হাঁপানি হলে যা করবেন

Print
প্রতি বছর মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালিত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। প্রথম স্পেনের বার্সেলোনাতে ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিদের এক সম্মেলনে বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমা (Global Initiative for Asthma-GINA) নামক একটি সংস্থা বিশ্ব অ্যাজমা দিবসের সংগঠক। অ্যাজমা প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর বিশ্ব অ্যাজমা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় :

You can Control Your Asthma. বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা এ দিবসটি যথাযোগ্য
মর্যাদার সাথে পালন করে থাকে। লিখেছেন অধ্যাপক ডা: জি এম ফারুক

হাঁপানির পরিচয়
হাঁপানি রোগটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। হাঁপানি বলতে আমরা বুঝি শ্বাসপথে বায়ু চলাচলে বাধা সৃষ্টির জন্য শ্বাসকষ্ট। হাঁপানির প্রধান তিনটি লক্ষণ হলো- প্রথমে কাশি, বুকে সাঁইসাঁই শব্দ এবং শ্বাসকষ্ট। এগুলোর মধ্যে বুকে সাঁইসাঁই শব্দই হলো হাঁপানি চেনার প্রধান উপায়। প্রদাহজনিত কারণে শ্বাসনালীর পথে বাধার সৃষ্টি হয় এবং এই বাধাপ্রাপ্ত সরু নলের মধ্য দিয়ে বায়ু চলাচলের ফলে সাঁইসাঁই শব্দ হয়। হাঁপানির রোগীরা আর পাঁচজনের মতো চলাফেরা এবং কাজকর্ম করতে পারেন। কিন্তু আক্রমণের সময় কাশি, সাঁইসাঁই শব্দ ও শ্বাসকষ্ট হয়। হাঁপানির এ লক্ষ্মণগুলো সাধারণত ভোররাতে বেশি হয়। বলা যায়, শতকরা ৯০ জন হাঁপানি রোগী রাত ৩টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে শ্বাসকষ্টের শিকার হন। সকালেও কিছুক্ষণ হাঁপানির উপসর্গ থাকে এবং বেলা বাড়ার সাথে সাথে আস্তে আস্তে কমে আসে। রাতে হাঁপানি বাড়ার কারণ হলো- রাতে রক্তে কর্টিজোন এবং অ্যাড্রিনালীনের মাত্রা কমে যায়। প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। তা ছাড়া শোয়ার ঘরে অ্যালার্জেনের মাত্রাও রাতে হাঁপানির কারণ।
বেশির ভাগ হাঁপানি রোগীর শ্বাসকষ্ট হঠাৎ শুরু হয়, সাথে থাকে শুকনো কাশি এবং সাঁইসাঁই শব্দ। অল্প পরে শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে যায় এবং বুকের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয়। প্রশ্বাসের সময় শ্বাসনালীর ব্যাস আরো সরু হয়ে যায় এবং সেই সরু নালীর মধ্যে বাতাস চলাচলের সময় বাঁশির মতো সাঁইসাঁই আওয়াজ শোনা যায়। এ ধরনের শ্বাসকষ্ট সাধারণত হয় রাতে এবং তখন রোগী উঠে বসে থাকে। তা ছাড়া আগেই বলা হয়েছে, বেশির ভাগ রোগীর শ্বাসকষ্ট শেষরাতে বাড়তে দেখা যায়।
মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, হাঁপানির একমাত্র কারণ অ্যালার্জি। যদিও অ্যালার্জি হাঁপানির একটি প্রধান কারণ। কিন্তু অ্যালার্জি ছাড়াও অনেক কারণই হাঁপানির জন্য দায়ী। যে উদ্দীপক কারণ হাঁপানির জন্য দায়ী সেগুলোকে বলা হয় ট্রিগার ফ্যাক্টর।

হাঁপানির কারণ
ক. ভাসমান অ্যালার্জেন : ঘরের ধুলো, ঘরের ধুলোর পোকা, পরাগরেণু, পোষা প্রাণীর পশম, ছত্রাকের স্পোর, আরশোলার অ্যালার্জেন, ত্বকের মামড়ি ইত্যাদি।
খ. জ্বালাকারক বা উত্তেজক ধোঁয়া, যেমন বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, বাতাসে ভেসে বেড়ানো বিভিন্ন গ্যাস, মশা মারার ধূপ, সুগন্ধী সাবান, সেন্ট, পাউডার, ডিওডোরান্ট ইত্যাদি।
গ. জীবাণু সংক্রমণ, শ্বাসনালীর সংক্রমণ, যেমন- রাইনো ভাইরাস, কোরোনা ভাইরাস, এডিনো ভাইরাস ইত্যাদি দ্বারা নাক, গলা ও বুকের সংক্রমণ।
ঘ. ব্যায়াম বা অতি পরিশ্রম কিংবা খেলাধুলা।
ঙ. মানসিক : মানসিক টেনশন, অবসাদ, আবেগ, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, হতাশা ও ভয়।
চ. ছত্রাক : ফ্রিজের গ্যাসকিট, চামড়ার জুতো, স্যাঁতস্যাতে জায়গায় বাড়ির আশপাশে ছত্রাক জন্মে। এই ছত্রাকের স্পোর থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে।
ছ. মাইট : ‘মাইট’ জাতীয় জীবাণু থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। এই জীবাণু বিছানা, তোশক, তোয়ালে ও ঘরের ধুলোবালিতে মিশে থাকে।
জ. খাবার : ডিম, দুধ, চিংড়ি, ইলিশ, বোয়াল, গরুর গোশত ইত্যাদিতেও অ্যালার্জি হতে পারে। এ ছাড়া খাবারে যেসব রঙ মেশানো হয় তাতেও অ্যালার্জি হতে পারে।
ঝ. ওষুধের প্রতিক্রিয়া : কিছু কিছু ওষুধের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। যেমন- পেনিসিলিন, সালফার-জাতীয় ওষুধ, কুইনিন, বিটাব্লকার, অ্যাসপিরিন, নোভালজিন প্রভৃতি ব্যথানাশক ওষুধ।

হাঁপানি প্রতিরোধ
১. অ্যালার্জিকারক বস্তু এড়িয়ে চলা। যেমন- ধুলো, বালি, ঘরের ঝুল, ধোঁয়া, ঝাঁঝালো গন্ধ ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা।
২. ঘরবাড়ি ধুলোবালি মুক্ত রাখার চেষ্টা করা। এ জন্য দৈনিক অন্তত একবার ঘরের মেঝে আসবাবপত্র ভেজা কাপড় দিয়ে মুছতে হবে। কিংবা ভ্যাকিউম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
৩. ঘরে কার্পেট না রাখা।
৪. বালিশ, তোশক, ম্যাট্রেসে তুলা ব্যবহার না করা। স্পঞ্জ ব্যবহার করা।
৫. মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তাকে ইতিবাচক মনে মোকাবেলা করা কিংবা মানসিক উত্তেজনা এড়িয়ে চলা।
৬. পরিশ্রম বা খেলাধুলায় শ্বাসকষ্ট বাড়লে চেষ্টা করতে হবে পরিশ্রমের কাজ পরিহার করা।
৭. পেশাগত কারণে অ্যাজমার কষ্ট বাড়লে চেষ্টা করতে হবে স্থান বা পেশার পরিবর্তন করা।
৮. ধূমপান না করা।
৯. যেসব খাবারে অ্যালার্জি সৃষ্টি করে তা পরিহার করা। বিশেষভাবে রঙ দেয়া খাবার পানীয় পরিহার করা।
১০. ফ্রিজের খাবার, ঠাণ্ডা খাবার, আইসক্রিম ইত্যাদি না খাওয়া।
১১. সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করা। ইতিবাচক মন হাঁপানির কষ্ট কমাতে পারে।

হাঁপানি রোগীর কিছু নিয়ম
১. সাধারণ পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহণ করা।
২. রাতের খাবার পেটভরে খাবেন না। ঘুমানোর ২ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খাবেন।
৩. লাল, হলুদ ফল, শাকসবজি নিয়মিত খাবেন। কারণ এতে প্রচুর বিটা ক্যারোটিন থাকে, যা ফুসফুসকে শক্তিশালী করে।
৪. ভিটামিন সি ও ই সমৃদ্ধ খাবার ফুসফুসকে শক্তিশালী করে। এ জন্য সবুজ শাকসবজি প্রচুর খেতে হবে। এক্সট্রা ভারজিন অলিভ অয়েল নিয়মিত খেলে ভালো উপকার পাওয়া যাবে। এ ছাড়া নিয়মিত আপেল খেলেও ফুসফুস শক্তিশালী হবে।
৫. শ্বাসকষ্টের সময় প্রচুর পানি পান করুন, যাতে আপনার কাশি তরল হতে পারে।
৬. বেশি রাত জাগবেন না। নির্দিষ্ট নিয়মে মাঝরাতের আগে ঘুমাতে যাবেন এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে।
৭. নিয়মিত ব্যায়াম করুন। অথবা সকালে হাঁটুন। সাঁতার কাটুন।
৮. মানসিক চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।
৯. রাতে মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করুন।
১০. অতিরিক্ত মসলা, ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত খাবার কিংবা এসিড-জাতীয় খাবার, যা শ্বাসকষ্ট বাড়াতে পারে তা পরিহার করা।
১১. গরুর দুধ, বিশেষভাবে শিশুদের গরুর দুধ না খাওয়ানো ভালো।
১২. হাঁপানি অনেকাংশে বংশগত রোগ। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে দেখা দরকার ছেলেমেয়ের উভয় পরিবারেই হাঁপানি আছে কি না। উভয় পরিবারেই হাঁপানি থাকলে ছেলেমেয়েদের হাঁপানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এমন বিয়ে এড়িয়ে চলা ভালো।
স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনাই হাঁপানি রোগের মূল চিকিৎসা। অন্যান্য চিকিৎসার মতো হোমিওপ্যাথিতেও এ রোগের ভালো চিকিৎসা রয়েছে। মনে রাখবেন, এ রোগে যারা বিশেষজ্ঞ তারাই এর ভালো চিকিৎসা দিতে পারবেন।

লেখক : মহাসচিব, ইন্টিগ্রেটেড অ্যাজমা সোসাইটি। ফোন : ০১৭১২৮১৭১৪৪

 

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 46 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ