সাফাতের মায়ের জন্য করুণা, তার স্বামী-পুত্র ধর্ষক

Print

সাফাতের মায়ের জন্য করুণা, তার স্বামী-পুত্র ধর্ষক

নাসরীন রুমু।।

অনেকদিন পর ছুটির দিনে পরিবারের সাথে ক্যারাম বোর্ড নিয়ে বসলাম। খুব ছোট বেলায় এই খেলাটা আমার ভালোই লাগতো কিন্তু এতো ভালো খেলতে পারতাম না। তবে সুযোগ পেলেই খেলতে বসে যেতাম। কিন্ত বর্তমানে এই ধরনের খেলাগুলো প্রায়ই বিলুপ্তির পথে। ইন্টারনেটের অতি অভিনব খেলা গুলোর মাঝে হারিয়ে গেছে আমাদের শৈশবের মজার সব খেলা গুলো। তার ওপর অনেক দিন চর্চা না থাকার কারণে খেলতে বসে মোটামুটি কষ্টই হচ্ছিল, প্রতিটি গুটি সই করে ক্যারাম বোর্ডের পকেটে ঢুকানো, পয়েন্ট কালেক্ট করা।

খুব মনোযোগ দিয়েই খেলছিলাম। বোর্ডের কালো-সাদা গুটি এদিক সেদিক ছোটাছুটি, ভালোই লাগছিলো। হঠাৎ কেনো জানি বোর্ডের কালো গুটিগুলোকে মনে হচ্ছিল শাফাত, সাদমান এর মতো এক একজন কালো কুৎসিত ধর্ষক, যা সাদা শুভ্র গুটিগুলোর চারপাশে কিলবিল করছে। ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছিল। আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের চিএ কিন্তু এটাই।।

কয়েকদিন ধরে পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, ফেইসবুকে “বনানী নারী ধর্ষণ” নিউজটি এখন ভাইরাল। সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চতর পর্যন্ত এটি এখন আলোচ্য বিষয়। এটাই এখন প্রধান শিরোনাম। এটা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছে। সেদিন এক আড্ডাতে আমার এক কাছের মানুষ বলছে, দোষটা কিন্তু মেয়েগুলোর, ওরা যদি সেদিন না যেতো তাহলে এ ঘটনা ঘটত না। ঠিক আছে, ধরে নিলাম মেয়েগুলোর দোষ। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, মেয়েগুলো না হয় ভুলে ,মানুষ মনে করে অমানুষগুলোকে বিশ্বাস করেছে, তাদের ফাঁদে পা দিয়েছে তার জন্য এতো ভয়ানক পরিণতি? তখন উত্তর আসে, পুরুষরা একরকমই হয়, তাদেরকে এমন করে বানিয়েছে। আমি হতবাক!!!

আসলে কি তাই?
বিধাতা কী আসলেই এভাবে তাদের সৃষ্টি করেছেন?
না, বিধাতার সৃষ্টি এমন হতে পারে না।

যুগে যুগে নবী-রাসূল থেকে শুরু করে যত মহামানব দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন সবই কিন্তু পুরুষজাতি। মানবতার গুণাবলী প্রচারের জন্যই কিন্তু তাদের প্রেরণ করা হয়েছিলো। শুধু ইসলাম ধর্মে নয় পৃথিবীর সব ধর্মের মহামানবগণ পুরুষজাতি। তাঁরা মানব জাতির কাছে কল্যাণের বার্তা পৌঁছে দিতে এসেছেন।।

বিধাতা পুরুষ জাতিকেও মানবীয় গুনাবলী দিয়ে সৃষ্ট করেছেন? তাহলে এই রূপ কেনো পুরুষের??

যদি বলি, আমাদের চলমান পুরুষ শ্বাসিত সমাজ ব্যাবস্থায়ই দায়ী। সেদিনের ঘটনায় অনেকে মেয়ে গুলোকে দায়ী করেছেন। কারণ “এতো রাতে মেয়েগুলো কেনো ঘর থেকে বের হলো?ভালো ঘরের মেয়েরা এতো রাতে বের হয় না।” কিন্তু এই প্রশ্ন ছেলেদেরকে করা হয়নি।।

কেনো? কোন ধর্মে বলা হয়েছে, পুরুষরা রাতের পর রাত বাইরে মদ, মাস্তি, নেশা করে বেড়াবে, সুযোগ পেলে যে কোনো নারীকে কুৎসিত থাবা দেবে। পুরুষ মানে কোনো পাপ নাই। কোনো ধর্মে এই কথা বলতে পারেনা। ধর্ম মানে “শান্তি “। সত্য ও সুন্দরের পথে আহবান।

একটা নারী কেনো কখনও একটা পুরুষের কাছে নিরাপদ থাকতে পারে না। ছোট্ট একটা শিশু থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক নারী হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক নারী কোনো না কোনো ভাবে শারীরিক বা মানসিক ভাবে ধর্ষিত হয়। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় ধর্ষণের প্রথম থাবা কিন্তু কাছের মানুষ কিংবা ঘর থেকে। কেউ কেউ মনে করছেন পোষাকি পর্দার অভাব। মানে নারীর দোষ। ঠিক আছে, তাও মানলাম।

তাহলে ছোট্ট শিশুগুলোর কি দোষ? যাদের শৈশবে থাকে চাচা, মামা, খালু কিংবা কাছের কোনো পুরুষের কোলে। অথচ সেখানে সে নিরাপদ না।। শরীরে নারীর চিহ্ন ফুটে ওটার আগে পুরুষের লোভাতুর কুৎসিত থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে তাদের শরীর, ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে তাদের সোনালী সুন্দর শৈশব। বড় হচ্ছে ভয়ানক দু:সপ্ন নিয়ে। পর্দ্দা কিন্তু পোষাকে নয়।। পর্দা হলো বিবেকের, মনুষত্ব্যের ।।

কয়েকদিন আগে যমুনা টিভির প্রকাশিত সংবাদে দেখলাম শুধু এপ্রিল মাসে ধর্ষণ হয়েছে নারী-শিশু মিলে ১০৯ জন। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল ১৭ জনকে। এটা শুধু প্রকাশিতগুলো, অপ্রকাশিতগুলোর হিসাব বিধাতা জানেন। আমাদের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্হার কারনে তা প্রকাশ করার সাহস পাই না অনেকে।

কারণ আমাদের দেশে ধর্ষিতাকে কাঁদতে হয়, আত্মহনন করতে হয় তাকে। এই পথ
তৈরি করে দিয়েছি আমরা।। আজ পর্যন্ত কখনও শুনেছেন, কোনো ধর্ষক লজ্জায় ঘৃনায় আত্মহত্যা করেছে ? হুম। কেনো করবে?? লজ্জা তো তার না, লজ্জা নারীর ভূষন।।
আমারো প্রশ্ন সেটা। সে কেনো করবে?

আরে আমরা নারীরাই তো বলি সব দোষ নারীর। ধর্ষকদের আমরাই বলবান করেছি।
আমাদের দেশে যেভাবে জঙ্গি নিধন চলছে, তাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অতুলনীয় নয় ,প্রশংসনীয়। দেশের আনাচে কানাচে যত তলা আছে কোনো তলা বাদ নাই সবখান থেকে জঙ্গি উৎখাত হচ্ছে । জঙ্গিরা আত্মঘাতী জানার পরও আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পিছপা হননি। বাহ্ ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো , যখন ধর্ষিতা তার কাছে বিচার চাই তখন এই আইন শৃঙ্খলা বাহীনির অন্য চেহারা।। ওরা কি ধর্ষককে ভয় পায়? নাকি অর্থে বিক্রিত দাস??

আরো বেশি অবাক হওয়ার বিষয় হলো, আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধী দলের নেত্রী পর্যন্ত অনেক নারী রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রে জড়িত। শুধু তাই নয় , সামাজিক অনেক কর্ম ক্ষেত্রে মহিলারা এগিয়ে। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন নারী নেতৃত্ব আছে কিনা সন্দেহ্? আফসোস এ দেশে, ধর্ষিতা নারীরা, শিশুরা সঠিক বিচার পায় না।। ধর্ষকরা হাসে উল্লাসের হাসি।।

করুণা হচ্ছে সাফাতের মায়ের জন্য, যার স্বামী এবং সন্তান দুজনই ধর্ষক।। অনেকের ধারণা, নারী স্বাধীনতা নারীদের ডুবিয়েছে। তাহলে, আগে কী নারীরা লাঞ্চিত হয়নি??
হয়েছে, প্রকাশ করা হতো না।।

বাচ্চা হওয়া, না হওয়া থেকে শুরু করে সব কিছুর জন্য নারীকে দায়ী করা হতো। বর্তমানে এর প্রভাব অনেকটা কম। এর কারণ, হলো শিক্ষা। নারী স্বাধীনতা মানে সেই স্বাধীনতার কথা বলছি না, যেখানে শালীনতাহীন উগ্রতা, অসভ্যতা, বিদ্যমান। যা পুরুষ , নারী কারো জন্য কাম্য নয়।

নারী স্বাধীনতা হলো নারীর প্রতি সম্মানবোধ, সুদৃষ্টি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে এ দেশ। উন্নতির জোয়ারে ভাসছে এদেশের মানুষ। কিন্তু যে দেশে নারী ও শিশু দুঃস্বপ্ন দেখে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে সে দেশ কি আসলে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসতে পারে? নারী, শিশু নিরাপত্তা নাগরিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আমরা চাই দুর্নীতি মুক্ত, সন্ত্রাস মুক্ত , জঙ্গিমুক্ত, ধর্ষণ মুক্ত বাংলাদেশ।। এই চাওয়া আমাদের সকলের।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 778 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ