সিরিয়ায় গিয়ে ভুল ভাঙল কামরুস সালামের

Print
কামরুস সালামডেসকোর সাবেক কর্মকর্তা গাজী কামরুস সালামের (সোহান) বলতে গেলে কেউ নেই, মা ছাড়া। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ক্যানসারে ভুগে এই মা যখন মারা গেলেন, তখন ইন্টারনেটই হয়ে উঠল তাঁর একমাত্র বন্ধু। এক্স-ক্যাডেট ইসলামিক লার্নিং ফোরাম নামের একটি গ্রুপে যোগ দিয়ে ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন এই ছাত্র খুঁজে নিলেন বন্ধুদের। তাঁদের অনুপ্রেরণায় নির্যাতিত মুসলিমদের মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে সিরিয়ায় গেলেন। স্বপ্নভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। দেখলেন, আইএস–সমর্থকেরা মুসলমান হয়ে নির্বিচার মুসলমানদেরই হত্যা করছে। মানুষ পুড়িয়ে মারার দৃশ্য প্রচার করছে প্রজেক্টরে। নারীদের ব্যবহার করছে যৌনদাসী হিসেবে। সহ্য করতে না পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে এলেন ছয় মাসের মাথায়। জবানবন্দিতে এসবই বলেছেন তিনি।
গাজী কামরুস সালাম সিরিয়া থেকে দেশে ফেরেন ২০১৫ সালের ১৫ মে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কাউকে না জানিয়ে স্কাইপের মাধ্যমে বিয়ে করেছেন পুরোনো প্রেমিকাকে। তিনি তখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে মরিয়া। কিন্তু ১০ দিনের মাথায় সাদাপোশাকে একদল লোক তাঁকে তুলে নেন। অজ্ঞাত স্থানে জিজ্ঞাসাবাদের পর গত বছরের ১৭ নভেম্বর র‍্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, মোহাম্মদপুর থেকে চক্রান্ত করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছেন গাজী কামরুস সালাম। তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে আরেকটি মামলা আছে। তিনি এখন কারাগারে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া ও গণসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান নিশ্চিত করেছেন, কামরুস সালাম সিরিয়ায় গিয়েছিলেন।

কে এই কামরুস সালাম
কামরুস সালামের বাবা গাজী আবদুস সালাম ঢাকাসহ চার বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। অবসরে যাওয়ার অল্প কয়েক বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কামরুস সালাম দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। লেখাপড়ার শুরু ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে চলে যান মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে। ক্যাডেট কলেজে ভর্তির পরপরই বাবা মারা যান। এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে। কামরুস সালাম বা তাঁর মা-বোনের সঙ্গে গোপালগঞ্জের আড়পাড়ায় তাঁদের আত্মীয়স্বজনের তেমন একটা যোগযোগ ছিল না। কামরুস সালামের স্বজনেরা এ তথ্য জানিয়েছেন।

এয়ারপোর্ট থানার উপপরিদর্শক জহিরুল ইসলাম মুন্না অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি  বলেন, ‘সোহান খুব ভালো ছাত্র। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সে তার একাডেমিক ক্যারিয়ারের কথা বারবারই বলেছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়েছে, আইইউটিতে ষষ্ঠ, ডেসকোতে সাত হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে সপ্তম। আত্মীয়স্বজনও শিক্ষিত ও প্রভাবশালী। একবার শুধু বোনটা এসেছিল। আর কেউ খোঁজ নেয়নি।’

যেভাবে সিরিয়ায়
২০০৮ সালে গাজীপুরের আইইউটিতে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির পর মুসলিম রাষ্ট্রগুলোয় যুদ্ধবিগ্রহের গল্প শুনতেন সহপাঠীদের কাছ থেকে। কামরুস সালাম যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র, সিরিয়ায় তখন গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তিনি জানতে পারেন, বাশার আল-আসাদের সেনাবাহিনী থেকে সুন্নিরা আলাদা হয়ে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি গঠন করেছে। তারা আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। গল্পের প্রথম পর্বের শেষ এখানেই।
২০১১ সালের অক্টোবরে লেখাপড়া শেষে কামরুস সালাম এনার্জিপ্যাকে চাকরি নেন। থাকতেন প্রতিষ্ঠানের কারখানা সাভারেই। প্রায় ১০ মাস সেখানেই ছিলেন। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। ১০ মাসের মাথায় ডেসকোতে যোগ দেন। কামরুস সালাম যখন তাঁর ক্যারিয়ারে থিতু হয়ে এসেছেন, তখনই তাঁর মায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। নয় মাসের মাথায় মা মারা যান।

কামরুস সালাম বলেন, কঠিন সেই সময়ে তিনি এক্স-ক্যাডেট ইসলামিক লার্নিং ফোরাম নামের একটি গ্রুপের সন্ধান পান ইন্টারনেটে। এর অ্যাডমিন ছিলেন সিলেট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র সাইফুল্লাহ ওজাকি। লেখালেখি কম করতেন তিনি। কামরুস সালাম উদ্বুদ্ধ হন মূলত আমিন বেগের লেখা পড়ে। আমিন বেগ ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি ফেসবুকে কামরুস সালামকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। ধানমন্ডি ৭ নম্বরের একটি মসজিদে তাঁদের দেখা হয়। আমিন বেগই তাঁকে সিরিয়ায় গিয়ে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি সাইফুল্লাহ ওজাকির সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় করিয়ে দেন কামরুস সালামকে।

সাইফুল্লাহ ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে আসেন চার-পাঁচ দিনের জন্য। উত্তরায় আইসক্রিম খেতে খেতে সাইফুল্লাহ বলেন, শিগগির একটা কোনো ব্যবস্থা হবে। সাইফুল্লাহর পরামর্শে কামরুস সালাম বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া হয়ে ৯ ডিসেম্বর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পৌঁছান। সাইফুল্লাহর পরামর্শমতো কামরুস সালাম সিরিয়া যাওয়ার আগে দুই লাখ টাকা সংগ্রহ করেন।

সিরিয়ার জীবন
২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর কামরুস সালামের সঙ্গে ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে যোগ দেন সাইফুল্লাহ। সেখান থেকে দুজন মিলে যান হাতাই বিমানবন্দরে। আবু বারা নামে সিরীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার এক নাগরিক তাঁকে সিরিয়ার উদ্দেশে বাসে তুলে দেন, সঙ্গে দেন ছয়টি ফোন নম্বর। যেকোনো একটিতে তিনি কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবেন বলে জানান আবু বারা। কামরুস সালাম পেয়েও যান। একটি মাইক্রোবাসে এক ঘণ্টার যাত্রার পর একটি ভাঙাচোরা রাস্তায় গিয়ে তাঁরা পৌঁছান। সেখান থেকে দৌড়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন। মাইক্রোবাসে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সবাই কিন্তু আইএসে যোগ দিতে যাননি। তাঁদের মধ্যে জাবহাত আল নুসরা, আইএস ইসলামিক ফ্রন্ট, আহরার আল শামের সদস্যরাও ছিলেন। সিরিয়ার কোনো এক গ্রামের একটি দোতলা বাড়িতে কামরুস সালামকে থাকতে দেওয়া হয়। কয়েক দফা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কামরুস সালাম ও তাঁর সঙ্গীদের পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, ক্যামেরা, ল্যাপটপ নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয় আইএসের লোকজন। সেখানে সবাই সবাইকে সন্দেহ করত।

অল্প কিছুদিনের মাথায় কামরুস সালাম প্রকৌশল বিভাগের অধীনে রাকার পাওয়ার স্টেশন মেরামতের কাজ পান। সে সময় নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে তাঁদের যাওয়া নিষেধ ছিল। কামরুস সালাম তাঁর বিভাগের প্রধানের অনুমতি নিয়ে একটি স্যামসাং মোবাইল ফোন কিনে ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে বাড়িতে বোন ও সাইফুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেন। স্কাইপেতে তাঁর সঙ্গে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ছাত্র নজিবুল্লাহ আনসারীরও যোগাযোগ হয়। নজিবুল্লাহ সে সময় তুরস্কে ছিলেন। কিন্তু তিনি আর সীমান্ত অতিক্রম করে সিরিয়ায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন কি না, সে ব্যাপারে আর জানতে পারেননি তিনি।

স্বপ্নভঙ্গ
রাকায় তিউনিসিয়ার এক শিক্ষকের অধীনে প্রশিক্ষণ শুরু হয় কামরুস সালামদের। শুক্রবার ছাড়া তখনো বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ তাঁদের। কামরুস সালাম শিক্ষকের কাছে জানতে চান আইএসের সঙ্গে বাশার আল-আসাদবিরোধী অন্য গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক কেমন। সেই শিক্ষক উত্তর দেন, অন্য গ্রুপগুলো বাশার আল-আসাদের পাশাপাশি আইএসের সঙ্গেও যুদ্ধ করছে। কামরুস সালাম বলেন, তারাও তো সিরিয়ার নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য যুদ্ধ করছে। তখন সেই শিক্ষক উত্তর দেন, তাদের মতাদর্শ আর আইএসের মতাদর্শ এক নয়। আইএস চাইছে যতটুকু এলাকা আইএসের দখলে সেগুলোকে রক্ষা করা ও আশপাশের এলাকা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে এলাকা বাড়ানো। এর জন্য যদি মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধও করতে হয়, তারা পরোয়া করে না। এ কথা শোনার পর কামরুস সালাম প্রথম ধাক্কা খান। তিনি বুঝতে পারেন তিনি একটা রাজনৈতিক চালের মধ্যে পড়ে গেছেন।

ধীরে ধীরে নির্মমতার দৃশ্যগুলোও দেখতে শুরু করেন কামরুস সালাম। তিনি বলেছেন, একদিন সকালে রাকা শহরে বিমান হামলা হচ্ছিল। জর্ডানি একজন বৈমানিক প্যারাস্যুট দিয়ে নিচে নেমে আসেন। তিন দিন পর রাকা শহরের রাস্তার পাশে এক প্রজেক্টরে তাঁকে পুড়িয়ে মারার ভিডিও দেখানো হয়। ইসলামিক কোর্স শেষ করার জন্য কামরুস সালাম শহরে ঘোরার অনুমতি পান। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সময় এক ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ট্যাক্সিচালক ব্রিটিশ উচ্চারণে ইংরেজি বলছিলেন। রাকা শহরে সব ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁকে ট্যাক্সি চালানোর কাজ নিতে হয়েছে বলে তিনি জানান। কামরুস সালাম আইএস তাঁদের ওপর জোর জবরদস্তি করছে কি না জানতে চাইলে তিনি চুপ করে যান।
আইএসর যোদ্ধাদের কাছ থেকে শোনেন দাসী কেনাবেচার কথা। দাসীদের ভরণপোষণের জন্য প্রত্যেকে ৫০ ডলার করে পেতেন। নারীদের ওপর এই যৌন নির্যাতন একটা ‘ঘৃণ্য’ কাজ বলে মনে হয় তাঁর কাছে।

কামরুস সালাম একপর্যায়ে দেশে তাঁর এক প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, সিরিয়ার প্রকৃত অবস্থাটা কী। ধারাবাহিক কথাবার্তার পর কামরুস সালাম ঝুঁকি নিয়েই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সমস্যা হলো পাসপোর্ট। অফিসে গিয়ে পাসপোর্ট চাইলেন, কিন্তু ফেরত পেলেন না। তারপর ১২ মে কামরুস সালাম আবারও পাসপোর্ট চাইলেন। বললেন, তিন ঘণ্টার জন্য পাসপোর্টটা দরকার। দেশে জমিজমা বিক্রির ব্যাপার আছে। তিনি তাঁর বোনকে পাসপোর্টের কপি স্ক্যান করে পাঠাবেন। পাসপোর্টটা হাতে পেয়ে কামরুস সালাম আর পেছনে ফিরে তাকাননি। তিনি রাকা শহরের শেষ প্রান্তে চলে যান। তাঁর কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের কার্ড থাকায় সহজেই তিনি একটি ট্রাকে ওঠার সুযোগ পান। ওই ট্রাকটি তেলাবিয়াদে গিয়ে পৌঁছায় রাত সাড়ে নয়টার দিকে। সেখান থেকে তুরস্কের একটা শহর ও জাতীয় পতাকা দেখা যাচ্ছিল। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি সিরিয়া থেকে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নেন। আইএসের সীমান্তরক্ষীরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, এত রাতে তিনি কী করছেন। জবাবে কামরুস সালাম বলেন, বাসায় যাওয়ার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়েন। ঘণ্টা খানেক বা দু-এক ঘণ্টা পর একটা সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছান। সেখান থেকে তুরস্কের একজন সেনা কর্মকর্তা তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। তুরস্কের পুলিশ তাঁকে দেশে পাঠিয়ে দেয়। ২০১৫ সালের ১৫ মে তিনি বাংলাদেশে এসে পৌঁছান। পাসপোর্টে ‘ডিপোর্টেড’ সিল না থাকায় তিনি একরকম বিনা বাধায় বিমানবন্দর থেকে ছাড়া পান ও বাসায় পৌঁছান। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না।

কী হবে কামরুস সালামের
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তারা বলছিলেন, ভুল বুঝে দেশে ফেরার পরও গাজী কামরুস সালামকে কারাগারে থাকতে হচ্ছে। দেশে পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই। অথচ কামরুস সালামের এই অভিজ্ঞতা আইএস সম্পর্কে যে তরুণেরা নানা ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে আছে, তা দূর করতে পারত।

-প্রথম আলো

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 208 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ