হতাশার মাঝেও স্বস্তির ‘আইসক্রিম’

Print
চলচ্চিত্র মানে শুধু বড়পর্দা নয়, বড় একটি ক্যানভাস। কারণ ইদানিং অনেক নাটক বা মিউজিক ভিডিওর প্রিমিয়ারও সিনেপ্লেক্স ভাড়া করে হয় কি-না! তাই কথাটি তুললাম। সিনেমায় ক্যানভাসের পুরোটা জুড়ে নির্মাতার ভাবনার ছোঁয়া থাকে। মূলগল্পের সাথে প্যারালাল ছোট ছোট অনেকগুলো গল্প সেই ক্যানভাসকে পূর্ণতা দেয়। একটি ভালো চলচ্চিত্রের জন্য একটি ভালো গল্পই শেষ কথা নয়। এর সাথে অন্যান্য অনুসঙ্গ পূর্ণ করতে হয়। সেই জায়গা থেকে তরুণ পরিচালক রেদওয়ান রনির সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আইসক্রিম’ চলচ্চিত্রটি দেখার পর কিছুটা আক্ষেপের নিঃশ্বাস ফেলতে হয়।
সমসাময়িক একটি গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘আইসক্রিম’। আমাদের বর্তমান সময়ের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। হ্যাঁ, এই জায়গায় নির্মাতাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কারণ এমন একটি গল্প ও মূল চরিত্রগুলোতে নতুন মুখ নিয়ে তিনি অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখেই ছবিটি নির্মাণ ও মুক্তি দিয়েছেন। ছবিতে চরিত্রের নাম রওনক, প্রিয়তা ও নাদিম। এই তিনটি চরিত্রের মাঝে নাদিম চরিত্রটির অভিনয় অনেকটা সাবলীল লেগেছে। বোঝা যায়, প্রস্তুত হয়েই মাঠে নেমেছেন তিনি। তবে বাকি দু’জনের অভিনয়ে অনেকখানি দুর্বলতা রয়েই গেছে। ইন্ডাস্ট্রির এই সময়ে নতুন মুখের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু অবশ্যই অভিনয়ে পারদর্শিতার বিষয়টি লক্ষ্য করাটা উচিত।
তবে প্রচলিত ধারার জনপ্রিয় তারকাদের বাইরে গিয়ে নতুনদের নিয়ে নির্মাতা রেদওয়ান রনি যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তাতে তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। প্রথম ভুলগুলো শুধরে নিয়ে এই আনকোরা মুখগুলো যদি চলচ্চিত্রে নিবিষ্ট হয় তবে ছবিটি একটি প্লাটফর্ম হিসেবে কাজে দেবে। উদাহরণ ঘাটলেও পাওয়া যাবে অনেক গুণী অভিনেতার শুরুটা একবারে শূন্য থেকে। যাদের তৈরি করেছেন নির্মাতারাই।
যাই হোক, চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে আসি। ছবির শুরুটা একেবারেই আলাদা আহামরি তা নয়। তবে নির্মাতার চেষ্টা ছিল। কিন্তু এখানে নতুন শিল্পীদের আনকোরা কাজে কিছুটা ব্যাঘাত তো ঘটেছেই। একটি দ্বীপ থেকে ছবি শুরু। শুরুটা মন্দ নয়। তবে সেখানে আরো একটু সময় নিয়ে গল্পটি গোছালে ভালো কিছু হতো। হলে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া থেকে সেটাই বোঝা গেল। খুব দ্রুতই মূলগল্পে প্রবেশের একটি তাড়াহুড়ো ছিল নির্মাতার। শুরুর দিকে গল্পে আরো একটু যত্ন নিলে ভালো করতেন। আরো খানিকটা টেনশন দিতে পারতেন। কারণ শুরুতে এতো কাট কাট শট দর্শকদের জন্য বিরক্তির কারণ। ‘চোরাবালি’ থেকে ‘আইসক্রিম’ স্বাভাবিকভাবেই পরের ছবিটিতে নির্মাতার কাছে প্রত্যাশা আরো বেশি থাকে। কারণ রনি যে দারুণ গল্প বাঁধতে জানেন তা তার টিভি নাটক দেখলে বোঝা যায়। সেখানে ফ্রেম আর ব্যাকরণের বিবর্তনে চলচ্চিত্রে আরেকটু মনোযোগী হলেই পারতেন। কিন্তু রেদওয়ান রনি তার এই ছবিটিতে ভিন্ন আঙ্গিকের একটি গল্প নিয়ে নির্মাণ করলেও পদে পদে মনে হয়েছে ‘চোরাবালি’ এর চেয়ে যত্নের কাজ ছিল। তাই ছবি রিলিজের পর শহুরে চলাচলের পথে যে পরিমাণ ক্যাম্পেইনের যত্ন তিনি করছেন, ছবি নির্মাণে তার কিছুটা খরচ করলে ভালো হতো।  যদিও চোরাবালি আর আইসক্রিম দুটি ছবি সম্পূর্ণ দুটি প্লটে নির্মিত। গল্পের শুরুতে দু’জন তরুণ-তরুণীর প্রেম। দু’জনের খুঁনসুটিতে ছবির এই জায়গাটা বেশ সাবলীল।  এখানে কয়েকটি অন্তরঙ্গ মুহূর্ত দেখানো হয়েছে। তবে এই বিষয়গুলো গল্পের তাগিদেই করা এটা স্পষ্ট। তাই এই বিষয়টি নেতিবাচকভাবে হয়তো অনেকে বলবেন, কিন্তু গল্প যে দিকে যাচ্ছে সে দিকের ধারাবাহিকতায় এই অংশগুলো থাকতেই পারে। চলচ্চিত্রে অতিথি চরিত্রে রয়েছেন ওমর সানী। নায়কের অফিসের বস তিনি। মোট তিন-চারটি দৃশ্যে তাকে রাখা হয়েছে। অফিসের ওই পরিবেশের গল্পটি আমাদের সচরাচর গল্পের প্রেক্ষাপটে খানিকটা নতুন বলা চলে। তবে আরো একটু গোছালো হতে পারতো। ওমর সানী তার অভিজ্ঞতার পরিচয়টা বরাবরের মতো এই ছবিতেও দিয়েছেন। আরো একজন অতিথি চরিত্র প্রয়াত গুণী অভিনেত্রী পারভীন সুলতানা দিতি। তিনি চলে যাওয়াতে অন্য কারো কণ্ঠে তার চরিত্রটির ডাবিং করা হয়। কণ্ঠ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের তেমন কোনো বাছাই ছিল না মনে হয়। কারণ দিতির ডায়লগ ডেলিভারির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। যদিও সবারই জানা এটি দিতির কণ্ঠ নয়, তবুও আরও একটু বাছাই করে তার ধরনের কণ্ঠ হলে কানের স্বস্তিটা মিলতো। আর এটি এখনকার বাচিক শিল্পীদের জন্য কোনো জটিল বিষয় ছিল না। তাই এটাকেও নির্মাতার খানিক তাড়াহুড়োই বলবো।
আরো একজনের চরিত্রের কথা বলতেই হয়। তিনি এটিএম শামসুজ্জামান। ছবিতে ছিলেন নায়িকা প্রিয়তার নানা। এমন একজন গুণী অভিনেতাকে নিয়ে কাজ করা সত্যিই মর্যাদার বিষয়। তার অভিনয়ের জাদু দিয়ে সবার মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। সেই জাদুর ঝাপ্পি খুলে খুব একটা অভিনয়ের সুযোগ হয়তো হয়নি এই ‘আইসক্রিম’ ছবিতে। গল্পের প্রয়োজনে তার অভিনয়ের সময়টা আরো চাইছিল দর্শকমন। এখানে সেই শুরুর কথাটা আবারো বলতে হয়। একটি চলচ্চিত্রের জন্য মূলগল্পের সাথে অনেকগুলো ছোট ছোট যুক্ত গল্প থাকে। যা চলচ্চিত্রকে প্রাণ দেয়। সেই প্রাণের অস্তিত্ব নির্মাতা অনেকবার খুঁজতে গিয়েও পথ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। রওনক-প্রিয়তার প্রেম চলতে চলতে নাদিম চরিত্রটির আগমন ঘটে। এখানে নতুন একটি গল্পের জন্ম হয়। রওনক তার অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে যাওয়ায় সেই সময়টায় নাদিমের সাথে একটি নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে যায় প্রিয়তা। সমসাময়িক এই বিষয়টি নিয়ে তর্ক থাকলেও সত্যি। সেই সত্যি বিষয়টি পর্দায় দেখিয়েছেন রেদওয়ান রনি। একদিকে নাদিম, অন্যদিকে রওনক। এমনই একটি দোটানার মাঝে যখন প্রিয়তা তখন একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয় নায়িকাকে। বাগদান সেরে ফেলে রওনকের সাথে। কিন্তু নাদিমের সাথে সম্পর্কের শেষ লাইনটা তখনো টানা হয়নি। ছবির এই শেষের জায়গাটা রেদওয়ান রনি খুব যত্ন ও সময় নিয়েই হয়তো সাজিয়েছেন। শেষটা যদিও মনে হচ্ছিল একঘেঁয়ে বাংলা ছবির মতো শেষ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশ করেননি রেদওয়ান রনি। শুরুতে না পারলেও ছবির শেষ লাইনটা খুব যত্ন নিয়েই এঁকেছেন তিনি। শেষে এটুকুই বলা, এমন ভালো-মন্দে রনির চলচ্চিত্র নির্মাণ চলতে থাকুক। তিনি যেন হুট করেই গিয়াসউদ্দিন সেলিম বা সালাউদ্দিন লাভলুর মতো মৌসুমি নির্মাতা না হয়ে ওঠেন। নিয়মিত ছবির প্রত্যাশা রইলো তার কাছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 31 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ