সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুরবস্থা

Print

রোকেয়া লিটা:প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ করে ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরে কাজ করতে এসেছিলেন মামুন। চাকরির মেয়াদ ছিল এক বছর। যে কোম্পানিতে মামুন কাজ করতেন, মেয়াদ শেষে সেখানে আর কাজ না থাকায় তার চাকরি নবায়ন হয়নি। ফলে দেশে ফিরে এলেন মামুন। কিন্তু যে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে তিনি সিঙ্গাপুরে কাজ করতে গেলেন, চাকরি করে আর্থিক উন্নতি করা তো দূরের কথা, বিদেশ যাত্রায় বিনিয়োগকৃত অর্থই পুরোপুরি উঠিয়ে আনতে পারলেন না তিনি। এর অর্থ দাঁড়ায়, মামুন এক বছর ধরে ওই চাকরিতে শুধু শ্রমই দিয়ে গেলেন, বিদেশ যাত্রায় বিনিয়োগকৃত অর্থের সঙ্গে উপার্জনকৃত অর্থের বিশেষ ব্যবধান না থাকায়, অর্জন বলতে কিছুই রইল না। দেশে ফিরে আসার কিছুদিন পর তিন লাখ টাকা খরচ করে আবার সিঙ্গাপুরে কাজ করতে গেলেন মামুন। এবার অবশ্য এক বছর পরই চাকরি নবায়নের সুযোগ পেলেন তিনি। তবে শর্ত প্রযোজ্য। শর্তটি হলো, চাকরি নবায়ন করার জন্য কোম্পানিকে এক হাজার ডলার দিতে হবে। মামুনের অভিযোগ, সিঙ্গাপুরে চাকরি নবায়নের জন্য কোম্পানিকে কোনো ফি দেওয়ার নিয়ম না থাকায়, তার কোম্পানি কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নেয়। কাগজে-কলমে দেখানো হয়, মামুন কোম্পানির কাছ থেকে এক হাজার ডলার ঋণ নিয়েছে। চাকরি নবায়নের পরে, মামুনের বেতন থেকে ওই এক হাজার ডলার কেটে রাখা হয়। এভাবে মামুনের কাছ থেকে চাকরির মেয়াদ নবায়নের ফি নেয় কোম্পানি। কোম্পানির এই অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেও মামুন ওই কোম্পানিতেই কাজ করতে বাধ্য থাকে। কারণ, এক কোম্পানি ছেড়ে অন্য আরেক কোম্পানিতে কাজ করতে গেলে সে ক্ষেত্রে নবায়ন ফির দুই-তিন গুণ বেশি টাকা খরচ হবে। আবার চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে এলেও কোনো লাভ নেই। যে টাকা খরচ করে সে সিঙ্গাপুরে গিয়েছে, সেই টাকা উঠিয়ে আনতে পারবে না। তার চেয়ে বরং এক হাজার ডলার ফি দিয়ে ওই একই কোম্পানিতে চাকরি নবায়ন করে নেওয়াকেই সুবিধাজনক মনে করে মামুন। উলেল্গখ্য, এই নবায়ন ফি মামুনের দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ।

এটি শুধু একজন মামুনের জীবন-সংগ্রামের কাহিনী নয়। জীবিকার তাগিদে সিঙ্গাপুরে আসা বেশিরভাগ বাংলাদেশি শ্রমিকের অবস্থাই এ রকম। অভিযোগ আছে, কারও কারও ক্ষেত্রে এই নবায়ন ফির পরিমাণ আবার দুই-তিন হাজার ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশি শ্রমিকরা যাতে চাকরির মেয়াদ নবায়ন ফি নেওয়ার কারণে কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে না পারে, সেজন্যই কোম্পানিগুলো এমন ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়। শ্রমিকরা আরও জানান, কেউ যদি অভিযোগ করে যে কোম্পানি তার কাছ থেকে চাকরির মেয়াদ নবায়নের জন্য ফি নিয়েছে, সেক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো কাগজে-কলমে দেখায় যে ওই শ্রমিক কোম্পানির কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল। তাই কোম্পানি ওই শ্রমিকের বেতন থেকে ঋণের টাকা কেটে রেখেছে। মূলত সিঙ্গাপুরে পরিচালিত কিছু চাইনিজ কোম্পানিতেই বাংলাদেশি শ্রমিকরা এ ধরনের অনিয়মের শিকার হচ্ছেন বেশি বলে অভিযোগ বাংলাদেশি শ্রমিকদের। অবশ্য সিঙ্গাপোরিয়ান কোম্পানিগুলোতে কাজের পরিবেশ এবং নিয়ম-কানুন বেশ ভালো বলে জানালেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এছাড়া কিছু কিছু চাইনিজ কোম্পানিতে চাইনিজ শ্রমিক এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে বেতন বৈষম্যও আকাশ-পাতাল বলে অভিযোগ করেছেন অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক। বাংলাদেশি শ্রমিক গিয়াস বলেন, যে কাজের জন্য একজন চাইনিজ শ্রমিক পায় দিনে ষাট ডলার, অথচ সেই একই কাজের জন্য একজন বাংলাদেশি শ্রমিক পায় দিনে মাত্র ২০ ডলার। এছাড়া এসব চাইনিজ কোম্পানিতে কাজের চাপও বেশি বলে জানালেন ওই বাংলাদেশি শ্রমিক। কখনও কখনও কর্মঘণ্টা বাড়তে বাড়তে ১৫-২০ ঘণ্টাও হয়ে যায়। অথচ সেই অনুযায়ী ওভারটাইম সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ বাংলাদেশি শ্রমিকদের।

সিঙ্গাপুরে আসা আরও কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে কথা হলো তাদের আবাসন নিয়ে। এখানেও অভিযোগ সেই চাইনিজ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে। তারা অভিযোগ করেন, কিছু কিছু কোম্পানির আবাসন ব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে, এক রুমে ১০-১২ জন করে ঘুমাতে হয়। ঘুমানোর জন্য দেওয়া হয় দোতলা-তিনতলা খাট। তিনতলা খাটে প্রায় এক বছর ঘুমিয়েছেন এমন একজন বাংলাদেশি শ্রমিক বললেন, এই খাটে বসে থাকার কোনো উপায় নেই। খাটে উঠে সোজা শুয়ে পড়তে হয়। কোনো কারণে যদি কেউ ঘুমের মধ্যে উঠে বসতে যায়, নিশ্চিত ঘরের ছাদের সঙ্গে লেগে মাথায় আঘাত পেতে হয়। এসব খারাপ খবরের পাশাপাশি কিছু ভালো খবরও আছে। সিঙ্গাপোরিয়ান বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত কয়েকজন বাংলাদেশি অবশ্য বলছেন, তাদের আবাসন ব্যবস্থা সন্তোষজনক। তারা একরুমে দু’জন করে ঘুমান এবং প্রত্যেকের জন্য পৃথক পৃথক খাটও রয়েছে সেখানে।

এখানে কাজের বিনিময়ে যেমন ডলার আয় করছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে অনেকে অনেক ধরনের দুর্ঘটনার শিকারও হচ্ছেন। বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিকদের অনেক উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণের সময় এ ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানালেন, ক্ষতির মাত্রার ওপর নির্ভর করে ইন্স্যুরেন্স দেওয়া হয় তাদের। তবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিযোগ, কিছু কিছু চাইনিজ কোম্পানিতে শ্রমিক অসুস্থ হলে তার ছুটি বা চিকিৎসার ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই। অসুস্থ হয়ে যে কাজে আসতে পারবে না, তার ওইদিনের মজুরি কেটে রাখা হয়।

তবে কাজের এমন বিরূপ পরিবেশ কিন্তু বাংলাদেশি শ্রমিকদের মনোবল ভাঙতে পারেনি মোটেও। এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশি শ্রমিকরা সিঙ্গাপুরে কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। সিঙ্গাপুরের নির্মাণ শিল্পে এবং শিপইয়ার্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এ কারণে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদাও রয়েছে। শ্রমিকদের মনোবল ভেঙে যায় তখনই, যখন কাজের জন্য সিঙ্গাপুরে আসতেই খরচ হয়ে যায় সাত-আট লাখ টাকা। বাংলাদেশি শ্রমিকদের দাবি, বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে শ্রমিকদের কাজ করতে সিঙ্গাপুরে আসতে হয়, তার এক-চতুর্থাংশও খরচ হতো না, যদি কোম্পানিগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতো এবং সরকারি হস্তক্ষেপ থাকত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিতদের মাধ্যমে কয়েক ধাপে টাকা খরচ করে বাংলাদেশি শ্রমিকরা সিঙ্গাপুরে আসছে কাজ করতে। যদি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে শ্রমিকদের সরাসরি যোগাযোগের উপায় থাকত বা জি-টু-জির ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো, তাহলে শ্রমিকদের সিঙ্গাপুরে কাজ করতে যাওয়ার খরচ অনেক কমে যেত বলে দাবি বাংলাদেশি শ্রমিকদের। বাংলাদেশ সরকারের তত্ত্বাবধানে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে কোম্পানি যদি বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে কোনো অনিয়ম করে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার সরাসরি তার ব্যবস্থাও নিতে পারত। কিন্তু বর্তমানে অবস্থা এমন যে, কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে যত স্বেচ্ছাচারিতামূলক বা বৈষম্যমূলক আচরণই করুক না কেন, বাংলাদেশি শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলার যেন কেউ নেই।

ইদানীং অবশ্য নতুন একটি মানসিক চাপ নিতে হচ্ছে সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের। কিছুদিন পরপরই বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ উঠছে। এতে করে বাংলাদেশি শ্রমিকরা মনে করছেন, জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত সামান্য কিছু বাংলাদেশির কারণে সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ, এসব অভিযোগ সিঙ্গাপুরে অবস্থিত বাংলাদেশিদেরও ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। শ্রমিকদের আশঙ্কা এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ শ্রমিকদের ওপরও। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য কাজের সুযোগও কমে যেতে পারে সিঙ্গাপুরে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 67 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ