হাফ ডজন এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক

Print

প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের (রাঘববোয়াল) বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ব্যাপারে একটি তালিকাও তৈরি করেছে সংস্থাটির গোয়েন্দা ইউনিট। এ তালিকায় স্থান পেয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী এবং সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম। এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের হাফ ডজন এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
এছাড়া দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারাধীন মামলায় যাদের নাম এসেছে তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে ওই তালিকায়। আর বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালরাও এর আওতায় রয়েছেন। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুসহ পর্ষদ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়টিও রয়েছে দুদকের চিন্তায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাঘববোয়ালদের দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও তদন্ত সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইতিমধ্যেই দুদকের মহাপরিচালকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতদিন দুদকের পরিচালক থেকে শুরু করে উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) পর্যন্ত চার স্তরের কর্মকর্তারা দুর্নীতির ঘটনা অনুসন্ধান ও তদন্তে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতেন।
২০০৪ সালের দুদক আইনের ২০ ধারার ২ উপধারায় মহাপরিচালকদের এই ক্ষমতা দেয়া হয়। এ সংক্রান্ত অফিস আদেশে বলা হয়, তারা দুদক আইনের ১৯(১) ও (২) ধারায় তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। বর্তমানে দুদকে ৫ জন মহাপরিচালক কর্মরত আছেন। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা সবাই অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজে যুক্ত হবেন। ৫ জন মহাপরিচালক ছাড়াও দুদকের দুই কমিশনারের দু’জন একান্ত সচিব (পিএস), দুদকের সিস্টেম এনালিস্ট, লিগ্যাল শাখার একজন উপপরিচালক এবং দুদকের গণসংযোগ কর্মকর্তাকে তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে সোমবার ওই অফিস আদেশ জারি করেছে কমিশন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমরা কাজে গতি আনতে কাজ করছি। এরই অংশ হিসেবে মহাপরিচালকদের তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে গেজেট করা হয়েছে।
ইকবাল মাহমুদ গত বছরের মার্চে দুদকের চেয়ারম্যান পদে যোগদানের পর থেকেই সংস্থাটির সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করেন। এই মুহূর্তে তিনি মনে করেন, দুদক অনেক শক্ত অবস্থানে আছে। জড়তা এবং দুর্বলতা কাটিয়ে সংস্থাটি বড় বড় দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহে মাঠে নেমেছে।
ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমরা বসে নেই। দুর্নীতি উদঘাটনে কাজ চলছে। আমিও মনে করি যেখানেই ক্ষমতার অপব্যবহার, সেখানেই দুর্নীতি। যদিও বড় পদে আসীন ব্যক্তির দুর্নীতি খুঁজে বের করা কঠিন। তারপরও সে কাজটি করতে হবে।
চুনোপুঁটি নয়, ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালীদের দুর্নীতি ধরতে দুদকের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা দিন দিন বাড়ছে। দেশবাসীর প্রত্যাশার আলোকে দুদক পরিকল্পনা ছকও তৈরি করছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি দুদকের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের কাছ থেকে দুর্নীতি দমনের কাজে মতামত নেয় দুদক। তারা (সাংবাদিক) দুদক চেয়ারম্যানকে বলেছেন, দৃষ্টান্ত স্থাপনের মতো বড় বড় কিছু দুর্নীতিবাজকে তদন্তের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি ধরতে হবে। তারা বলেন, ক্ষমতা যার কাছে আছে, তারাই দুর্নীতি করে। যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও জনগণের সম্পদ লুটপাট করছে তাদের ধরতে হবে। ‘দৃশ্যমান বড় দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হয়েছে’- এমনটি দুদকের কাছে দেখতে চায় সাধারণ মানুষ। এসব মতামত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনে রাঘববোয়াল ধরতে উল্লিখিত সব পদক্ষেপ নিয়েছে দুদক।
দুদক সূত্র জানায়, এরই মধ্যে দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীকে বিআইডব্লিউটিসির দুর্নীতি তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের অনেক ধরনের দুর্নীতির মধ্যে প্রথমে শুরু করা হয়েছে ড্রেজিং খাতের দুর্নীতির অনুসন্ধান। এছাড়া ড্রেজিং ক্রয়সহ এ খাতের যাবতীয় দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে তাকে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। মহাপরিচালক আতিকুর রহমান খানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত তদারকির। এভাবে ৫ জন মহাপরিচালককেই উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির ধরার কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়। দুদকের আইন ও বিধি অনুযায়ী, মহাপরিচালকরা কমিশনের অর্পিত অন্যান্য নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দু’জন মহাপরিচালক অনুসন্ধান ও বিশেষ অনুসন্ধান বিভাগের দায়িত্বে আছেন। বিচার কাজে অভিজ্ঞ জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম রয়েছেন আইন বিভাগের দায়িত্বে।
আরও জানা গেছে, দুদকের পরিচালক (পর্যবেক্ষণ) মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীকে প্রধান করে গঠিত ৭ সদস্যের একটি গোয়েন্দা ইউনিট কাজ শুরু করেছে। এই টিমের সদস্যরা এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি ও প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের তথ্য সংগ্রহ করছে। বিশেষ করে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র নিয়ে টিম কাজ করছে। টিমের একজন সদস্য জানান, ২৪০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মিলেছে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। বিষয়টি অনুসন্ধান পর্যায়ে থাকায় ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ওই ব্যক্তির নাম বা পরিচয় প্রকাশ করতে চাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
উচ্চপর্যায়ের কতজনের বিরুদ্ধে দুদক কাজ করছে সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারদলীয় অন্তত হাফ ডজন এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শেরপুরের একজন এমপির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ, বরিশালের একজন এমপির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা ও একজন ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব থেকে ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, ময়মনসিংহের নান্দাইলের এমপির বিরুদ্ধে তিন কোটি টাকার জিআর চাল আত্মসাতের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের একজন এমপির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান, শরীয়তপুরের একজন এমপির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ এবং সরকারের আমদানি করা সার পরিবহনে অনিয়ম ও গুদামে সার সরবরাহ না করে বাইরে পাচার ও বিক্রির অভিযোগে নরসিংদীর একজন এমপির প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ। সাবেক সমবায় সচিবসহ বেশ কয়েকজন সরকারি আমলার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নাম আসা অন্তত ১৭ বাংলাদেশির বিষয়ে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করছে দুদক। ওই তালিকায় সরকার দলের একজন শীর্ষ নেতা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামও রয়েছে। তালিকায় আছে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর নাম। তাদের কয়েকজনকে এরই মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। অন্যদিকে চাল নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের ধরতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে দুদক। কারসাজি ও সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়ে বাড়তি টাকা কার পকেটে যাচ্ছে সে বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ চলছে। সূত্র জানায়, চাল দুর্নীতিতে মন্ত্রণালয় বা এর সঙ্গে যুক্ত যার সম্পৃক্ততাই পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে দুদকের অভিযোগ কেন্দ্র হটলাইন ১০৬-এ আসা অভিযোগ থেকেও বেশ কিছু অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। ওই অভিযোগের মধ্যে বেশির ভাগই সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে অন্তত এক ডজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্র ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তদন্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুদকের পরিচালক জায়েদ হোসেন খান অভিযোগ বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে অনুসন্ধান কাজ তদারক করছেন।
এছাড়া দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধান পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী তার টিমের মাধ্যমে অর্থ পাচারসহ বেশ কিছু স্পর্শকাতর দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনও দুর্নীতির তদন্ত তদারকি ও মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির তদন্তেও নতুন করে গতি এসেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছে দুদক। এজন্য দু’জন তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্বও দেয়া হয়েছে। তারা হলেন দুদকের উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম ও উপ-সহকারী পরিচালক জয়নুল আবেদীন। দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ডাকার আগে কিছু ‘হোমওয়ার্ক’ করছি। ঋণ জালিয়াতি ও ব্যাংকের অর্থ তছরুপে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 55 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি