সহায়ক সরকারে নির্বাচন

Print

দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে ‘সহায়ক সরকার’-এর অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে নির্বাচনকালে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের কার্যকর সংলাপ অনুষ্ঠানে ইসিকে উদ্যোগ গ্রহণ, ২০০৮ সালের আগের নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্বহাল, ইভিএম-ডিভিএম পদ্ধতি চালু না করা, ১/১১ থেকে শুরু করে বর্তমান সরকার কর্তৃক দলের চেয়ারপারসনসহ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারসহ ২০ দফা সুপারিশ করেছে দলটি। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত সংলাপে অংশ নিয়ে এসব প্রস্তাব লিখিতভাবে তুলে ধরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দলটি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল সংলাপে অংশ নেয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে অন্য নির্বাচন কমিশনার ও ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংলাপের শুরুতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপির উন্নয়ন কাজের প্রশংসা করেন। লিখিত বক্তব্যে সিইসি বলেন, জিয়াউর রহমানের সময় এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি প্রায় নয় বছর আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েছে। ১৯৯১ সালে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এর পর ২০০১ সালে তার নেতৃত্বে আবার সরকার গঠিত হয়। সিইসি বলেন, আজকের সংলাপে আসা অনেকে মন্ত্রী ছিলেন। তিনি তাদের অধীনে চাকরি করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে প্রকৃত নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে।

বিএনপি সরকারে থাকার সময় নেওয়া উন্নয়ন কাজের কথা বলতে গিয়ে নূরুল হুদা বলেন, দলটি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করেছে, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে। র্যাব, দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইন কমিশন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর করেছে।
বিএনপিকে ‘সফল রাষ্ট্র পরিচালনার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা’ থাকা একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্ণনা করেন সিইসি। তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আজকের সংলাপের দিকে জাতি তাকিয়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অধীর আগ্রহ ও অত্যন্ত আন্তরিকতা নিয়ে, অতি ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করছে। কমিশন বিএনপির সঙ্গে সফল সংলাপ প্রত্যাশা করে। বিএনপির সঙ্গে সংলাপেই ‘সবচেয়ে বেশি লাভবান’ হওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন সিইসি।
আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংলাপে আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনও তাদের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছে। তবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন ও সহায়ক সরকারের যে দাবির কথা তাদের বলেছি, সে ব্যাপারে কমিশন তাদের ক্ষমতার মধ্য থেকে কিছু করার চেষ্টা করবে বলে আমাদের জানিয়েছেন।
সংলাপে আপনারা সন্তুষ্ট হয়েছেন কিনা, জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের যে একটা প্রচ- রকমের অগণতান্ত্রিক আচরণ, সেখানে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে বলে আমরা মনে করি না। আশার যাত্রাটা শুরু হলো কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছুটা তো বটেই, আমরা কিছুটা আশাবাদী তো বটেই।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করতে চায়, নির্বাচন কমিশনের এই সংলাপ বা রোডম্যাপ বা পথনকশা নিছক কালক্ষেপণ বা লোক দেখানো কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে না। এ সংলাপ যেন প্রহসনে পরিণত না হয় তা কমিশনকেই নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের আন্তরিকতা, দক্ষতা ও নির্ভীক পদক্ষেপ সমগ্র জাতি প্রত্যাশা করে। জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য বিএনপি ইসিকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে চায়।
সংলাপে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি ও নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের ধারণা নিয়েও মির্জা ফখরুল বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার আদর্শে বিএনপি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান অকার্যকর ও অপরিপক্ব সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এখন থেকেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ব্যবস্থা নিতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে সমান সুযোগ ও সভা-সমাবেশ করার জন্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
ইসির মনোভাব সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা আমাদের প্রস্তাবসমূহ দিয়েছি। তারা (ইসি) অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে শুনেছেন। তারা বলেছেন, তারা চেষ্টা করবেন ভবিষ্যতে যেন একটা সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারেন তার জন্য তাদের ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন। তারা (ইসি) এও বলেছেন, আপনাদের (বিএনপি) প্রস্তাবগুলো আমাদের কাছে অত্যন্ত উপযোগী হয়েছে, সুচিন্তিত হয়েছে, আমরা উপকৃত হব। তারা মনে করেছেন, প্রস্তাবসমূহ তাদের ভবিষ্যতের কাজের জন্য সুবিধা হবে।
আড়াই ঘণ্টা সংলাপের উপলব্ধি কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা (ইসি) বলেছেন, তারা অনেকখানি সীমাবদ্ধ আছেন। তবে এ কথা তারা স্বীকার করেছেন, দেশে বর্তমানে সেই অবস্থা নেই যে তাদের দায়িত্ব পুরো পালন করতে পারেন। এটাও বলেছেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, গণতন্ত্রের যে আসল রূপ সেই রূপ বাংলাদেশে নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয় নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য কী ছিল প্রশ্ন করা হলে ফখরুল বলেন, তারা (ইসি) বলেছেন তাদের সীমাবদ্ধতা আছে, তারা চেষ্টা করবেন, নিজেরা বসবেন, বসে দেখবেন কী করতে পারে।
আগে ইসি বলেছিল রাজনৈতিক দলের সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকায় যাব না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না আজকে তারা এ কথা বলেননি। তারা বলেছেন যে তারা নিজেরা বসবেন, আলাপ করে দেখবেন। তাদের কী কী সুযোগ আছে সেই সুযোগ তারা ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 132 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ