স্বাক্ষর জাল করে সা‘দ সাহেবকে ইজতেমায় আনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি

Print

বাংলাদেশের সর্বস্তরের আলেম ও তাবলীগ জামাতের অধিকাংশ মুরুব্বীদের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কয়েকজনের স্বাক্ষর জাল করে ভারতের বিতর্কিত আলেম সাদ’কে বিশ্ব ইজতেমায় আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছেন ঢাকার কাকরাইলের মুরুব্বী প্রকৌশলী সৈয়্যদ ওয়াসিফুল ইসলাম। আর তার এই চিঠির কারণে ফের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে তাবলীগ জামাতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব ইজতেমার আগে মীমাংসিত একটি বিষয়কে উত্থাপন করে ফের বিতর্ক ছড়িয়ে দিচ্ছেন ওয়াসিফুল ইসলাম।

এছাড়াও লিখিতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাকিস্তানের সাথীদের আসার প্রতিও নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে চিঠি দেন। উদ্দেশ্য, বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব্যব্যাপী যে ষড়যন্ত্র চলছে, তা প্রতিরোধ করা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেওয়া শূরার সদস্যনের নামে স্বাক্ষরিত চিঠিতে মাত্র ৪ জন শূরা সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে শূরা সদস্য নন এমন ২ জনের স্বাক্ষর নিয়েছেন তিনি। এরা হলেন, আবদুল হামিদ মাসুম, অধ্যাপক আনোয়ার। তারা কেউ শূরার সদস্য নয়।

এছাড়া চিঠিতে যুক্ত শূরা সদস্য প্রফেসর ইউনূছ শিকাদারের স্বাক্ষরটি অন্য কারও হাতের। এতে ইইনূছ স্বাক্ষর করেননি।

তাবলীগ জামাতের সূত্র জানায়, সৈয়দ ওয়াসিফের আপন বোন জামাই ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আর তার ছেলে ওসামাকে নিয়েও বিতর্ক আছে। তাবলীগের চিরকালীন মাহাত্ম্য নষ্ট করে সিনেমার নায়কদের দিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্কিত হয়েছেন ওয়াসিফুল ইসলাম। ইতিপূর্বেও ওয়াসিফ নিজের অবস্থানের পক্ষে ফতুয়ায় আলেমদের সাক্ষর জাল করেন।

ইতোমধ্যে প্রত্যেক বছরে স্বপরিবারে হজ্বে গমণ, বিলাসবহুল গাড়িতে চড়া, এবং কয়েক দফায় বিদেশি মেহমানদের প্রদেয় অর্থের হিসাব না দিয়ে কাকরাইলে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন ওয়াসিফুল ইসলাম।

তাবলীগের কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, ইজতেমাকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া এবং অস্থিরতা দেখিয়ে নিজের বিরুদ্ধে আণীত অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু অন্যত্র সরাতেই ওয়াসিফ ভারতের সা’দকে নিয়ে বারবার বিতর্ক করছেন।

এজতেমায় সা‘দ সাহেবকে আনা না আনা নিয়ে গত ৭ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাক্রমে তাবলীগ জামাতের মুরুব্বী ও কওমি আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি সাদের ঢাকা সফরের প্রতি নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেন।

জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়িতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উলামায়ে কেরাম, কাকরাইলের শুরার উপদেষ্টা, কাকরাইলের শুরা ও ভারতে সফরকারী প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি ছিলেন।

ওই বৈঠকে ২১ জনের মধ্যে ১৩ জন এবারের ইজতেমায় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর না আসার পক্ষে মত দেন। এরা হলেন, বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আশরাফ আলী, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার মুহাদ্দিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা মোহাম্মাদ যোবায়ের, মাওলানা মুহাম্মাদ হোসাইন ও মাওলানা ফারুক, বেফাকের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, হাটহাজারী মাদরাসার সহকারী শিক্ষাসচিব মাওলানা আনাস মাদানী, তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা উমর ফারুক ও মাওলানা রবীউল হক, শাইখ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মাওলানা মিযানুর রহমান সাঈদ, হাটহাজারীর মুফতী কেফায়াতুল্লাহ, মাওলানা মুফতী মোহাম্মাদ আলী (আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের প্রতিনিধি), ভারত সফরকারী প্রতিনিধি দলের সদস্য জামিয়া রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুজুল হক।

একই সঙ্গে এই ১৩ জন সদস্য দিল্লীর নেজামুদ্দীন মারকাজের মুরব্বি মাওলানা মুহাম্মাদ সাদ ও মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ এবং নেজামুদ্দীনের বাইরের মাওলানা ইবরাহীম দেওলা ও মাওলানা আহমাদ লাটকে না এসে ইজতেমায় তাদের প্রতিনিধি পাঠানোর সুপারিশ করে।

আর তাবলীগের ৭ জন মুরুব্বী মাওলানা সা’দের আসার পক্ষে মত দেন। এর মধ্যে শূরা সদস্য চারজন। সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, মুহাম্মাদ খান শাহাবুদ্দীন নাসিম, ইউনুছ শিকদার, মাওলানা মোশাররফ হোসাইন।

এরপর লিখিতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে পাকিস্তানের সাথীদের আসার প্রতিও নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব্যব্যাপী যে ষড়যন্ত্র চলছে, তা প্রতিরোধ করা।

এক সময় ওয়াসিফুল ইসলামের কাছের হিসেবে পরিচিত এমন কয়েকজন তাবলীগ সাথী জানান, সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের আলেম, দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া থাকলেও সাদের পক্ষে তিনি অবস্থান গ্রহণ করেছেন। যদিও এর কোনও কারণ তারা বলতে পারেননি।

কাকরাইলের একাধিক তাবলীগের মুরুব্বী জানান, সৈয়দ ওয়াসিফের সহযোগী হিসেবে প্রকৌশলী আনিস, মাহফুজুল হান্নান, তাজুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন, ইয়াহইয়া, ব্যবসায়ী সিরাজ, সেলিমসহ আরও সাথীরা পাশে থাকলেও অস্থিরতার অভিযোগ এনে তার সঙ্গ ত্যাগ করেছেন।

বিশেষ করে তাবলীগের উসূলের বিরোধীতা করায় সাদের ইসলামী মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ভারত ও বাংলাদেশে। এমনকী সাদের বিতর্কিত ইসলামী চিন্তা নিয়ে মালয়েশিয়া, আমেরিকা, সৌদি আরব, সাউথ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। যদিও ওয়াসিফ তার অনুগত প্রবাসীদের দিয়েও কয়েকটি চিঠি পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

তাবলীগের সাথীরা অভিযোগ করেন, ২০১১ ও ১২ সালের দিকে জেদ্দার শেখ সুরুতীর কাছ থেকে ৩ লাখ রিয়েল নিয়ে কাকরাইলে হিসাব দেননি। কাকরাইল মসজিদের কন্সট্রাকশনের জন্য কম্পিউটার কেনা হলেও তার ঠাঁই হয়েছে ওয়াসিফের বাসায়।

একসময়ে সৈয়দ ওয়াসিফের একজন কাছের সহযোগী জানান, সাধারণ তাবলীগের যারা মুরুব্বী হন, তাদের প্রত্যেকের জন্য তিন চিল্লা বাধ্যতামূলক। ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে চিল্লা দিতে হয়। সৈয়দ ওয়াসিফ তিন চিল্লা দেননি।

এছাড়া ২০১২ সালের ইজতেমার মাঠে সিঙ্গাপুরের হাজী করিম ৫ হাজার ডলার দিলেও কাকরাইল মসজিদের একাউন্টসে তার উঠেনি।

সাধারণ তাবলীগের সাথীরা জামাতের অভ্যন্তরীন বিষয়গুলোর দ্বন্দ্বে অসহায় হয়ে পড়েছেন। শঙ্কায় রয়েছেন, তাবলীগ জামাতকে ধ্বংস করতেই সম্মিলিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ওয়াসিফুল ইসলাম বিতর্কিত সাদকে ঢাকায় আনতে চান।

উল্লেখ্য, এই বছর ১২ জানুয়ারি ও ১৯ জানুয়ারি দুই দফায় তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফায় ১৪ জানুয়ারি ও দ্বিতীয় দফায় ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে, মালয়েশিয়া থেকে আবদুল চং নামে এক জন চাইনিজ নও-মুসলিম কাছ থেকে একটি চিঠি আনান। ওই চিঠিতে বিশ্ব ইজতেমা মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। যদিও মালয়েশিয়ার প্রবাসী বাঙালী তাবলীগকর্মী জানিয়েছেন, ওই দেশে বিশ্ব ইজতেমা কখনোই বাংলাদেশের মতো বড় করে সম্ভব না। ওই দেশে সারাদেশের ইজতেমাই ১০ ভাগে আয়োজন করা হয়ে থাকে।

ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া তাবলীগের শূরার ৬ জন সদস্যের একটি চিঠি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আবদুল্লাহ চং এর চিঠি বিরোধীতা করে ঢাকার ইজতেমার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। পাশাপাশি মাওলানা সাদ ও বিতর্কিত আলেমরা যেন ঢাকার ইজতেমায় না আসেন, এজন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

সৈয়দ ওয়াসিফ গতকাল ৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজেকে ফায়সাল (সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী) ঘোষণা করেছেন। যদিও কাকরাইলের নিয়ম অনুযায়ী চলতি সপ্তাহে ফায়সালের দায়িত্বে রয়েছেন মাওলানা ফারুক।

-আমাদের সময়

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 435 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ