স্বপ্ন পোড়ায় সাধ্য কার!

Print

পা দু’টো কেটেই ফেলার কথা ছিল। কিন্তু চিকিৎসকরা কোনও রকমে পা দু’টোকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। পা দু’টো স্বাভাবিক আকৃতি হারিয়েছে। ডান হাত কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকরা। পুড়েছে ডান পাশের পিঠ এবং পেটের অনেকখানি। পুড়েছে বাম হাতের অনেকটা অংশও। বিদ্যুৎ আমার শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, আমার স্বপ্নকে পোড়াতে পারেনি। বিদ্যুতে স্পৃষ্ট হয়ে আমার শরীর পুড়েছে। কিন্তু কার সাধ্য আমার আজন্ম লালিত স্বপ্নকে পোড়ায়!
দৃঢ় কণ্ঠে মাথা উঁচু করে কথাগুলো বলছিলেন মিনার উদ্দিন, মিনার নামেই যিনি পরিচিত সবার কাছে।

বুধবার (৮ ফেব্রুয়ারি) পুরান ঢাকার বাসায় কথা হয় মিনারের সঙ্গে। সদ্য প্রকাশিত ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন মৌখিক পরীক্ষার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মিনার আবার নতুন করে জীবনের স্বপ্ন দেখছেন। বলেন, ‘জীবনের একমাত্র প্যাশন হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নকে। সেই স্বপ্নের অনেকটা পূরণের অনেকটা কাছে চলে এসেছি। এবার বাকিটা দেখা যাক।’
প্রসঙ্গত, গত বছর ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মিনার টানা ৩৯ দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে ছিলেন। তাকে দিতে হয়েছিল ২৫ ব্যাগ রক্ত। দুই পায়ের হাড় দেখা যেত। চিকিৎসকরা ১১টি অপারেশন করে তাকে আজকের জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন। গত একমাসে প্রতিদিন দুই বেলা করে পায়ের ফিজিওথেরাপি চলছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, পা দু’টোকে হাঁটার উপযোগী করে গড়ে তুলতে দরকার অসীম ধৈর্য আর অধ্যবসায়। পরে সুবিধামতো সময়ে সংযোজন করা যাবে কৃত্রিম হাত-ও।
সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনার কথা বর্ণনা করলেন মিনারের বড় ভাই মো. মিনহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কোরবানির ঈদের আগের দিন রাতে নিজ জেলা চট্রগ্রামে কয়েকজন বন্ধু আর ছাত্রকে নিয়ে বাড়ির পাশেই ভরাপুকুর বাজারের নতুন এক দোতলা বাড়ির ছাদে আড্ডা দিচ্ছিল মিনার। ছাদেই ঝুলছিল নতুন ভবনের ওপর দিয়ে যাওয়া ১১ হাজার ভোল্টের ইলেকট্রিক ক্যাবল। সেই ক্যাবলেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় মিনার। রাতেই ওকে চট্রগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরদিন অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাই ঢামেক বার্ন ইউনিটে। সেখানেই দীর্ঘ ২ মাস ২৪ দিন চিকিৎসার পর গত ৭ ডিসেম্বর মিনারকে বাসায় ফিরিয়ে আনি।’
তৈলারদ্বীপ বারোখাইন এরশাদ আলী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম জিপিএ-৫ পাওয়া দুই শিক্ষার্থীর একজন মিনার। চট্রগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকেও জিপিএ-৫ পান। এসএসসি পরীক্ষার পরপরই বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মা আর তিন ভাই, এক বোনের সংসারের অনেকটাই তখন সামলানো দায়িত্ব মিনারের কাঁধে। টিউশনি করে আর কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে মিনার সংসার চালাতেন। এলাকার সবার কাছেই মিনার ছিলেন প্রিয় মুখ। মিনহারুল ইসলাম বলেন, ‘মিনারের জন্য কোরবানির ঈদের দিন পুরো এলাকাতে কেউ কোরবানি দেয়নি। সবাই ধরেই নিয়েছিল যে মিনার আর বাঁচবে না।’ মিনারের চিকিৎসায় যে ২৫ থেকে ২৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, সেখানেও এলাকাবাসীর অবদান রয়েছে বলে জানান মিনহারুল।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মিনারের ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রক্রিয়ার অনেকটাই অসম্ভব মনের জোরে। মিনার বলেন, ‘কেবিনে যখন ছিলাম তখন চিকিৎসকরা বলতেন, এরকম পা কখনো টিকে থাকে না। সেই পা স্বাভাবিক আকৃতি হারিয়ে টিকে আছে। আর এখনও এই যে চিকিৎসা চলছে, এটা কেবল মনের জোরেই সম্ভব হয়েছে।’ এ ক্ষেত্রে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকদের প্রশংসা করে মিনার বলেন, ‘তারা আমাকে যে সহযোগিতা করেছেন সেটা বুঝিয়ে বলার মতো নয়।’
বেঁচে থাকাটা মিনারের কাছে এখন অলৌকিক ব্যাপার। তিনি বলেন, ‘সাইকেল চালাতাম। কিন্তু একবার সাইকেল চালাতে গিয়ে ডান হাতের আঙুলে ব্যাথা পেয়ে অনেকদিন সাইকেল চালাইনি। ভাবতাম, যদি আঙুলে ব্যাথা পাই তাহলে আমি লিখতে পারব না। কিন্তু এখন আমার পুরো হাতটাই নাই হয়ে গেছে।’
বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার খবর পেয়ে মিনার বলেন, ‘আমার ফার্স্ট চয়েজ ছিল পুলিশ। কিন্তু এখন মনে হয়, আবার যদি একটু হাঁটতে পারতাম!’
চলতি মাসের ১৭ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে লিখিত পরীক্ষা আছে জানিয়ে মিনার বলেন, ‘এখন তো আর আমার ডান হাত নেই। লিখব কী দিয়ে?’ বলেই পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকান মিনার। পরক্ষণেই আবার চোখে চোখ রেখে বলেন, ‘আমার মনে হয় বিসিএসের ভাইভাতে আমি টিকে যাব। যে আর কোনোদিন লিখতে পারবে না, তাকে নিশ্চয় সৃষ্টিকর্তা আর কোনও পরীক্ষাতে লিখতে বসাবেন না।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 167 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ