সাপের বিষের প্রতিষেধক কি? কিভাবে প্রস্তুত করা হয়?

Print

সাপের বিষের এন্টি ভেনম

খুব ছোটবেলায় একবার ডোবাতে মাছ ধরতে গিয়ে সাপের কামড় খেয়েছিলাম!!!

বাইন মাছ মনে করে কালো কুৎসিত একটি সাপের লেজ চেপে ধরেছিলাম তাই কামড় খেতে হয়েছিলো।
ভাগ্য ভালো সাপটি বিষাক্ত ছিলনা; আর জানামতে বেশী বিষাক্ত সাপ ডোবার পানিতে থাকেনা

মানুষের সাথে সাপের বসবাস এবং শত্রুতা সেই গুহাযুগ থেকেই; বাইবেলে বলা হয়েছেঃ
আদিপুস্তক অধ্যায় ৩

১ প্রভু ঈশ্বর যত রকম বন্য প্রাণী সৃষ্টি করেছিলেন সে সবগুলোর মধ্যে সাপ সবচেয়ে চালাক ছিল। সাপ সেই নারীর সঙ্গে একটা চালাকি করতে চাইল।………………
১৪ সুতরাং প্রভু ঈশ্বর সাপটাকে বললেন,“তুমি ভীষণ খারাপ কাজ করেছ; তার ফলে তোমার খারাপ হবে। অন্যান্য পশুর চেয়ে তোমার পক্ষে বেশী খারাপ হবে। সমস্ত জীবন তুমি বুকে হেঁটে চলবে আর মাটির ধুলো খাবে।
১৫ তোমার এবং নারীর মধ্যে আমি শত্রুতা আনব এবং তার সন্তানসন্ততি এবং তোমার সন্তান সন্ততির মধ্যে এই শত্রুতা বয়ে চলবে। তুমি কামড় দেবে তার সন্তানের পায়ে কিন্তু সে তোমার মাথা চূর্ণ করবে।”

গুহা মানবদের আঁকা বিভিন্ন গুহাচিত্রে আমরা সাপের সাথে মানুষের সম্পর্কের নানা চিত্র দেখতে পাই।

একটা সময় ছিল যখন বিষাক্ত সাপের কামড় মানে ছিল নির্ঘাত মৃত্যু; কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যুহার অনেকাংশে কমিয়ে এনেছি।
কিছুদিন পূর্বেও সাপের কামড়ের একমাত্র চিকিৎসা ছিল ঝাড়ফুঁক ওঝা এবং দুধ ও গোবর থেকে দূরে থাকা।
সময়ের সাথে সাথে আবিষ্কার হয়েছে এন্টি ভেনম; সাপের কামড়ে এখন আর অত বেশী মানুষ মড়ে না যতটা ১৫০ বছর আগেও কল্পনা করা যেত না।

সাপের ভেনমের এন্টি ভেনমের কথা বলতে গেলে সবার আগে যার নাম আসে তিনি হলেন ফ্রান্সের ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানী আলবার্ট ক্যালমেট। পরবর্তীতে লুই পাস্তুর সেটার উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
১৮৯০ সালে আবিষ্কৃত সেই পদ্ধতিতে এখনো বাণিজ্যিক ভাবে এন্টি ভেনম উৎপাদন করা হয়।

Albert CalmetteLouis Pasteur
ছবিঃ বামে Albert Calmette এবং ডানে Louis Pasteur

এবার আসুন কিভাবে এন্টি ভেনম তৈরি করা হয় সংক্ষেপে সে সম্পর্কে জানি।

###প্রথম ধাপ- সাপের বিষ সংগ্রহঃ


যে সাপের বিষের এন্টি ভেনম তৈরি করতে হবে প্রথমে সেই সাপের বিষ সংগ্রহ করা হয়।
প্রত্যেক সাপের বিষ আলাদা ধরনের তাই এক সাপের বিষের এন্টি ভেনম অন্য সাপের বিষ ধ্বংস করতে পারেনা।
একটি পাত্রের মুখে কাগজ বা প্লাস্টিক আটকে সেখানে সাপের দাঁত ঢুকিয়ে দিলে ফোঁটায় ফোঁটায় সাপের বিষ ঝরে পড়ে। একই সাপ হতে এভাবে সপ্তাহে একবার পূর্ণ পরিমানে বিষ পাওয়া যায়।
সাপের বিষ সংগ্রহ করা একটি শিল্প। জংলী সাপের বিষ থেকেই পূর্বে বিষ সংগ্রহ করা হত। কিন্তু ব্যাপক চাহিদার কারনে আজকাল বিষের জন্য সাপের খামার রয়েছে বিভিন্ন দেশে।
পাশের দেশ ভারতে বেশ বড় আকারের কিছু সাপের খামার রয়েছে।
বাংলাদেশে এমন খামার এখনো তেমন নেই; সম্ভবত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সাপ পালন এখনো তেমন একটা প্রসার লাভ করেনি বাংলাদেশে।

###দ্বিতীয় ধাপ- ভেনম ফ্রিজিংঃ

মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জমিয়ে ফেললে বিষ থেকে জলীয় অংশ আলাদা হয়ে সাপের বিষ গুড়ো পাউডারে রূপান্তরিত হয়। একটি সাপ থেকে খুব অল্প পরিমানেই পাউডার পাওয়া যায়; তাই সাপের বিষের গুড়ো সোনার মতনই দামী। অন্য আর ১০ টি দেশের মতন বাংলাদেশ থেকেও বিপুল পরিমানে সাপের বিষের গুড়ো বিদেশে পাচার হয়ে যায়; মাঝে মধ্যে যখন সীমান্তে বিষ আটক হয় তখনি বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। বাকী সময় তা থেকে যায় আমাদের চোখের আড়ালে।

###তৃতীয় ধাপ- ঘোড়ার শরীরে এন্টি ভেনম উৎপাদনঃ
এটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিছুটা ঝক্কির কাজও বটে। তাই সব দেশে এন্টি ভেনম উৎপাদন হয়না; সম্ভবও নয়।

প্রথমে মূলনীতি জেনে নেই।
সকল প্রাণীরই বাইরে থেকে আসা উটকো সমস্যা গুলো থেকে মুক্তির নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাবস্থা রয়েছে।
আমাদের শরীরে বাইরে থেকে কোন রোগ জীবাণু প্রবেশ করলে শরীর নিজে থেকেই তার অ্যান্টিবডি তৈরি করে নেয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য; সাপের বিষ শরীরে প্রবেশ করলে তার প্রতিবিষ তৈরি করার ক্ষমতা আমাদের তেমন নেই।

পৃথিবীতে খুব অল্প সংখ্যক প্রাণী নিজের শরীরে সাপের বিষ প্রতিরোধের অসুধ তৈরি করতে পারে।
যেমনঃ গাধা, ভেড়া, ছাগল, খরগোশ, বেজি, মুরগী, উট, ঘোড়া, হাঙ্গর!!!

বেশী রক্ত এবং অনেকদিন বাঁচে আর বারবার ব্যবহার করা যায় বলে বর্তমানে বাণিজ্যিক ভাবে এন্টি ভেনম উৎপাদনের জন্য ঘোড়ার ব্যাবহার সর্বাধিক; তবে হাঙ্গরের ব্যাবহার সবচাইতে কার্যকর হওয়া সত্তেও আশা করি কি কারনে হাঙ্গরের চাইতে ঘোড়ার ব্যাবহার বেশী করা হয় সেটা আর বলে দিতে হবেনা।

এবার আসুন ঘোড়ার থেকে কিভাবে এন্টি ভেনম উৎপাদন হয় সেটা জানি।
সাপের কামড়ে কখনোই ঘোড়া মড়ে না; তা একটি সাপ কামড়াক কিংবা ১০ টি সাপ।
খামারে ঘোড়াকে পূর্বে সংগ্রহ করা সাপের বিষ ইনজেকশনের মাধ্যমে ধমনীতে প্রবেশ করানো হয়। এত ঘোড়া মড়ে না; বরং তার শরীরে এন্টি ভেনম উৎপাদন শুরু হয়ে যায়।
প্রায় ৩ দিন ঘোড়াটি অসুস্থ থাকে; আমাদের যেমন জ্বর হয় অনেকটা তেমন। ৩-৪ দিন পর ঘোড়াটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। তার শরীরের সমস্ত বিষ নষ্ট হয়ে গিয়েছে ততদিনে।
এখন এই ঘোড়াকে একই জাতীয় অন্য কোন সাপ কাম্রালে তার শরীরে তেমন কোন প্রভাব পড়বে না।

###চতুর্থ ধাপ- ঘোড়ার রক্ত থেকে এন্টি ভেনম আলাদাকরনঃ
ঘোড়ার শরীর থেকে রক্ত নিয়ে তার লাল অংশ আলাদা করা হয়। সাদা অংশ অর্থাৎ ম্যাট্রিক্স থেকে অ্যান্টি ভেনাম আলাদা করা হয়। ঘোড়া বেশ স্বাস্থ্যবান এবং অনেক রক্ত থাকে বলে বেশ ভালো পরিমানে রক্ত নিলেও (গড়ে প্রতি ঘোড়া থেকে প্রায় ৬ লিটার রক্ত নেয়া হয়) ঘোড়ার তেমন ক্ষতি হয়না। এখন এই এন্টি ভেনমের শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে শিশিতে ভড়ে বাজারে সরবরাহ করা হয়।

চিকেন পক্সের এন্টিবডি এবং সাপের বিষের এন্টি ভেনমের মূলনীতি প্রায় একই। চিকেন পক্সের ক্ষেত্রে এন্টিবডি তৈরি করে আমাদের শরীর; আর সাপের বিষের ক্ষেত্রে সেটি তৈরি হয় ঘোড়ার শরীরে। এই এন্টি ভেনম সাপে কাটা রুগির শরীরে ইনজেকশন করলে এন্টি ভেনম শরীরে থাকা ভেনমকে অকার্যকর করে রুগির জীবন বাচায়। বছরের হাজার হাজার মানুষের জীবন এই এন্টি ভেনমের কারনে বেঁচে যায়।

কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং দাম দুর্মূল্য হওয়ার কারনে সকল সাপে কাটা রুগির ভাগ্যে এন্টি ভেনমের আশীর্বাদ জোটে না; অপচিকিসার কারনে পৃথিবীতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সাপের কামড়ে জীবন হারান। এন্টি ভেনম সবসময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সংরক্ষণ করতে হয় বলে সবসময় সবজায়গায় সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়না।


সাপের বিষের এখনো একমাত্র আধুনিক চিকিৎসা হল এন্টিভেনম বা বিষ প্রতিষেধক আর এটা তৈরি করা হয় সাপের বিষ থেকে। বিষ এক প্রকার প্রোটিন যা রক্তে এন্টিজেন হিসাবে কাজ করে।
কোন প্রাণী বা মানুষকে সাপ কামর দিলে রক্তের এন্টবডি এসে প্রতিরোধের চেস্টা করে কিন্তু বিষ শক্তিশালী এবং পরিমানে বেশী হলে সব প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে আর তাই বাড়তি প্রতিরোধের জন্য বাহির থেকে এন্টবডি দিতে হয় যা সাপের বিষ থেকেই বানাতে হয়।

প্রক্রিয়া:
১. প্রথমে কোবরা, কেউটে বা অন্যান্য বিষধর সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা হয়।
২. সাপের বিষ শরীরে প্রবেশ করানোর জন্য প্রাণী নির্বাচন করা হয়। সাধারনত ঘোড়ার শরীরে প্রবেশ করানো হয় তবে কোন কোন ক্ষেত্রে ভেড়া, ছাগল, খরগোশ, বিড়াল ও ব্যাবহার হ্য়।
৩. বিষ নির্দিষ্ট মাত্রায় ইনজেকশন দিয়ে ঘোড়ার শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এই বিষের বিরুদ্ধে ঘোড়ার রক্তে এন্টিবডি তৈরি হতে থাকে।
৪. কয় মাস পর আবার বিষ শরীরে প্রবেশ করানো হয় তবে এবার একটু বেশী। এভাবে আস্তে আস্তে বিষের পরিমান বাড়নো হয়। কয়েক বছর পর ঘোড়ার রক্তে শক্তিশালী এন্টিবডি তৈরি হয়।
৫. সেই ঘোড়াকে ছাকনিযুক্ত স্টেজে নিয়ে বিশেষ ছুরি দিয়ে জবাই করা হয় যাতে রক্ত না জমে সব রক্ত বের হয়।
৬. রক্ত সংগ্রহ করে রক্ত থেকে রক্তকনিকা বাদ দিয়ে শুধু সিরামটা আলাদা করা হয়।
৭.এর পর নির্দিষ্ট পরিমানে মেপে মেপে বোতলে ভরে বাজারজাত করা হয়।
৮. যাকে যেই সাপ কামড় দিবে তাকে শুধু সেই সাপের বিষ থেকে তৈরি এন্টিবডি সিরাম দিতে হবে অন্য সাপের দেলে কাজ হবে না। তবে একাধিক সাপের বিষ মিশ্রন থেকে মাল্টিএন্টিভেনমও তৈরি করা হয় যা একাধিক সাপের বিষের বিরুদ্ধে কাজ করে।

 


প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 190 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ