হিন্দু (সনাতন ধর্মীয়) উত্তরাধিকার আইন

Print

হিন্দু (সনাতন ধর্মীয়) উত্তরাধিকার আইন

হিন্দু (সনাতন ধর্মীয়) উত্তরাধিকার আইন, ধর্মীয় বিধি বিধান থেকে সৃষ্টি। প্রকৃতভাবে হিন্দু (সনাতন ধর্মীয়) উত্তরাধিকার আইনের উৎস্য ৩ টি। যথাক্রমে- ক) শ্রুতি, খ) স্মৃতি ও গ) নিবন্ধ।
ক) শ্রুতিঃ
**************
‘শ্রুতি’ শব্দের মানে হলো ‘শোনা বা শ্রবন করা’। প্রাচীনকালে মুনি ঋষিগণ ধ্যনের মাধ্যমে ভগবানের অমিয় বাণী শ্রবণ করে, তা চারবেদে সংকলন করেন। এ বেদগুলিকে শ্রুতি বলে। চারটি বেদ যথাক্রমে- ১) ঋকবেদ, ২) যজুবেদ, ৩) সামবেদ ও ৪) অথর্ববেদ। বেদকে হিন্দু আইনের শ্রেষ্ঠ দলিল বা মূল ভিত্তি বলা হয়।
খ) স্মৃতিঃ
**************
‘স্মৃতি’ শব্দের মানে হলো ‘মনে রাখা’। ভগবানের যে সকল নির্দেশ আর্য্য ঋষিগণ স্মরণে রেখে, পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন, তাকেই স্মৃতি বলা হয়। স্মৃতি শাস্ত্রের রচয়িতা হিসেবে ১) মনু, ২) যাজ্ঞবল্ক ও ৩) যম মনীষির নাম সুপ্রসিদ্ধ। এছাড়া আরোও অনেকে আছেন। স্মৃতি শাস্ত্রকে হিন্দু (সনাতন ধর্মীয়) উত্তরাধিকার আইনের উৎস্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
গ) নিবন্ধঃ
***************
মুনি ঋষিগণ কর্তৃক স্মৃতি শাস্ত্রগুলি রচিত হওয়ার পর, শাস্ত্রগুলি ও প্রচলিত প্রথার মধ্যে কিছু বিরোধ ও অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। যে কারনে প্রাচীন সনাতন ধর্মীয় পন্ডিতগণ উক্ত আইনগুলোর সামঞ্জ্যসের লক্ষ্যে সংগতি রেখে কিছু সংশোধন করেন। প্রাচীন সনাতন ধর্মীয় পন্ডিতগণের মধ্যে- মনীষি বিজ্ঞানেশ্বর ও মনীষি জীমুতবাহন এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। মনীষি বিজ্ঞানেশ্বর রচনা করেন ‘মিতক্ষরা নিবন্ধ’, যা আমাদের দেশে অপ্রচলিত এবং মনীষি জীমুতবাহন রচনা করেন ‘দায়ভাগ নিবন্ধ’, আমাদের দেশের হিন্দুগণ দায়ভাগ আইনেই পরিচালিত।
দায়ভাগ আইনঃ
=================
দায়ভাগ আইন অনুযায়ী যারা মৃত ব্যক্তির আত্মার কল্যানের জন্য পিন্ডদানের অধিকারী, কেবলমাত্র তাঁরাই যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হবেন। এ আইনে মৃত ব্যক্তির পূত্রের পূত্র একইসাথে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। দায়ভাগ উত্তরাধিকার আইনে উত্তরাধিকারী নিরুপনে ৩ টি শ্রেণীর উল্লেখ আছে, যথাক্রমে- ক) সপিন্ড, খ) সাকুল্য ও গ) সমানোদক।
ক) সপিন্ডঃ
****************
যে সকল ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির আত্মার কল্যানের জন্য পিন্ডদানের অধিকারী এবং মৃত ব্যক্তি জীবিত থাকলে, তিনি যাদের মৃত্যুতে পিন্ডদানের অধিকারী হতেন, তাঁরা সকলেই পরস্পরের সপিন্ড।
হিন্দু (সনাতন ধর্মীয়) দায়ভাগ আইনানুযায়ী সপিন্ডগণের ক্রমিক তালিকাঃ
================================================
০১। পূত্র
০২। পূত্রের পূত্র
০৩। পূত্রের পূত্রের পূত্র
০৪। স্ত্রী— ক) পূত্রের স্ত্রী, খ) পূত্রের পূত্রের স্ত্রী ও গ) পূত্রের পূত্রের পূত্রের স্ত্রী।
০৫। কন্যা
০৬। কন্যার পূত্র
০৭। পিতা
০৮। মাতা
০৯। ভ্রাতা, সহোদর ভ্রাতা না থাকলে বৈমাত্রেয় ভ্রাতা।
১০। ভ্রাতুস্পূত্র, সহোদর ভ্রাতা না থাকলে বৈমাত্রেয় ভ্রাতার পূত্র।
১১। ভ্রাতুস্পূত্রের পূত্র, সহোদর ভ্রাতা না থাকলে বৈমাত্রেয় ভ্রাতার পূত্রের পূত্র।
১২। বোনের পূত্র
১৩। পিতার পিতা
১৪। পিতার মাতা
১৫। পিতার ভ্রাতা
১৬। পিতার ভ্রাতার পূত্র (খুড়াতো ভাই)
১৭। পিতার ভ্রাতার পূত্রের পূত্র
১৮। পিতার ভগ্নির পূত্র
১৯। পিতার পিতার পিতা
২০। পিতার মাতার পিতা
২১। পিতার পিতার ভ্রাতা (পিতার খুড়া)
২২। পিতার খুড়ার পূত্র
২৩। পিতার খুড়ার পূত্রের পূত্র
২৪। পিতার পিসির পূত্র
২৫। পূত্রের কন্যার পূত্র
২৬। পূত্রের পূত্রের কন্যার পূত্র
২৭। ভ্রাতার কন্যার পূত্র
২৮। ভ্রাতার কন্যার কন্যার পূত্র
২৯। খুড়ার কন্যার পূত্র
৩০। খুড়ার পূত্রের কন্যার পূত্র
৩১। পিতার খুড়ার কন্যার পূত্র
৩২। পিতার খুড়ার পূত্রের কন্যার পূত্র
৩৩। মাতার পিতা (আজা/নানা)
৩৪। মামা (মাতার ভ্রাতা)
৩৫। মামার পূত্র (মামাতো ভাই)
৩৬। মামার পূত্রের পূত্র (মামাতো ভাইয়ের পূত্র)
৩৭। মাসীর পূত্র (মাতার বোনের পূত্র)
৩৮। মাতার পিতার পিতা
৩৯। মাতার পিতার ভ্রাতা
৪০। মাতার পিতার ভ্রাতার পূত্র
৪১। মাতার পিতার ভ্রাতার পূত্রের পূত্র
৪২। মাতার পিতার বোনের পূত্র
৪৩। মাতার পিতার পিতার পিতা
৪৪। মাতার পিতার পিতার ভ্রাতা
৪৫। মাতার পিতার পিতার ভ্রাতার পূত্র
৪৬। মাতার পিতার পিতার ভ্রাতার পূত্রের পূত্র
৪৭। মাতার পিতার পিতার বোনের পূত্র
৪৮। মাতার ভ্রাতার কন্যার পূত্র
৪৯। মাতার ভ্রাতার পূত্রের কন্যার পূত্র
৫০। মাতার পিতার ভ্রাতার কন্যার পূত্র
৫১। মাতার পিতার ভ্রাতার পূত্রের কন্যার পূত্র
৫২। মাতার পিতার পিতার ভ্রাতার কন্যার পূত্র
৫৩। মাতার পিতার পিতার ভ্রাতার পূত্রের কন্যার পূত্র
******** দায়ভাগ আইন অনুযায়ী মোট সপিন্ডের সংখ্যা ৫৩ জন। তন্মধ্যে পুরুষ সপিন্ড ৪৮ জন ও মহিলা সপিন্ডের সংখ্যা ৫ জন।
******** মহিলা সপিন্ড যথাক্রমেঃ ১) বিধবা স্ত্রী, ২) কন্যা, ৩) মাতা, ৪) পিতার মাতা ও ৫) পিতার পিতার মাতা। উক্ত মহিলা সপিন্ডগণ সম্পত্তির কেবলমাত্র জীবনস্বত্ত্ব প্রাপ্ত হয়ে, মৃত্যু অবধি ভোগ-দখল করতে পারবেন। সাধারনত তাঁরা সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন না। তবে, মৃতের শ্রাদ্ধ এবং নিজ জীবনধারনের অন্যকোন উপায় না থাকলে, আংশিক সম্পত্তি দান/বিক্রয় করতে পারবেন। এ সকল মহিলা সপিন্ড উত্তরাধিকারীগণের মৃত্যুর পর, যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, তা পুনরায় মৃত ব্যক্তির (পূর্বে যার সম্পত্তি ছিল) অনুকূলে ফেরত যাবে। অতঃপর মৃত ব্যক্তির (পূর্বের মালিক) ক্রম-উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে বন্টন।
খ) সাকুল্যঃ
*****************
যে সকল ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধের সময় পিন্ডে পিন্ডলেপ প্রদান করেন, তাঁরা মৃত ব্যক্তির সাকুল্য।
গ) সমানোদকঃ
********************
যে সকল ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধের সময় পিন্ডে পিন্ডজল প্রদান করেন, তাঁরা মৃত ব্যক্তির সমানোদক।
*** বিবেচ্যঃ ****
”””””””””””””””””””””””’
প্রথম শ্রেণীর (সপিন্ড) উত্তরাধিকারী না থাকলে, দ্বিতীয় শ্রেণীর (সাকুল্য) উত্তরাধিকারী এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর উত্তরাধিকারী না থাকলে, তৃতীয় শ্রেণীর (সমানোদক) উত্তরাধিকারীগণ মৃত ব্যক্তির ত্যাক্ত সম্পত্তির প্রকৃত ওয়ারেশ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
সম্মানিত পাঠকগণ, ভূমির প্রকৃত উত্তরাধিকারী/ওয়ারেশগণের ন্যায়সংগত হিস্যাংশ প্রাপ্তির সম্যক ধারণা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সংক্ষিপ্ত আকারে (বিস্তারিত কলেবরে নয়) আমার এ প্রয়াস। যারা প্রকৃত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাঁদেরকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। যদি আমার এ প্রয়াসে কারো সামান্যতম উপকার হয়, তবে এ পরিশ্রম সফল বলে মনে করবো।
[সংগৃহীতঃ অনুসৃত পুস্তিকা- “ভূমি ব্যবস্থাপনা ও জরিপ”, এম.ডি. আব্দুস সালাম ও অন্যান্য]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 776 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ