সিলেটের পথশিশুরা মরণনেশায় আসক্ত

Print

madok-amarbdসিলেটের পথশিশুরা ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, নদীর তীরে বসে ড্যান্ডি সেবন করে এসব শিশু। জুতা কিংবা ফোমে ব্যবহৃত সলিউশন (আঠা) পলিথিনে ভরে কিছুক্ষণ পরপর মুখের সামনে নিয়ে শ্বাস টেনে নেশা করে তারা। মাদক সেবনের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে খুনোখুনিরও ঘটনা ঘটছে। এই আঠা নিষিদ্ধ কোনো বস্তু না হওয়ায় এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তবে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা শিশুদের কাছে এটি বিক্রি না করার জন্য ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চেয়েছেন। দক্ষিণ সুরমার রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ডগেরপাড়, কিন ব্রিজের নিচে, কাজীরবাজার সেতু, শাহজালাল সেতু, কুশীঘাট, ছড়ারপাড়, কাষ্টঘর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কিছু পথশিশু বসে ঝিমুচ্ছে আর পলিথিন দিয়ে কী যেন করছে।
করিম, খোকন ও শিমুল। আনুমানিক ৮/৯ বছর বয়সের তিন শিশুর বসবাস সিলেট রেলস্টেশন এলাকায়। এই বয়সে ওদের চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। থাকবে ইচ্ছা, সাধ ও আহলাদ। বই খাতা হাতে নিয়ে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা। অথচ এরাই এখন সবচেয়ে বিপথগামী। মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে তারা এখন নিশ্চিত অন্ধকারের পথে।
এখানে তোমরা কি করছো? এমন প্রশ্নের সহজ জবাব, ড্যান্ডি খাচ্ছি, খাবেন? এগুলো তো নেশাজাতীয়, খাওয়া ঠিক না। এছাড়া তোমরা শিশু, তোমরা এগুলো খেলে বাঁচবে না, মরে যাবে। এমন কথাতে ওরা কর্ণপাত করেনি। উল্টো প্রশ্ন, আপনি এসব জিগাইতেছেন কেন?
কিশোরগঞ্জের ছেলে করিম। ছোটবেলায় মায়ের কোলে করে সিলেটে এসেছে। যখন সে হাঁটতে শিখেছে তখনি মা তাকে ফেলে কোথায় যেন চলে গেছে। এই সাত বছর বয়সেও মাকে খুঁজে পায়নি করিম। কিছুটা আদর দিয়ে কথা বললে করিম জানায়, তারা সবাই মিলে দিনের বেলা টার্মিনাল এলাকায় প্লাস্টিকের বোতল কুড়ায়। সন্ধ্যায় সেগুলো ভাংগাড়ী দোকানে বিক্রি করে ড্যান্ডি খেতে চলে আসে রেলস্টেশন এলাকায়। রাতে স্টেশনেই শুয়ে থাকে করিমরা।
ড্যান্ডি কিভাবে তৈরি হয় জানতে চাইলে শিমুল জবাব দেয়, জুতা তৈরির আটা দিয়ে পলিথিনে ঢুকিয়ে ড্যান্ডি তৈরি করা হয়। এটি খাইলে মনের দুঃখ থাকে না। ক্ষুধাও লাগে না।’ প্রতিদিন তাদেরকে ড্যান্ডির স্বাদ নিতেই হয়।  পুরাতন রেলস্টেশন থেকে একটু আগ বাড়িয়ে নতুন রেলস্টেশন হয়ে বের হওয়ার পথে পাওয়া গেল আরো কয়েকজন বিপথগামী শিশুকে। তারাও একই কায়দায় ড্যান্ডিপান করছে। ওদের ছবি তুলতে চাইলে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
বঞ্চিত শৈশবে সাময়িক সুখ এর প্রত্যাশায় অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে এই শিশুরা। জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে ওদের জীবন। জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। মাদক বহনের ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব শিশু। চুরি ছিনতাইয়েও জড়িয়ে পড়ছে এরা। এ সকল শিশু মাদকসেবীদের পুনর্বাসনে সরকারী কোন উদ্যোগই কাজে আসছে না। শিশু অধিকার আইনে এদের শাস্তির তেমন কোন ব্যবস্থা না থাকায় সহজেই এরা বিপথগামী হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) বিভুতি ভূষণ ব্যানার্জী বলেন, শিশু অধিকার আইনে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই কঠিন। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তর এ সকল মাদকাসক্ত শিশুদের উদ্ধার করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। প্রয়োজনে পুলিশ সমাজসেবা অধিদপ্তরকে সহায়তা করবে। তিনি আরো বলেন, এ সকল মাদকাসক্ত শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা না হলে এরা বিপথগামী হয়ে পড়বে। এরা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়লে সমাজ অন্ধকারের পথে চলে যাবে। কাজেই এদের রক্ষার্থে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন এ সকল মাদকাসক্ত শিশুদের উদ্ধারের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর এ সকল শিশুদের উদ্ধার করে ভাল পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারে। এদেরকে সুপথে ফিরিয়ে না আনলে অপরাধ বাড়বে। সমাজ ও দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 83 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ