবিরকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় সাতটি ও তেজগাঁও থানায় একটি মামলা রয়েছে। আইন অনুযায়ী, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে তাকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু কাজী কবিরকে দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী কবির বলেন, ‘সব আইন মেনেই আমাকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।’ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়ির থাকার বিষয়ে জানতে ফোন করা হয় কাজী জাহিদ হাসান তারিফকে। ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে তিনি পরে ফোন করতে বলেন। তবে পরে তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

কাজী কবির হাসপাতালে ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে  বলেন, ‘হাসপাতালে পথ্য, আউটসোর্সিং, সিকিউরিটি গার্ড, ক্লিনার, গজ, ব্যান্ডেজ, তুলাসহ যেসব কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় সেগুলোতে অংশ নিয়ে আমি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পেয়ে আসছি।’ তিনি জানান, টেন্ডারে সর্বনিম্ন হারে কাজ নেওয়ায় নিরাপত্তা রক্ষীদের প্রত্যেককে তিনি দুই হাজার ৭০০ টাকার বেশি বেতন দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফার্মেসি ও ক্যান্টিন দখল করিনি। এগুলো চালানোর জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন তা আমার কাছে আছে।’

হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের আন্ডারগ্রাউন্ড দখলের বিষয়ে কাজী কবির বলেন, ‘সিকিউরিটি গার্ড পরিচালনার জন্য সেখানে কক্ষ করা হয়েছে।’ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

কাজীদের উত্থান পর্ব : গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারি কাজে বিরোধের জের ধরে ১৯৯৫ সালে কাজী কবিরের ভাই কাজী জরিপকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বারান্দায় গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তার মৃত্যুর পর বড় ভাই কাজী তারিফ হাসপাতালের ঠিকাদারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে নেন। হিসাব নিরীক্ষণ কার্যালয়ের কর্মকর্তা তিনি। কয়েক বছর পর ছোট ভাই কাজী কবির ঠিকাদারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 103 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ