সেবার নতুন মাত্রা ‘মডেল ফার্মেসি’

Print

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওষুধের দোকানগুলোকে ফার্মেসি ও মেডিসিন শপ হিসাবে চিহ্নিত করে সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। মডেল ফার্মেসিকে কমপক্ষে ৩০০ বর্গফুট এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। সার্বক্ষণিক রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগসহ সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা মেনে মডেল ফার্মেসি কাজ করবে।রাজধানীর পান্থপথে মডেল ফার্মেসি হিসাবে যাত্রা শুরু করা বায়োমেড ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে এসেছেন রোকনউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। প্রেসক্রিপশন সার্ভিস ডেস্ক থেকে ওষুধ কেনার পর কোন ওষুধ খাওয়ার আগে বা পরে খেতে হবে, কোন ওষুধের ডোজ কতো প্রেসক্রিপশন দেখে তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন একজন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট।মডেল ফার্মেসিসব বুঝে নেওয়ার পর রোকনউদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের দেশে এমন সেবার কথা ভাবাই যায় না। দেশের বাইরে একবার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। কিন্তু দেশে এমন সেবা পাওয়ার কথা ভাবতেই পারিনি। এ উদ্যোগ দেখে খুব ভালো লাগছে। দেশের মানুষ ওষুধ নিয়ে অনেক বেশি সতর্ক হবে এখন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, দেশের মানুষকে এখন আর নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং বেশি দামে ওষুধ কিনতে হবে না, মানুষ ওষুধ খেয়ে অসুখে পড়বে না।’

অনেক ফার্মেসি ওষুধ রাখার নির্ধারিত তাপমাত্রা মেনে না চলায় ওষুধের গুণাগুণ নষ্ট হয়। যার ফলে ওষুধ খেয়ে সুস্থ হওয়ার বদলে উল্টো রোগাক্রান্ত হয় মানুষ। তাছাড়া ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কিনে প্রতারিত হন অনেকে। এ ধরনের ভোগান্তি দূর করতে সরকার সম্প্রতি মডেল ফার্মেসি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছে সবাই।

গত ২২ ডিসেম্বর ধানমণ্ডির লাজ ফার্মা ও গ্রিন রোডের বায়োমেড ফার্মেসি নতুন আঙ্গিকে চালু করার মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো মডেল ফার্মেসির যাত্রা শুরু হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ‘মডেল ফার্মেসি ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প’ এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রাথমিকভাবে ৩০টি ফার্মেসিকে মডেল ফার্মেসি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রায় ৩০ জন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় এরই মধ্যে সাতটি ফার্মেসি মডেল ফার্মেসি হিসাবে নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। এগুলো হলো-কলাবাগানের লাজ মডেল ফার্মা, পান্থপথের বায়োমেড ফার্মেসি, গুলশান ২ এর সাফাবি ফার্মা,
ইসলাম ফার্মা ও আল মদিনা ফার্মেসি, গুলশান ১ এর তামান্না ফার্মেসি এবং বনানীর প্রেসক্রিপশন এইড। এ সপ্তাহে সিলেট জেলাতেও তিনটি মডেল ফার্মেসি চালু হবে।

মডেল ফার্মেসির আরেক অংশরাজধানীতে শুরু হলেও প্রতিটি জেলায় শিগগিরই কমপক্ষে একটি করে মডেল ফার্মেসি চালু করা হবে বলে জানা গেছে মন্ত্রণালয় সূত্রে। এসব মডেল ফার্মেসিতে একজন ‘এ’ গ্রেড, একজন ‘বি’ গ্রেড এবং দুই থেকে তিনজন ‘সি’ গ্রেডের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকবেন। তাদের কাজ হবে প্রেসক্রিপশনের নির্দেশ অনুযায়ী রোগীকে ওষুধ বুঝিয়ে দেওয়া। মডেল ফার্মেসিতে ওষুধের গুণাগুণ নিশ্চিত থাকার মতো তাপমাত্রা, ছাদ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব অনুযায়ী ওষুধ রাখা এবং ওষুধ রাখার ফ্রিজ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হবে। সেই সঙ্গে প্রেসক্রিপশন সার্ভিস ডেস্ক, ফার্মাসিউটিক্যাল প্রোডাক্ট, নন ফার্মাসিউটিক্যাল প্রোডাক্ট এবং মেডিক্যাল সাপ্লাই অ্যান্ড ডিভাইসের জন্য আলাদা কর্নার থাকবে।

মডেল ফার্মেসি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘ঔষধ নীতি অনুযায়ী, প্রত্যেক মডেল ফার্মেসিতে ৩৯টি প্রয়োজনীয় ওষুধ ছাড়া বাকি সব ধরনের ওষুধ বিনা প্রেসক্রিপশনে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে অযথা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমবে, রোগীদের জন্য নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত সম্ভব হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মান যথাযথ রাখার পাশাপাশি সঠিক ওষুধের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে মডেল ফার্মেসি ভূমিকা রাখবে। ঔষধনীতি প্রণয়ন ও মডেল ফার্মেসি চালুর মধ্য দিয়ে নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান আরও জোরালো হবে। এর ফলে ভেজাল ওষুধের সঙ্গে জড়িতরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে ও প্রকৃত ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।’

সরকারের এই উদ্যোগের সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। গুলশান ২ নম্বরে অবস্থিত আল মদিনা ফার্মেসির ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, ‘মডেল ফার্মেসি হিসাবে যাত্রা শুরুর পর মানুষের রেসপন্স অনেক বেড়ে গিয়েছে। মানুষ এখন জানতে চায়, চিকিৎসক তাকে কোন অসুখের জন্য কোন ওষুধ দিয়েছেন। আমরাও তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে সব ‍বুঝিয়ে দেই। যে কারণে অন্য ফার্মেসির চেয়ে আল মদিনা ফার্মেসির জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা মানুষের কাছে অনেক বেশি।’

কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সহ সভাপতি আব্দুল হাই মনে করেন, ওষুধের দোকানগুলোকে একটি নিয়মের মধ্যে আনতে মডেল ফার্মেসি জোরালো ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো ফার্মেসি গড়ে ওঠে, যা অন্য কোনও দেশে হয় না। সেই ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ ঠিকমতো রাখা হয় না। কখনও ফ্লোরে রাখা, কখনও তাপমাত্রা ঠিক না থাকার কারণে ওষুধের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ চিকিৎসকের লেখা বুঝতে পারে না। তাই তাকে প্রেসক্রিপশন বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার হয়। কিন্তু ফার্মেসিগুলোতে মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো ফার্মাসিস্ট থাকে না। তবে মডেল ফার্মেসিতে ওষুধ কেনার পর একজন বিশেষজ্ঞ ফার্মাসিস্ট পুরো প্রেসক্রিপশন রোগীকে বুঝিয়ে দেবেন। আমি মনে করি, এই সিস্টেম মানুষের উপকারে আসবে।’

মডেল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এবিএম ফারুক বলেন, ‘এর ফলে নকল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হবে না। বেশি দামে ওষুধ বিক্রি হবে না, গায়ে লেখা দামেই ওষুধ বিক্রি হবে, এক্সপায়ার্ড মেডিসিন এবং আন রেজিস্টার্ড ড্রাগ বিক্রি হবে না। যার কারণে ওষুধ কেনার সময় নকল, ভেজাল, নিম্নমান এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ভয় মানুষের থাকবে না। একে বলা হয় সেফ ড্রাগ রুলস।’

তিনি আরও বলেন, ‘মডেল ফার্মেসিগুলোতে রোগীদের কাউন্সেলিং হবে। ওষুধ কোথায় রাখতে হবে, ওষুধের সঙ্গে ডায়েট কী হবে, কতোটুকু পানি খেতে হবে, কোনও ওষুধের সঙ্গে আরেকটি ওষুধ খাওয়া যাবে কিনা এসব বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট পরামর্শ দেবেন রোগীদের।’

-বাংলা ট্রিবিউন

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 2077 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ