সিলেট এম সি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জাফরিনের করুন কাহিনী

Print

সিলেট এম সি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জাফরিনের করুন কাহিনী ॥ ভূয়া কলেজ ছাত্র ও লন্ডনী সেজে বহুল আলোচিত প্রতারক প্রেমিক লিটন দেশ ছেড়ে বিদেশে চম্পট

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা॥
স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশ নিয়ে যাওয়ার মিথ্যা প্রলোভনে কয়েক দফায় ৪৫ ভরি স্বর্ণলঙ্কার ও ২লক্ষ ৮০হাজার টাকা আত্মসাতের ঘটনায় প্রতারক প্রেমিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের। এ ঘটনায় তদন্তে নামে পুলিশ। জানতে পারে তার নাম সুহেল আহমদ নয় মোঃ সালমানও নয়। এমন কি সে বিদেশ ফেরতও নয়। সে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কুর্শি ইউনিয়নের ঘোলডুবা গ্রামের মৃত সুজন মিয়ার পুত্র তার প্রকৃত নাম লিটন মিয়া। অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানাযায়, গত বছরের ২০১৬ ইংরেজী
সালের ৪ মে। সে দিন শেষে রাত নামতেই বিশ্ব মুসলিমদের পবিত্রতার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর সাথে আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাতের স্মৃতি বিজরিত পূণ্যময় ওই মেরাজের রাত্রি। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার আলমপুরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মোঃ নরুল হক ওরফে রুনু মিয়ার পরিবার সহ রুনু মিয়ার কন্যা সিলেট এমসি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাফরিন নাসরিনও ইবাদতে মনোযোগী ছিল। তখন সে আঙুল দিয়ে তসবিহ গুনছে। তবে, জাফরিনের মন যেন নেই কোথাও! এ বিষয়টি তার বাবাও আচ করতে পারেন। তবে, জাফরিনকে কিছুই বুঝতে দেন নি। যে তার মেয়ের মন ভালো থাকার কথা নয়, অনেক দিন ধরে মানসিক ভাবে ভেঙ্গেঁ পড়েছে তার আদরের ছোট মেয়েটি। সিলেট এমসি কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র সুহলে আহমদ। এবং স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী। সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এ পরিচয়েই বেশ কিছু দিন পূর্ব থেকেই জাফরিন নাসরিনের সাথে পরিচয় হয়। পরিচয়টা এক সময় গভীর হয় তারা দুজনের মধ্যে। নিয়মিত ফোনেও কথা হয় তাদের। দেখা- সাক্ষাতও হয় মাঝে মধ্যে। জাফরিনকে
নানা ধরনের রঙ্গীন স্বপ্নও দেখায় সুহেল। স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশ সাথে নিয়ে যাওয়ারও স্বপ্ন জাফরিনের চোখে এঁকে দেয় সে। তার কথায় ২০১৫ইংরেজী সনের ১৮ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর প্রীতিরাজ রেস্টুরেন্টের দ্বিতীয় তলায় দেখা হয় জাফরিনের সাথে। ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সুহেলের হাতে তুলে দেয় জাফরিন। এতে সুহেল জানায়, বিদেশ নিয়ে যেতে হলে আরো টাকার প্রয়োজন। এর গত ২০১৬সালের ২৫ নভেম্বর একই স্থানে আবারও দেখা হয় সুহেলের মা ও মামার সাথে। তাদের উপস্থিতিতেই ২৪ ভরি স্বর্ণালঙ্কার তুলে দেন জাফরিন। জাফরিনের ছোট চাচি লেবেনা আক্তার লুবনা হঠাৎ একদিন তার একটি আংটি খোঁজাখুজি করে না পেয়ে অবশেষে গয়না রক্ষিত বাক্সটি খুলে দেখেন বাক্সের ভিতরে নেই হাতের বালা (চুড়ি) ও দুই দামী স্বর্ণের আংটি। এসময় লুবনার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। উক্ত বিষয় সর্ম্পকে তিনি অবগত করেন, তার মেজো (ঝাল) শারমীনা আক্তার সাথে। তিনিও একই ভাবে চমকে যান, তাৎক্ষনিক সময় সহ চলমান সময় পর্যন্ত ভয়ভীতি সব সময়ই তার মনের মধ্যে ভয় থাকে। এর পরে মনের মধ্যে ভয় নিয়ে গয়নাকড়ি খুজতে থাকে। তারও মাথায় হাত পড়ে। সখের জিনিস ১৪ ভরি ওজনের গহনা সেট দুবাই থেকে আনানো আর মাত্র
২/৩দিন ব্যবহারের আর ব্যবহার হয়নি তার। মুহুর্তেই পুরো বাড়িতেই হইচই শুরু হয়। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, জাফরিনের মা জামিলা খানমের ৭ ভরি স্বর্ণালংকারও নেই। বাড়িতে অবস্থানরত লোকজন সন্দেহের দৃষ্টিতে অনেকই পড়েন। তবে, জাফরিনের ভাই আইনের
শিক্ষার্থী নোমানুল হক জুনেদের সন্দেহ তার ছোট বোনের প্রতি। অনেক দিন ধরেই তার আচার-আচরণ ও চলন ভঙ্গি কেমন জানি যেন মনে হচ্ছিলো ঠিক সময় মতো বুঝে ওঠা সম্ভব্য হয়নি এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বোন তাহমিনা নাসরিনও আগে অভিযোগ করে ছিলেন সে গভীর রাতে প্রায়ই ফোন ব্যস্ত পাওয়া যাওয়া তাকে। ঘটনার সময়ে জাফরিন কলেজ পড়–য়া ছাত্রী ছিল। বাসা থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে বাসায় আসার তাগিত দেন। জাফরিন বাসায় অাশার পর তাকে জিজ্ঞাস করা হলে সে জানায়, জাফরিন স্বর্ণলঙ্কারের কথা বলে এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। উপায়ন্তর না পেয়ে পীর ফকিরের আশ্রয় নেয় জাফরিনের পরিবার। এতেও কিছুতেই কিছু যেন হচ্ছে না। নানা কারনে জাফরিনের প্রতি সন্দেহ বাড়তে থাকে তার পরিবারের। হঠাৎ একদিন তার বাবা জাফরিনকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, কেউ কিছু বলবে না, তোমার কি হয়ে আমাকে খুলে বল। পরে বিষয়টি বাবার কাছে স্বীকার করে জাফরিন। সে আরো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পরিচয় হয় সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার এড়াইল্যা গ্রামের সুহেল আহমদের সাথে। তার কথা বার্তা চলছিল। সিলেট এমসি কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র সুহেলই তাকে যুক্তরাজ্য যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে বলে তার কাছ থেকে দফায় দফায় স্বর্ণালঙ্কার লুটে নেয়। আর নগদ টাকা নিয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার। যা জাফরিন তার বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে এনে দিয়েছিল। প্রতারনার মাধ্যমে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে পরিবারের লোকজন ছুটে যান সুহেলের বাড়ি এড়াইল্যা গ্রামে। সেখানে ঠিকই সন্ধান মেলে সুহেল আহমদের যে এমসি কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র। তবে, সে সুহেল নয়। এ ভারতো বুঝতে পারছেন জাফরিনের কাছে ভুল পরিচয় দিয়েছে তার পরিচিত লোকটি। পরে জাফরিনের পরিচিতি লোকটির আরেকটি না মোঃ সালমান। যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নামে তার অ্যাকাউন্টেরও সন্ধান মেলে। এ ব্যাপারে জাফরিনের পরিবারের লোকজনের পরামর্শে সালমানের মোবাইলে যোগাযোগ করে বলেন, টাকা ও স্বর্ণের বিষয়টা আমার পরিবারবর্গে লোকজন জেনে গেছে। এখন তারা গয়না ও টাকা ফেরত চাইছেন। সালমান আশ্বস্ত করে বলে, অন্যের জিনিসের প্রতি আমার কোন লোভ লালসা নাই। সব কিছুই আমি আপনার ফেরত দিয়ে দিব। তবে, বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন তারিখ দেয় সালমান। সব শেষে গত এপ্রিলের ১৩ তারিখ টাকা ও স্বর্ণালংকার ফেরত দেওয়ার কথা জানায়। নিশ্চয়তা দেয় ৭শ হাজার পার্সেন্টের। পরিবারের পরামর্শে সব আলাপ রেকর্ড করে জাফরিন। সুহেল আহমদ ওরফে সালমানের মোবাইল ফোন নাম্বার ও আলাপের বিভিন্ন সিডি পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী। জাফরিনের বাবা বাদী হয়ে কতোয়ালী থানায় একটি মামলা (০৭) দায়ের করেন। এদিকে গয়না ও স্বর্ণালকার ফেরত দেওয়ার যেদিন কথা ছিল সেদিন বারবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। কৌশল অবল্বন করে অচেনা লোক দিয়ে ঐ নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে সে জানায়, সিলেটের কামাল বাজারে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে লিটন আহমদ। তাকে আশঙ্কাজন অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর থেকেই তার ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। এমন কি প্রতিনিয়তই বিভিন্ন স্থানে তার বন্ধু বন্ধবকে নিয়ে মদ পান করতো। এসব ঘটনায় মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছেন জাফরিন নাসরিন। কারো সাথে তিনি কথা বলছেন না, খাওয়া দাওয়াও বলতে গেলে ছেড়েই দেন। নামাজ ইবাদতে মনোযোগী হন। ২০১৬ সালের ৪ মে শবে মেরাজের সন্ধ্যা থেকেই এমনি ভাবে বসে ছিলেন জায়নামাজে। বাসায় অন্যরাও ইবাদতে। বাবা বাসায়ই ছিলেন, চাচারা ছিলেন মসজিদে। রাতে যখন চাচা নাজমুল হক ফিরে আসেন, তখন জাফরিনের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে তার রুমে চলে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন যে জাফরিনের রুমের দরজা ভিতর দিকে বন্ধ। কয়েক বার ডাকাডাকির পর ধাক্কা দেন তার দরজায়। অনেক ধাক্কাধাক্কি পরও সাড়া না পেয়ে অবশেষে তিনি ভেন্টিলেটর দিয়ে উকি দিয়ে দেখেন ঘরের কড়িকাঠের সাথে গলায় ফাঁস বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে তার ভাতিজি! তিনি চিৎকার দিয়ে উঠেন। পরে সবাই মিলে দরজা ভেঙ্গে নামিয়ে আনেন জাফরিনের নিথর দেহ। এ ঘটনায় পুলিশের কাছে খবর দেওয়া হলে তারা ঘটনাস্থলে পৌছে ঘটনাস্থল পরির্দশ করে সাধারণ আত্মহত্যা হিসাবে অপমৃত্যুর একটি মামলা হয়। তবে এটাকে সাধারণ আত্মহত্যা হিসাবে মানতে চায়না জাফরিনের বাবা নুরুল হক। তিনি মামলা করতে চান লিটন, তার মা ও মামার বিরুদ্ধে। কিন্তু মোগলা বাজার থানাও মামলা নেয় নি। ২৫ আগষ্ট মামলা করতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কোন উপায় না দেখে আদালতের শরণাপন্ন হন জাফরিনের বাবা নুরুল হক। ২৯ আগষ্ট সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা (৪৪৬) দায়ের করেন। পরে গত ৮ই সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে মোগলা বাজার থানা সেটিকে নিয়মিত মামলা (৫) হিসাবে গ্রহণ করে।
সেই মামলার তদন্তও চলছে। আর এরই সুযোগে ফাঁকে দিয়ে লিটন পালিয়ে যায় দেশ ছেড়ে। এদিকে জাফরিন নাসরিনের বাবা ও তার পরিবার এখন আছেন ন্যায় বিচারের অপেক্ষায়। এ রকম ডজন খানেক ঘটনা ঘটিয়েছে ওই প্রতারক লিটন। সে ভিবিন্ন সময় বিভিন্ন ছদ্ধ নামে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় প্রতারণার মাধ্যমে অনেক ধন্যঢ্য/অসহায় সুন্দরী যুবতি নারীকে নানা রকম প্রলোবন দিয়ে পুষলিয়ে সর্বশান্ত করে অনেক পরিবারে। তার এই প্রতারণা শিকার হয়ে জাফরিনের মত আত্ম হননের পথও বেঁচে নিয়েছেন বলে সূত্রে প্রকাশ। সচেতন মহলের প্রশ্ন আইনের ফাক পোকর থেকে ঘাতক
লিটন কি রক্ষা পেয়ে যাবে? নতুবা লিটনকে ইন্টাপোলের মাধ্যমে বিদেশ থেকে দেশে এনে ফাঁসির দাবী করেন জাফরিনের পরিবার। তার মা রায়জান বিবি ও মামা ওসমান গণিকে সাথে নিয়ে তার এই জাল জালিয়াতির সিন্ডিকেট। এভাবে অনেক মেয়ের সাথে প্রতারণা করে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার হাতি নিয়ে সে বিভিন্ন স্থান থেকে পালিয়েছে, অবিবাহিত নয়, ইতোমধ্যেই লিটন মিয়া তিনটি বিয়ে করেছে। পুলিশ লিটনকে আটক না করতে পারলেও তার মামা ওসমান গণিকে গত ৮ ফেব্রুয়ারী আটক করে। এ মামলায় তদন্ত শেষে ৩০ এপ্রিল কোতোয়ালী থানা পুলিশ লিটন মিয়া, তার মামা ওসমান গণি ও মা রায়জান বিবিকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (৭০) দাখিল করেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 223 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ