সুন্দরবনের গলায় কারখানার ফাঁস

Print

সুন্দরবন ঘেঁষে ৩২০টি শিল্পকারখানাকে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় পরিবেশ কমিটি। এর অনেকগুলো মারাত্মক দূষণকারী। বনঘেঁষা ওই এলাকায় এমন উদ্যোগ আইনত নিষিদ্ধ। সম্প্রতি ইউনেসকোও বলেছে, কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা (এসইএ) ছাড়া এখানে ভারী শিল্প ও স্থাপনা করা যাবে না।
গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় পরিবেশ কমিটির চতুর্থ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৯৯ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। এখানে কলকারখানাসহ যেকোনো উন্নয়নকাজ করার আগে বন ও বনের প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নানা রকম শর্ত দিয়ে বিধি করা হয়।
এর আগে থেকেই অবশ্য ওই এলাকায় ১৮৬টি শিল্পকারখানা ছিল। পরিবেশবিষয়ক দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই কমিটি এসব কারখানাকে বৈধ করে অনুমোদন দিতে বলেছে। আবার পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) মৌজার সীমানা চিহ্নিত করে ২০১৫ সালে গেজেট প্রকাশের পর পরিবেশ অধিদপ্তর সেখানে ১১৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক ছাড়পত্র দিয়েছিল। কমিটি সেগুলোও নবায়ন করতে বলেছে।
এ ছাড়া নতুন করে আরও ১৬টি শিল্পকারখানাকে অনুমোদন দিতে বলেছে জাতীয় পরিবেশ কমিটি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আটটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বোতলজাত করার কারখানা বা এলপিজি প্ল্যান্ট, যা মারাত্মক দূষণকারী বা লাল তালিকাভুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাকি আটটি শিল্প বড় ও মাঝারি আকৃতির। এদেরও পরিবেশ ছাড়পত্র দিতে বলেছে জাতীয় কমিটি।
ওই কমিটিতে ৯ জন মন্ত্রী, ২৫ জন সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতিসহ ২৯ জন সদস্য রয়েছেন। প্রতিবছর কমিটির সভা হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘ আট বছর পর এই সভা অনুষ্ঠিত হলো।
কমিটির গত রোববারের সভার একটি কার্যপত্র দেয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। সেখানে দেশের শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে এসব কারখানাকে অনুমোদন দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে ওই শিল্পকারখানাগুলোতে পরিবেশের সুরক্ষামূলক কঠোর ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর নতুন করে মারাত্মক দূষণকারী বা লাল তালিকাভুক্ত কারখানার অনুমতি না দেওয়ার জন্য বলেছে ওই কমিটি। ওই কমিটিতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভার কার্যপত্রেই অবশ্য বলা হয়, বিশ্ব ঐতিহ্য বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনকে সংরক্ষণের জন্য কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা (এসইএ) সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই এলাকায় বৃহদাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা নির্মাণ না করার জন্য জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) থেকে সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ইউনেসকো যেহেতু রামপালের ব্যাপারে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে, সেহেতু অন্যান্য শিল্পকারখানার ব্যাপারেও তাদের কোনো আপত্তি নেই বলে আমরা মনে করছি। আর যারা সুন্দরবনের পাশে শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে, তারা পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে। সামনে যারা কারখানা করবে, তাদেরও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি আমরা কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য শর্ত দেব।’
বনমন্ত্রী আরও বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কমিটির সিদ্ধান্তগুলো খুব দ্রুতই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এ ব্যাপারে বলেন, সরকার পরিবেশ ও সুন্দরবন রক্ষায় করা নিজের আইন পদে পদে ভঙ্গ করছে। একই সঙ্গে তারা দেশের জনগণ ও বিশ্ববাসীর কাছে সুন্দরবন রক্ষার যেসব অঙ্গীকার করেছে, তারও বরখেলাপ করছে। এসব আইন ভাঙার অনুমোদন যেভাবে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে যে এই সরকারের কাছে দেশের সুন্দরবন ও পরিবেশ নিরাপদ নয়।
মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ, কমিটির অনুমোদন
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে চারটি সুপারিশ করা হয়েছিল। জাতীয় পরিবেশ কমিটি সব কটিই মেনে নিয়েছে। মোংলাসহ ইসিএ এলাকায় সিমেন্ট, তামাক, তেল পরিশোধন, ইটভাটার মতো লাল শ্রেণিভুক্ত যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেগুলোকে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলোতে কঠোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা যেমন সার্বক্ষণিক বর্জ্য, পানি ও বাতাস পরিশোধনযন্ত্র (ইটিপি, ডব্লিউডব্লিউটিপি ও এটিপি) করতে বলা হয়েছে। ছাড়পত্র নবায়নের জন্য পরিবেশগত নানা সুরক্ষার শর্ত রাখা হয়েছে। কমলা ‘খ’ ও কমলা ‘ক’ শ্রেণির বিদ্যমান কারখানাগুলোর জন্যও এমন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া কমিটি বলেছে, লাল শ্রেণির কোনো শিল্পকারখানা বা প্রকল্প না করার শর্তে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত এলাকা (বেজা) ও বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেপজা) প্রস্তাবিত নতুন শিল্পাঞ্চল স্থাপনের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া যেতে পারে।
কার্যপত্রে বলা হয়েছে, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় এলপিজি প্ল্যান্ট অন্তর্ভুক্ত নেই। তবে সেখানে শিল্প গ্যাস (অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন-ডাই অক্সাইড) লাল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সেই সুবাদে এলপিজি প্ল্যান্টকেও লাল তালিকায় বিবেচনা করা হয়। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, পৃথিবীর নানা দেশে এ ধরনের শিল্প লাল তালিকাভুক্ত নয়। তাই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
গত মাসে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪১তম সভার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছিল, রামপাল ছাড়া সুন্দরবনের পাশে আর কোনো শিল্পকারখানা করা হবে না। গতকাল বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, দেশের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ কমিটি যদি সব ধরনের শিল্পকারখানা করার অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলে এলপিজি করতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
তবে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক সুলতানা কামাল বলেন, ‘ইউনেসকো সুন্দরবনের রামপালসহ কোনো ধরনের শিল্পকারখানা না করতে বলেছে। বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় এই এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান করার আগে একটি কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা করার শর্তে সরকার একমত হয়ে এসেছে। নতুন শিল্পকারখানা করার অনুমতি দেওয়া এই অঙ্গীকারের সরাসরি বরখেলাপ। একই সঙ্গে এটা সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আরও উদ্বিগ্ন করল।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 62 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ