সার্চ কমিটির তালিকায় ২০ জন

Print

নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া ১২৫ জনের নাম থেকে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছে সার্চ কমিটি। এই তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করা হবে। আগামী ৮ ফেব্রæয়ারির আগেই তালিকা প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেবে সার্চ কমিটি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া নাম নিয়ে সার্চ কমিটির বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফিং করেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল চারটায় সুপ্রিম কোর্ট জাজেস লাউঞ্জে এই বৈঠক শুরু হয়ে চলে ছয়টা পর্যন্ত।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, তাদের কাছে ২৫টি রাজনৈতিক দল ১২৫ জনের নাম প্রস্তাব করেছে। এ নামগুলো সার্চ কমিটির সদস্যগণ পর্যালোচনা করে দেখে ২০ জনের একটি শর্টলিস্ট করেছেন। এ নিয়ে পরবর্তীতে তারা আবারও বসবেন।
রাজনৈতিক দলের দেয়া নামের বাইরে কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম সুপারিশ করার এখতিয়ার সার্চ কমিটির রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া নাম আপনারা প্রকাশ করবেন কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া তালিকা তাদের কাছে আমানত, আমরাতো তা খেয়ানত করতে পারবো না।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দেয়া তালিকায় কোন কমন নাম আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে শফিউল আলম বলেন, কমন না হলেও একই টাইপের ভালো ব্যক্তিদের নাম তারা সুপারিশ করেছে। এসময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠক করার কোন নির্দেশনা তাদের নেই।
এর আগে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটির কাছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল নাম জমা দেয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ এই দলগুলো পাঁচটি করে নাম জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে। দু’টি দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (রব) চিঠি দিয়ে নাম না দেওয়ার কারণ উল্লেখ করেছে। আর নাম বা কোনো চিঠি দেয়নি এমন চারটি দল হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ও গণফোরাম। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩১টি রাজনৈতিক দলকে নাম দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিটি। এ দলগুলোর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রণ্ট (বিএনএফ), ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), সাম্যবাদী দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), জাসদ (আম্বিয়া), বাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, গণফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) ও জাকের পার্টি।
সিপিবিসহ কয়েকটি দল ইসি গঠনে নাম প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আগেই বলেছিল, এভাবে রাজনৈতিক দলগুলো নাম প্রস্তাব করলে ওই ব্যক্তিদের নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়বে।
এদিকে নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্য বাছাইয়ে গঠিত সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটির কাছে দুই শীর্ষ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাঁচ জন করে নাম প্রস্তাবের চিঠি দিলেও তাতে কারা রয়েছেন তা প্রকাশ করা হয়নি।
তবে ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সার্চ কমিটিতে ৫ জনের নাম প্রস্তাব করেছেন। এরা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব এম এ করিম, সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন, সাবেক সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শক নুর মোহাম্মদ ও সাবেক তথ্য কমিশনার ড. সাদেকা হালিম। আর বিএনপি নাম প্রস্তাব করেছে সাবেক সচিব আসাফ-উদ-দৌলা, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. সালেহ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী’র। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক ও ড. তোফায়েল আহমেদসহ ৫ জনের নাম প্রস্তাব করেছে। ২০ দলীয় জোটের শরীক বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাবেক সচিব আসাফ-উদ-দৌলার নাম প্রস্তাব করেছে বলে জানা গেছে। কমিশনার হিসেবে ড. শাহদীন মালিক, ডঃ তোফায়েল আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ জে এম ফজলুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকীর নাম দিয়েছেন।
২০ দলীয় জোটের শরীক খেলাফত মজলিশ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাবেক সচিব আসাফ-উদ-দৌলার নাম দিয়েছে। আর কমিশনার হিসেবে ড. শাহদীন মালিক, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি, যাত্রাবাড়ি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদ হাসানের নাম প্রস্তাব করেছে। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও ৫ জনের নাম প্রস্তাব করেছে।
২০ দলীয় জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দু’জনের নাম প্রস্তাব করেছে। তাদের মধ্যে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছের হোসেনের নাম রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের মহানগর সভাপতি মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দি। তিনি জানান, কমিশনার হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ইকতেদার আহমেদ, দ্বিতীয় কমিশনার হিসেবে পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব আকতার হোসাইন ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মনিরুজ্জামান খানের নাম প্রস্তাব করেছেন। ব্রি. জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান ও কমিশনার হিসেবে নাম দিয়েছে জমিয়ত। এছাড়া, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. তাসনিম সিদ্দিকীর মধ্য থেকে যেকোনো একজনের নাম দলটি প্রস্তাব করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে প্রথমে সচিবালয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আসে। সেখানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও বিধি) আবদুল ওয়াদুদের কাছে পাঁচজনের নামসহ সিলগালা করা চিঠি পৌঁছে দেন তারা। এর পরপর ১২টা ৩৪ মিনিটে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ এসে নামের তালিকাসহ একটি খাম অতিরিক্ত সচিবের কাছে পৌঁছে দেন।
নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্যে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কাদের নাম প্রস্তাব করেছে- রিজভী বা গোলাপ তা প্রকাশ করেননি। খাম পৌঁছে দেওয়ার পর সাংবাদিকদের বিএনপি নেতা রিজভী বলেন, দলের হাইকমান্ড ও ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ আমার কাছে একটি মুখবন্ধ খাম দিয়েছেন, সচিবালয়ে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের কাছে খামটি দিয়েছি।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণে যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন তার প্রতিফলন প্রস্তাবিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে কাদের নাম প্রস্তাব তারা করেছেন জানতে চাইলে রিজভী বলেন, খামটি মুখবন্ধ, আমি কী করে বলতে পারব? এরপর তার কাছে খাম কে দিয়েছেন- কয়েকজন সাংবাদিকের এই প্রশ্নে তিনি বলেন, বিএনপির হাই কমান্ড আমাকে খামটি দিয়েছে।
সার্চ কমিটির বিষয়ে বিএনপির আস্থা আছে কিনা জানতে চাইলে রিজভী বলেন, সার্চ কমিটি নিয়ে দলের সংগ্রামী মহাসচিব প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারপরও দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে, দেশের মানুষের নাগরিক স্বাধীনতার স্বার্থে, দেশে শান্তি-স্থিতিশীলতা, এটার স্বার্থে যত দূর সম্ভব যে প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করা দরকার, মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পরিপূরণের স্বার্থে আমরা ইসি শক্তিশালীকরণে উপযুক্তদের নামের তালিকা দিয়ে গেলাম।
আওয়ামী লীগের পক্ষে নামের তালিকা জমা দেন দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ। ইসি গঠনে পাঁচজনের নাম পাঠানোর বিষয়ে গত সোমবার গণভবনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ এবং কার্যকরী কমিটির এক যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত হয় বলে সেগুলো জমা দিয়ে সাংবাদিকদের জানান ক্ষমতাসীন দলটির দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ।
তিনি বলেন, ওই সভায় উপস্থিত সবাইকে গোপনে পাঁচটি করে নাম দিতে বলা হয়। সেই নামের মধ্যে যে নাম বেশিবার এসেছে, সেই পাঁচটি নাম নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পরামর্শে সিল করা খামটি আমি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছি।
পাঁচজনের মধ্যে নারী সদস্য আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, খামের ভেতরে নারী সদস্যের নাম আছে কিনা বলতে পারব না। কারণ এটি সিল করা।
পাঁচ জনকে কী যোগ্যতায় বিবেচনা করা হয়েছে জানতে চাইলে গোলাপ বলেন, বিবেচনা ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড, স্বচ্ছতা ও তাদের যোগ্যতা; সব কিছু বিবেচনা করেই করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অগ্রাধিকার দিয়েই এদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিকেল চারটার দিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নামগুলো ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির কাছে দেওয়া হয়। কমিটির সদস্যরা এই নামগুলো যাচাই-বাছাই করতে বিকেল চারটার কিছু পরে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে বৈঠকে বসেন। বেলা পৌনে চারটার দিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম ও অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ সচিবালয় থেকে নাম নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদে চিঠি দেওয়া ২৭টি দলের মধ্যে ২৫টি দলের মোট ১২৫টি নাম তাঁরা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁরা নামগুলোর মধ্যে মিল খোঁজেননি। এটা অনুসন্ধান কমিটিই করবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, হয়তো একই নাম অনেকগুলো দল প্রস্তাব করেছে। সেটিই কমিটি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি দলগুলোর কাছে পাওয়া নাম যাচাই বাছাই করে ৮ ফেব্রয়ারির মধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দেবে। তাদের সুপারিশ থেকেই অনধিক পাঁচ সদস্যের ইসি নিয়োগ দেবেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ।

-ইনকিলাব

 

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 413 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ