সাপ দিয়ে চাঁদাবাজি

Print

সাপখেলা দেখবেন গো, সাপখেলা, দাঁতের পোকা উঠাই, পিঠের ব্যথা, পেটের ব্যথা, হাঁটুর ব্যথায় সিঙ্গা লাগাই”। সিঙ্গা-সুর করে এসব কথা বলে যারা গ্রাম-বাংলা এমনকি শহরের পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় তারা সাধারণতা সমাজের আর দশজনের কাছে বেদে (বাইদ্যা) নামেই পরিচিত।
বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার আড়ালে, ভব্য চোখে নোংরা পরিবেশে এদের বাস। যাযাবর এই জনগোষ্ঠীর ঘর-সংসার, বাহন-অবস্থান সবকিছুই ভাসমান নৌকায়। পণ্ডিতদের মতে, এরা বাস্তুহীন, গৃহহীন, ভ্রাম্যমাণ। ইংরেজিতে এদের বলা হয় জিপসি। এরা মূলত ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল খিষ্ট্রীয় প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি। এ জনগোষ্ঠীর ভাষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়।

এক সময় গ্রামাঞ্চলে সাপুড়েদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। যাযাবর এই জনগোষ্ঠী ক্ষণস্থায়ী তাবু ফেলে বিভিন্ন এলকায় সাপের খেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাপুড়েদের পেশাও বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। টাকা কামাইয়ে ভিন্ন রূপে হাজির হচ্ছে বেদেরা।
ইদানিং শহরাঞ্চলেও বেদে-বেদেনীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে। সাপের খেলা দেখানোর চেয়ে সাপের ফণা দেখিয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে অনেক সাপুরে। রাজধানীর ফুটপাত, অলিগলিসহ যেখানে সেখানে চলছে সাপ দিয়ে চাদাঁবাজি। ব্যাইদাদের এহেন কার্যকলাপে স্বস্তিতে নেই নগরবাসীও। বিশেষ করে আতঙ্কের ভাঁজ দেখা যায় হঠাৎ গ্রাম থেকে চাকুরি বা বিশেষ কাজে ঢাকায় আশা নিরীহ মানুষগুলোর পাশাপাশি স্কুল কিংবা কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের চোখে-মুখে।
রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় বের হলেই এসমস্ত ঘটনা হরহামেশাই চোখে পড়ে। প্রধান সড়কের পাশেই এসব সাপ; এমনকি পাশের দোকানগুলোতেও ঢুকছে সাপগুলো। তবে এগুলো নিজেরা দোকানে ঢুকছে না। কখনও কখনও দুজন করে নারী গলায় পেঁচানো দুই তিনটা করে সাপ নিয়ে আবার কখনও দলবদ্ধভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন এবং আশপাশের দোকানে ঢুকে টাকা তুলছেন। সামনের দিকে এগিয়ে গেলেই বোঝা যায় এরা বেদে সম্প্রদায়ের লোক।
ফুটপাত অথবা রাস্তার কোল ঘেঁষে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই দু’পাশ থেকে দু’জন মহিলা গলায় সাপ জড়িয়ে এসে রাস্তায় চলা মানুষদের সামনে হাত বাড়িয়ে বলেন, ‘ভাই কয়ডা টাকা দাও গো ভাই, সাপের আর্শীবাদে তোর জীবন ধন্য হইবো গো ভাই। অনেক টাকা-পয়সার মালিক হবি তুই’।
চলার পথে বাস্তবেই চোখের সামনে নিজের কাছাকাছি যদি এমন ভয়ঙ্কর সাপের কিলবিল চোখে পড়ে তাহলে ভয়ে যে কারো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। এমনিভাবেই মানুষের সামনে সাপ নিয়ে গিয়ে তারা টাকা তুলছেন। মানুষও সাপের ভয়ে অনেক সময় ইচ্ছা না থাকার সত্ত্বেও এদেরকে টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকে আবার পাশ কাটিয়ে চলে গেলে পেছন থেকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন এসব বেদেনীরা।
রাজধানীর বঙ্গবাজার এলাকায় ছমছমে ভয়ঙ্কর দুটি সাপ গলায় জড়িয়ে হাঁটছে দুই মহিলা। সাপ দিয়ে সবাইকে ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন দোকান থেকে তোলা হচ্ছে টাকা। এ কাণ্ড দেখে অনেকেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন তাদের দিকে। কিন্তু কেউ সাহস করে বলছে না, কেন টাকা তোলা হচ্ছে? কারণ সাপকে তো সবাই ভয় পান।
শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে নিউ মার্কেট এলাকায় এমনই দৃশ্য দেখা যায়। ২টি সাপ গলায় জড়িয়ে পথচারী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তুলছেন রাখী দাস আর রিনা খাতুন নামের দুই বেদেনী। তাদের দাবি, মানুষকে ভয় দেখিয়ে নয়, অভাবের তাড়নায় তারা এভাবে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলছেন।
শুধু এরা দু’জন নয়, ঢাকার প্রায় সব এলাকাতইে রাস্তার মোড়ে বা অলিগলিতে সাপ গলায় পেঁচিয়ে এক ধরনের নতুন ব্যবসায় মেতে উঠেছে এ সমস্ত বেদেনীরা।
রাজধানীর ঢাকা কলেজের ঠিক বিপরীত পাশে নূরজাহান মার্কেটের সামনে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মাস্টার্স পড়ুয়া তানভীর আহমেদ। তিনি প্রতিবেদকে বলেন, ‘হঠাৎ করে পাশ থেকে দুই-তিনজন মহিলা এসে বললন, ‘১০টা টাকা দে’। আমি বললাম ‘খুচরা টাকা নেই’। এই বলে পেছনের দিকে মাথা ঘুরিয়ে মহিলাদের গলায় থাকা সাপ দেখে ওরে বাবারে শব্দ করে উঠি। তখন বেদেনীরা বলে ‘ভয় পাইস না, কিছু কইবো না’। তখন আমি ১০০ টাকার নোট দিয়ে ২০ টাকা রাখতে বলি। তারা টাকা পেয়ে আমাকে বাকি টাকা না দিয়েই চলে যায়।
তানভীরের মত এ রকম হাজারও পথচারীকে পকেটে থাকা টাকার একটা অংশ প্রায় প্রতিদিনই গচ্ছা দিতে হচ্ছে সাপখেলা দেখানোর ছলে ব্যবসায় নামা বেদে-বেদেনীদের।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 95 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ