স্ত্রী পেটানোকে অপরাধ ভাবছে না রাশিয়া!

Print

স্বামী যদি স্ত্রীকে মারধর করেন, তবে কি তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে? পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই এ বিষয় নিয়ে আলোচনার কোনো মানেই হয় না। কিন্তু রাশিয়ায় চিত্র ভিন্ন। সেখানে উল্টো পারিবারিক সহিংসতাকে প্রাথমিকভাবে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ডুমায় রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা তখনই আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যখন তা একাধিকবার ঘটবে এবং মারধরের শিকার ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হবেন। এ প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে পাস হলে তা ব্যাপক বিচ্যুতির জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়ার অনেক নাগরিক এখন ব্যক্তিগত অধিকারের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ করেন। কিন্তু বাদবাকিরা ঠিক উল্টো পথে চলছে।

রাশিয়ায় পারিবারিক সহিংসতাকে কোনো আইনি ধারায় সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার মাত্র তিনটি দেশে এমন পরিস্থিতি রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে রাশিয়ায় বিতর্ক শুরু হয় ২০১৬ সাল থেকে। ওই বছরের জুন মাসে ডুমায় ‘হালকা মারধরের’ ঘটনাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপরই পারিবারিক নির্যাতনকে রেহাই দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এ ব্যাপারে রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ বলেছে, ‘সন্তানদের শারীরিক শাস্তির যৌক্তিক ও স্নেহময় ব্যবহার মা-বাবাকে দেওয়া ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকারের প্রয়োজনীয় অংশ।’ রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর মতে, সন্তানদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার জন্য মা-বাবার সাজা হওয়া সঠিক নয়। তবে দেশটির নাগরিক সমাজ পারিবারিক সহিংসতার দায়ে আরও কঠোর শাস্তির বিধানের কথা ভেবেছিল। আন্দোলনকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, পারিবারিক সহিংসতা অপরাধ হিসেবে গণ্য না হলে তা এ ধরনের নির্যাতনকে বৈধতা দেবে। সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা দাতব্য প্রতিষ্ঠান আনা সেন্টারের কর্মী আন্দ্রেই সিনেলনিকভ বলেন, রুশ জনগণের কাছে যে বার্তাটি দেওয়া হচ্ছে তা হলো, পারিবারিক সহিংসতা কোনো অপরাধই নয়।
তবে বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর চাপে পড়ে সম্প্রতি প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণে যে প্রস্তাবটি পাস হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, প্রথমবার হালকা মারধর করা হলে তা হবে প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা। এতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ৩০ হাজার রুবল (৫০২ ডলার) জরিমানা করা হবে অথবা ১৫ দিন আটক রাখা হবে। তবে এটি নির্ধারিত হবে ‘ব্যক্তিগত সালিসের’ মাধ্যমে। সে ক্ষেত্রে মারধরের শিকার ব্যক্তিকে মামলা করতে হবে এবং তা প্রমাণের জন্য সব ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ নিজেকেই জোগাড় করতে হবে। যদি প্রথম ঘটনার এক বছরের মধ্যে আবার নির্যাতন করা হয়, তবেই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ডুমার স্পিকার ভাচেসলাভ ভোলোদিন বলেছেন, এ প্রস্তাবিত আইন ‘দৃঢ় পরিবার’ গঠনে সহায়ক হবে। আশা করা হচ্ছে, তৃতীয় পর্যালোচনার পরই তা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে পাঠানো হবে। পুতিন স্বাক্ষর করলেই খসড়াটি আইনে পরিণত হবে।
রাশিয়ার মোট সহিংস ঘটনার ৪০ শতাংশ পরিবারের ভেতরেই হচ্ছে—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ তথ্য প্রকাশের প্রেক্ষাপটে পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে আইনটি হতে যাচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে কাজ করা দাতব্য প্রতিষ্ঠান আনা সেন্টার অবশ্য বলেছে, তাদের কাছে সালিসের জন্য যোগাযোগ করা নারীদের ৭০ শতাংশই আর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন প্রতিকার না পাওয়ার কথা।
পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করা স্থানীয় আইনজীবী আলেনা পোপোভা এর জন্য দায়ী করেন রুশ সংস্কৃতিকে। তিনি বলেন, ‘সহিংসতা এখানে শুধু প্রথা নয়, বরং আমাদের জীবনাচরণে পরিণত হয়েছে।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 112 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ