স্বঘোষিত ‘হিরো’র স্বপ্ন পূরণ

Print

ছবির বাজেট নামেমাত্র। মানের কথা আর নাই বা বলা। ব্যাঙ্গাত্বক মন্তব্য করছেন অনেকেই। প্রচারণায়ও তেমন আওয়াজ নেই। তবে আছেন হিরো আলম! ছবির নাম ‘মার ছক্কা’। পরিচালনা করেছেন মঈন বিশ্বাস। ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে ছবির গল্প গড়িয়েছে। আজ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। আর এ ছবিই দিয়েই চলচ্চিত্রের পর্দায় অভিষেক ঘটেছে হিরো আলমের। স্বঘোষিত ‘হিরো’র ১৮ বছর পর স্বপ্ন পূরণ হলো। যার পুরো নাম আশরাফুল আলম। বাড়ি বগুড়ায়। কিন্তু পরিচিতি পেয়েছেন হিরো আলম হিসেবে।
কৈশোরের সময়গুলোতে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করেই কেটেছে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। পড়াশোনা থেমে যায় সপ্তম শ্রেনীতেই। ধরতে হয় সংসারের হাল। দিনে গ্রামে ঘুরে ঘুরে আচার-চানাচুর বিক্রি শুরু করেন। আর সন্ধ্যার পর বগুড়ায় এরুলিয়া বাজারে একটি সিডি ভাড়া দেওয়ার দোকানে বসেন। এভাবেই কেটে যায় বছর তিনেক। এরপর সেই দোকানের মালিক দেশের বাইরে চলে যান। যাওয়ার আগে তার কাছে দোকানের জিনিস-পত্র বিক্রি করে যান।

আর দোকান থেকে যা আয় হতো সেটি নেহায়েত মন্দ ছিল না। এরপর একদিন হঠাৎ করেই মনে হল- তিনি নিজে মডেল হলে কেমন হয়? কিছু টাকা খরচ করে একটি মিউজিক ভিডিও বানালেন। আর যখন অনেকের কাছে সেটি পৌঁছে গেল, তখন তাকে নিয়ে ঠাট্টা শুরু হল। অনেকে তাকে জোকার বলেও সম্বোধন করা শুরু করতে লাগল। অনেকে আবার গালিও দেয়। আর এসবই তার মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয়। সিদ্ধান্ত নেন যে করেই হোক হিরো হবেন!
যেই ভাবনা সেই কাজ। এলাকার একটি এনজিও থেকে ঋণ নেন। ৫০ হাজার টাকা। ডিশ সংযোগের ব্যবসা শুরু করেন। এর পাশাপাশি শুরু করেন মিউজিক ভিডিও নির্মাণ। আর মডেল তিনি নিজেই। এরপর এখন সে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০০তে। গত বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় উঠে এসেছেন ‘হিরো আলম’। হুট করেই ফেসবুকে তার কয়েকটি মিউজিক ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়ে। আর দেশের বাইরে হিরো আলমের নাম ছড়িয়ে পড়ে যখন তিনি ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ছবি তোলেন।
এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি পত্রিকা। সেই ছবি ও প্রতিবেদনের জের ধরে ১৬ ডিসেম্বর বিবিসি হিন্দি প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিরো আলমকে নিয়ে। গত বছর গুগলে তাকেই সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে মানুষ। আলমের এই জনপ্রিয়তা নজরে আসে চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও। ‘মার ছক্কা’ দিয়েই আশরাফুল আলমের ‘হিরো’ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। ছবিতে তার নায়িকা রাবিনা বৃষ্টি।
আর এ ছবিটি মুক্তি পাওয়া নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় হিরো আলম বলেন, ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। গণমাধ্যম কেন্দ্রীক ব্যস্ততা তার। কারণ দেশের লোক যেন তার রূপালি পর্দায় অভিষেকের বিষয়টি জানতে পারে। শুরুতেই জানতে চাওয়া হয়, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে লালন-পালন করা স্বপ্নের পূরণ হতে যাচ্ছে। মনোবল কীভাবে ধরে রাখলেন, কখনও মনে হয় নি থেমে যাই?
আমি একটা বিষয় বিশ্বাস করি, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। যে কোন বিষয় নিয়ে সাধানা করলে পুরোপুরি না হলেও কাছাকাছি যাওয়া যায়। ইচ্ছা শক্তিটাই মূল কথা। কিছু একটা করতে গেলে বাধা আসবেই। যেমন- আমাকে নিয়ে মানুষ কত কী বলে, সমালোচনা করে। আমি থেমে যাই নি। আমি আমার কাজ করে চলছি। কে কি বললো, না বললো সেগুলো আমি মাথায় নিই না। আর যদি এগুলো নিয়ে ভাবতাম তাহলে আমি এখানে আসতে পারতাম না। আত্ববিশ্বাস ছিল বলেই আজ আমি রূপালি পর্দায়। সেলিব্রেটি হিরো আলম বলে কথা নয়। যে কোন মানুষেরই যদি লক্ষ্যটা ঠিক থাকে, আর সে অনুযায়ী কাজ করে একদিন না একদিন সে তার জায়গায় পৌঁছে যাবে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাঙ্গাত্বক আলোচনা ও সাধারণ মানুষের উপহাস। তারপরও অদম্য হিরো আলম। কৃতজ্ঞতা জানালেন স্রষ্টার প্রতি। ধন্যবাদ দিলেন সাংবাদিকদেরও। তিনি বলেন, আমার ধৈর্য্য শক্তি অনেক বেশি। আমি কিন্তু থমকে যাই নি। আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমেই আজ এতোদূর এসেছি। উপরওয়ালা আমার পাশে আছেন। আর সাংবাদিকরা আমাকে বড় সহযোগিতা করেছেন। আমার কাজ নিয়ে তারা লিখেছেন। সাপোর্ট দিয়েছে। পজেটিভ নেগিটিভ যা হয়েছে সেটাই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। হিরো আলম প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় আসছে এতে সবারই একটা কৌতূহল রয়েছে। যার কারণে কিন্তু হিরো আলমকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
আমার মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে। কে কী বললো আই ডোন্ট কেয়ার। এক কথায় শেষ। আমি আমার কাজ দিয়ে যতদিন মাঠে থাকা যায় ততদিন থাকব। যেদিন হাতে কাজ থাকবে না সেদিন মাঠে থাকব না। বড় পর্দায় যদি নাও থাকতে পারি, ছোট পর্দায় থেকে যাব। মানুষ সমালোচনা করলেও আমি থামব না। আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে এতোদূর এসেছি। এটার প্রমাণ আছে। এটা সবাই জানেও। এলাকাতে আমাকে নিয়ে অনেক মজা করত। ঠাট্টা করত লোকজন। এখন যেহেতু একটা জায়গায় চলে আসছি। তাই এখন বিষয়টা পজেটিভ। আর পরিবারের লোকজনও এখন বিষয়টি বুঝেন।’ বললেন হিরো আলম।
হিরো আলমের বয়স এখন ২৮। বগুড়ার মেয়ে সাদিয়া আক্তার সুমিকে বিয়ে করেছেন। দুই সন্তানের জনক তিনি। তাদের মধ্যে-মেয়ে আঁখি আক্তার আলো (৫), ছেলে আবির হোসেন (৩)। তবে মানহীন কাজ নিয়ে সমালোচনা শুনতে এখন আর তার ভাল লাগে না। তাই সময়ও সুযোগের অপেক্ষায় আছেন তিনি। বিশ্বাস করেন। একদিন সে সুযোগ আসবে। আর ভালো কাজ দিয়েই এখন যারা সমালোচনা করছেন তাদের জবাব দিবেন তিনি। কথার শেষে এমনটাই বললেন হিরো আলম।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 206 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ