সামরিক চুক্তিতে সম্মিলিত অভিযান ও যৌথ কমান্ড চায় ভারত

Print

শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে গুরুত্বপুর্ন সামরিক চুক্তি হতে যাচ্ছে এমটাই বলছে বাংলাদেশী ও ভারতীয় মিডিয়া । ভারত-বান্ধব চ্যানেল আই লিখেছে, ভারত-বাংলাদেশ সামরিক চুক্তিই হচ্ছে হাসিনার সফরের বড় এজেন্ডা ।
সামরিক চুক্তিতে ভারতের তীব্র আগ্রহ কেন ? এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক বলেছেন,
‘বর্তমানে বাংলাদেশ বেশিরভাগ অস্ত্র চীন থেকে কেনে। ভারত আসলে সেই জায়গাতে ভাগ বসাতে চাইছে। আর তৃতীয় কারণটি হচ্ছে, কিছু কিছু সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যৌথ অভিযান বা সম্মিলিত অভিযান চালানো। চুক্তির মাধ্যমে এই রকম একটা সুযোগ তৈরি করতে চাইছে ভারত।’
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে সম্ভাব্য একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে সামনে রেখে সম্ভাব্য চুক্তিকে আলোচনায় নিয়েই অনেকে এ নিয়ে উদ্বেগও ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনীতিক মহল অবশ্য এই প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কিছুই বলছে না। তবে দুই দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এটা বোঝা যাচ্ছে যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি দিল্লিতে দুই সরকার প্রধানের শীর্ষ বৈঠকে আলোচিত হবে। এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হতে পারে।
প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কী রয়েছে, সেটি নিয়ে ভারতীয় সাংবাদিক ও বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিকের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ভৌমিকের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সামরিক ক্ষেত্রে আরো বাড়তি যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ব্যাপারে দুইদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করা, একটা ব্যাপার। আরেকটি হচ্ছে, ভারত চাইছে যে তাদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র কেনা হোক।’
তিনি জানান, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ বেশিরভাগ অস্ত্র চীন থেকে কেনে। ভারত আসলে সেই জায়গাতে ভাগ বসাতে চাইছে। আর তৃতীয় কারণটি হচ্ছে, কিছু কিছু সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যৌথ অভিযান বা সম্মিলিত অভিযান চালানো। চুক্তির মাধ্যমে এই রকম একটা সুযোগ তৈরি করতে চাইছে ভারত।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ আছে, এই চুক্তির মেয়াদ হবে ২৫ বছর। এর আওতায় বাংলাদেশকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ারও প্রস্তাব আছে ভারতের। দীর্ঘমেয়াদী ওই চুক্তিতে ভারত বিশেষভাবে আগ্রহী।
এখন কিন্তু প্রশ্ন হলো ভারত কেন এরকম চুক্তি করতে চায়? জবাবে সুবীর ভৌমিক বলেন, “ভারতের মূল্যায়ন হচ্ছে, অন্য সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেভাবে এগোয়নি। এখানে ভারতের যে সমস্যাগুলো তার একটা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষার সমস্যা, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে চীন। এগুলো মাথায় রেখেই এ ধরনের ‘ডিফেন্স কো-অপারেশন প্যাক্ট’ করতে চাইছে ভারত। বিশেষ করে নর্থ-ইস্টার্ন রিজিয়নে কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্যই ভারত এমনটি চাইছে।”
সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের দায়িত্বশীল কেউই বিস্তারিত কিছু জানায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র বিবিসিকে জানায়, “সফরে কী নিয়ে চুক্তি হবে বা হবে না, সেটি এত আগে বলা সম্ভব নয়, কারণ তা পুরোপুরি নির্ভর করছে দুই সরকার-প্রধানের মধ্যে আলোচনার গতিপ্রকৃতির ওপর। তবে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সমস্ত দিক নিয়ে আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। এতে অর্থনীতি-অবকাঠামো উন্নয়ন, কানেক্টিভিটির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও থাকতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনও বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে কি না, সেটা বলার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি।”
প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল হকও কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি শুধু বলেন, ‘এটা যখন ভিজিট হবে, তখনই আপনারা জানবেন যে কী কী চুক্তি হলো। এ চুক্তিগুলো যেহেতু আলোচনার মধ্যে আছে, সেজন্য এখন এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটা যথাযথ হবে না বলেই আমি মনে করি।’
প্রতিরক্ষার বিষয়টি আলোচনার মধ্যে আছে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সব কিছুই আলোচনার মধ্যে আছে। প্রতিরক্ষা সবসময়ই আলোচনার মধ্যে ছিল।’
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে কতগুলো বিষয়ে চুক্তি হতে পারে জানতে চাইলে শহীদুল হক বলেন, ‘দুইদেশের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছে। আর সেগুলো সবগুলোই অলমোস্ট এমওইউ (সমঝোতা স্মারক)। দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের পরিধি এত বেশি যে মোটামুটি সব জিনিস নিয়েই আলোচনা হবে। বেশ কিছু সংখ্যক এমওইউ হবে, চুক্তি না।’
ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ নির্ধারণ করে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার। রাশিয়া-চীন-যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা সমরাস্ত্র এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে সামরিক বাহিনীতে। সম্প্রতি চীন থেকে কেনা দুটি সাবমেরিনও যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে।
সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা থাকায় সার্বিক বিচারে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য খুবই স্পর্শকাতর বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জামিল ডি. আহসান। তিনি বলেন, ‘প্রতিটা দেশেরই সামরিক নীতি থাকে। এগুলো নিজস্ব ও গোপনীয় বিষয়। তাই প্রতিরক্ষা বিষয়টি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি যেমন স্পর্শকাতর, তেমনি ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও কিন্তু স্পর্শকাতর”।
এদিকে বাংলাদেশের প্রধান রাজনীতিক দলগুলোকে ইদানিং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতেও দেখা যাচ্ছে। জেনারেল আহসান মনে করেন এ নিয়ে রাজনীতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে। “রাজনীতি তো আমাদের জানেনই যে, তারা চেয়ে থাকে কোন ইস্যুতে রাজনীতি করা যায়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 157 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ