সাদ সাহেবের বক্তব্যে অনেক মানুষ দ্বীনের সহীহ পথ থেকে বিচ্ছুত হচ্ছেন: আহম শফী

Print
[গত ৬ জানুয়ারী শনিবার রাজধানীর উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের মসজিদে আয়েশা (রাযি.) সংলগ্ন মাঠে দেশের শীর্ষ আলেম মুরুব্বী শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (হাফি.)এর নির্দেশনায় তাবলীগ জামাতে মাওলানা সাদ সাহেব কর্তৃক সৃষ্ট চলমান সংকট সমাধানে পরামর্শ গ্রহণের লক্ষ্যে দেশের উলামা-মাশায়েখগণের এক উন্মুক্ত বিশাল পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

শারীরিক অসুস্থতা ও দুর্বলতার কারণে উক্ত পরামর্শ সভায় শশরীরে অংশ নিতে না পারায় আল্লামা শাহ আহমদ শফী তাঁর পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীকে প্রতিনিধি করে একটি লিখিত চিঠি নিয়ে পাঠান। পরামর্শ সভায় সেই চিঠিটি মাওলানা আনাস মাদানী পাঠ করে শোনান। চিঠিটির হুবহু একটি কপি উম্মাহ কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে।

তাবলীগ জামাত নিয়ে বর্তমানের অত্যন্ত সংকটময় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শীর্ষ মুরুব্বীর দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনাটির গুরুত্ব অপরিসীম বিবেচনা করে উম্মাহ ২৪ডটকম পাঠক সমীপে হুবহু উপস্থাপন করা হলো। -সম্পাদক]

৬ জানুয়ারী উত্তরা উলামা-মাশায়েখ পরামর্শ সভায় পঠিত শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (হাফি.)এর চিঠির পুনর্বিবরণী

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ!

উপস্থিত সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম ও সর্বস্তরের দ্বীন-দরদী মুসলমান ভাইয়েরা! আজ আপনারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর এক দ্বীনি কাজে একত্রিত হয়েছেন। সুস্থ থাকলে আমিও স্বশরীরে উপস্থিত থাকতাম। কিন্তু অসুস্থতার কারণে আমার পক্ষে তা সম্ভব হলো না। তাই আমি আমার লিখিত বক্তব্য সহকারে প্রতিনিধি পাঠালাম।

আপনাদের জানা আছে যে, প্রচলিত তাবলীগ বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত, সর্বস্তরে সমাদৃত শান্তিপূর্ণ দ্বীনের এক মুবারক মেহনত। তবে কিছু দিন যাবৎ দিল্লির নিজামুদ্দীন মারকাজের মাওলানা সাদ সাহেবের বেশ কিছু বিতর্কিত বক্তব্য ও কর্মকান্ডের কারণে নিজামুদ্দীন মারকাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। যার সমাধানে তাবলীগের সকল মুরুব্বী আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। যদ্দরুণ বর্তমানে সমস্যা বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। যা আজ কারও অজানা নয়।

অন্যদিকে দ্বীনি বিষয়ে সাদ সাহেবের বেশামাল বক্তব্যের কারণে অনেক সাধারণ মানুষ দ্বীনের সহীহ পথ থেকে বিচ্ছ্যুত হচ্ছেন। এমতাবস্থায় ভারত বর্ষের ইলমে দ্বীনের প্রাণকেন্দ্র উম্মুল মাদারিস দারুল উলূম দেওবন্দ বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলাহের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর এ বিষয়ে দারুল উলূম দেওবন্দ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একটি বিস্তারিত ফাতওয়া জারি করতে বাধ্য হয়। যার সাথে ভারত বর্ষের সকল মর্যাদা সম্পন্ন দারুল ইফতা একমত পোষণ করেছে। আমরাও এ বিষয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের কাজকে বিশেষ করে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সকল ওলামায়ে কেরামের সম্মতিতে কাকরাইল মারকাজের যিম্মাদারকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের দস্তখতসহ চিঠি প্রেরণ করি।

আলহামদুলিল্লাহ, কাকরাইল মারকাজের যিম্মাদারও চিঠির প্রতি গুরুত্বারোপ করে আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী মাওলানা সাদ বরাবরে শূরার ফায়সালাসহ লিখে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। যাতে বলা হয়েছিল, দাওয়াতের মুবারক মেহনতের হিফাজত ও আমাদের দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য দেওবন্দকে আশ্বস্ত করে এবং মাওলানা ইবরাহীম দেওলাসহ সকল মুরুব্বীদের সাথে আপোষ করে তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই বাংলাদেশে যেন আসেন। এতেই দ্বীন ও উম্মতের কল্যাণ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি রয়েছে।

কিন্তু দু’ একজন কুচক্রির ষড়যন্ত্রের কারণে শূরার সিদ্ধান্ত সম্বলিত চিঠি এবং বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের কোন মর্যাদা তিনি রক্ষা করেননি। ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে (গত বছরের) বিশ্ব ইজতিমায় এসে আমাদের দেশের দাওয়াতের কাজের সুন্দর পরিবেশকে নষ্ট ও উত্তপ্ত করে যান। বয়ান না করার ওয়াদা করে ৯ বার বয়ান করে গেলেন। তার মধ্যে তার মনগড়া শরীয়ত বিরোধী বক্তব্য দিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করে আমাদেরকে নিরাশ করে দিলেন। পরবর্তিতে ৫ দিনের টঙ্গির জোড়ের সময় তার অনুগত এক জামাত এসে দাওয়াতের পরিবেশকে আরো নষ্ট করার পাঁয়তারা করল। কাকরাইলে নিজামুদ্দীনের নামে জোড় করার চেষ্টা করল। তাতেও তারা সম্পূর্ণ শরীয়ত বিরোধী মনগড়া বক্তব্য দিয়ে গেল যে, ‘হিদায়াতের জন্য একটি (তাদের নেতৃত্বের) বিশেষ গোষ্ঠীর অনুগত হতে হবে’। (নাউযুবিল্লাহ)।

এমতাবস্থায় আমাদের বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতঃ তার (দাওয়াত-তাবলীগের) শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নিমিত্তে একটি সুন্দর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো। আমরাও তাতে আশ্বস্ত হলাম।

সরকারী নির্দেশ অনুযায়ী (ওলামায়ে কেরামের এক) প্রতিনিধি দল ভারত গেল। তারা (প্রতিনিধি দল) তাদের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে আসলেন। অতঃপর আমরা তাদের কাছে জানতে পারলাম যে, সাদ সাহেব আমাদের দেশের গন্যমান্য ওলামায়ে কেরাম ও সরকারের দেয়া শর্তের প্রতি কোনও শ্রদ্ধা জানালেন না। তিনি সবার সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিশ্ব ইজতিমায় আসার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাই আমরা আরেকবার এই ওলামা সম্মেলন থেকে সরকার এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, এরকম বিতর্কিত ব্যক্তিকে যদি যে কোন শর্তেই হোক না কেন, বিশ্ব ইজতিমায় আসার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের দ্বীনি কাজের যেমন বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে, তেমনিভাবে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশও বিনষ্ট হবে। এবং আমাদের দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই জাতির কর্ণধার উপস্থিত ওলামায়ে কেরামের প্রতিও আহবান, আপনারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাধ্যানুযায়ী এই মুবারক মেহনতের সুরক্ষায় শান্তিপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। এই আশাই ব্যক্ত করি।

পরিশেষে আল্লাহ পাকের দরবারে আপনাদের সকলের সুসাস্থ্য ও দীর্ঘায়ূ কামনা করি এবং আপনারাও আমার জন্য দোয়া করবেন।

وما توفیقی الا باللہ والسلام علیکم ورحمۃ اللہ

আহমদ শফী (স্বাক্ষর)

খাদেম- দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1810 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ