সেই পুলিশের আঘাতেই চোখ হারালাম!

Print

‘আমি সারাজীবন আমাদের পুলিশ বাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের নিয়ে পজিটিভ থেকেছি। এজন্য বন্ধুদের বকাও খেয়েছি। কিছু হলে বন্ধুরা যখন পুলিশ নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছে, তাদের সঙ্গে তর্ক করেছি। যুক্তি দিয়ে কথা বলেছি। আর সেই পুলিশ সদস্যের টিয়ারশেলের আঘাতেই আমি চোখ হারালাম!’
হাসপাতালের কেবিনে বসে কথাগুলো বলছিলেন পুলিশের টিয়ারশেলের আঘাতে দৃষ্টি হারানো কলেজছাত্র সিদ্দিকুর রহমান। বুধবার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কেবিনে কথা হয় তার সঙ্গে। কথা বলতে বলতে বারবারই আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছিলেন তিনি, গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। পাশে বসা বৃদ্ধ মা সুলেমা খাতুন বারবার মুছিয়ে দিচ্ছিলেন ছেলের চোখের জল।

সিদ্দিকুর জানালেন, এই ঘটনার পরও পুলিশ বাহিনীর প্রতি ক্ষোভ নেই তার। তিনি আগের মতোই দেশের আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত এই বাহিনীর প্রতি আস্থাশীল। তবে যে ঘটনার জন্য তাকে হারাতে হয়েছে দৃষ্টি, সেই ঘটনার জন্য ন্যায়বিচারও দাবি করেন তিনি। সিদ্দিকুর বলেন, ‘পৃথিবীর আলো আর দেখতে না পেলেও কারও প্রতি আমার ক্ষোভ নেই। তবে সেদিনের ঘটনায় কোনও বাড়াবাড়ি হয়ে থাকলে তার বিচার হোক। পুলিশের আঘাতে যেন আর কাউকে চোখ না হারাতে হয়।’
চোখের উন্নত চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ে গিয়েও মনোবল হারাননি বলে জানান সিদ্দিকুর। তিনি বলেন, ‘চেন্নাইয়ে গিয়েও ভাইয়ের হাতে খেয়েছি। তখনও বিশ্বাস ছিল, দেখতে পাবো। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসক লিঙ্গম গোপাল যখন জানালেন যে কেবল মিরাকলই পারে আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে, তখন থেকেই আবার নিজের হাতে খেতে শুরু করেছি। মেনে নিয়েছি, কোনোদিন আর কাউকে দেখতে পারব না। তবে আমি কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে পারব না। এজন্য আমি মানসিকভাবেও প্রস্তুত।’
সিদ্দিকুর বলেন, ‘হাসপাতালের এই কেবিনে এখন একা হাঁটতে পারি, নিজের কাজগুলো নিজেই করতে পারি। কিন্তু গ্রামে ফিরে গেলে কী হবে, সেটা নিয়ে ভাবনা হয়। তবে আমি চাই, আমার প্রতি অবিচার না হোক। আমি একটি সম্মানজনক জীবন চাই।’
চেন্নাই যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন উল্লেখ করে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা বলেন সিদ্দিকুর। তবে দেশে ফেরার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও সরকারের কেউ তার খোঁজখবর না নেওয়ায় হতাশা জানান তিনি। বলেন, ‘আমি কারও দ্বারস্থ হতে চাই না। কারও করুণার পাত্র হয়ে থাকতে চাই না। তাই সরকারের কাছে আবেদন করছি, তারা যেন তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখেন।’
একটানা কথা বলে কিছুটা থামেন সিদ্দিকুর। তারপর বলেন, ‘আমি লেখাপড়াটা শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে সুযোগটাও পাচ্ছি না।’ এসময় সিদ্দিকুরের মা সুলেমা খাতুন বলে ওঠেন, ‘এই অন্ধ ছেলেরে নিয়া বাড়িত যাইয়া কী করতাম আমি? একটা কিছু ব্যবস্থা না হইলে আমার পুতের জীবনটা যে শেষ হইয়া যাইবো!’ মাকে জড়িয়ে ধরে এসময় সিদ্দিকুর বলেন, সরকার নিশ্চয় তার জন্য ব্যবস্থা করে দেবে।
চেন্নাই থেকে ফেরার পর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাত সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড দেখাশোনা করছেন সিদ্দিকুরের। তাদের দেখভালে সন্তুষ্টি জানিয়ে সিদ্দিকুর বলেন, ‘হাসপাতালের পরিচালক স্যারও আসেন দেখতে। সবাই আমাকে সাহস দেন, শক্তি দেন। তাদের আন্তরিকতায় আমি ধন্য।’
এদিকে, হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানায়, হাসপাতালে থাকতেই হবে— এমন অবস্থায় আর সিদ্দিকুর নেই। কেবল মানবিক কারণেই তাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এখানকার পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা তাকে মানসিকভাবে সাধারণ জীবনে ফিরতে সহায়তা করবে বলে মনে করেন তারা।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে সিদ্দিকুর রয়েছেন হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহিদুল আহসান মেননের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন সিদ্দিকুর। তিনি বলেন, ‘সিদ্দিকুরের বিষয়ে এই মুহূর্তে আমাদের কাছে বিশেষ কোনও নির্দেশনা নেই। তার চিকিৎসা চলছে, সেটাই করতে হবে। তার পুনর্বাসনের বিষয়েও কোনও নির্দেশনা নেই।’
উল্লেখ্য, পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ কয়েকটি দাবিতে গত ২০ জুলাই শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নতুন সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। এসময় তাদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমান। তাকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং পরে চেন্নাইয়ের শংকর নেত্রালয়ে চিকিৎসা করানো হয়। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সিদ্দিকুরের চোখের দৃষ্টি ফিরে আসতে পারে কেবল মিরাকল ঘটলেই।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 235 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ