১২ গবেষণা প্রতিষ্ঠান কৃষকের স্বপ্ন পূরণে

Print

এমন ধান হবে যাতে জীবাণু সংক্রমণ হবে না, রোগবালাই থাকবে দূরে। তীব্র শীত কিংবা মাত্রাতিরিক্ত বর্ষা যে কোনো পস্থিতিতিতেই ধান আবাদ হবে। পানিতে তলিয়ে থাকলেও ধান আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। লবণপানি ও মাটি বা খরা যে কোনো পস্থিতিতে ফলনে প্রভাব পড়বে না- এমন স্বপ্ন কৃষকের। শুধু ধান নয়, সব খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রেই এমন স্বপ্ন দেখেন কৃষক। কৃষকদের স্বপ্ন পূরণে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে ১২ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে তুলে দিচ্ছে।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আবুল কালাম আযাদ বলেন, দেশের কৃষি-পরিবেশ উপযোগী প্রায় সব জাত উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এখন ভবিষ্যতে দেশে জলবায়ু, কৃষি-পরিবেশ কেমন হবে, তার ধারণা নিয়ে কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বিজ্ঞানী জানান, কৃষি নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করতে হয় এবং হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের কৃষি পরিবেশ ও কৃষকদের চাহিদা বিবেচনা করা হচ্ছে।

নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূল মোকাবিলা করে দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের সাড়ে সাতশ উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে আলুর চারটি ও গমের দুটি নতুন জাত কৃষকদের মাঠে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। চেক জাতের চেয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের এ জাতগুলো মাঠে আবাদের মাধ্যমে দেশের আলু ও গম উত্পাদন আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা।
কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৯৭১ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি। সে সময় চালের উত্পাদন ছিল এক কোটি টন। দেশের জনসংখ্যা এখন দ্বিগুণের বেশি। আর চালের উত্পাদন সাড়ে তিন কোটি টন ছাড়িয়েছে। একইভাবে উত্পাদন বেড়েছে অন্যান্য ফসলেরও। অথচ জমি কমেছে। প্রতি বছর মোট আবাদি জমির শূন্য দশমিক সাত শতাংশ জমি কমছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় এনে কৃষি বিজ্ঞানীর কাজ করে যাচ্ছেন।
ধান গবেষণা
ধান গবেষণায় ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সারাবিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বাংলাদেশের গবেষণার ধান এখন বিদেশের মাঠেও চাষাবাদ হচ্ছে। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উচ্চফলনশীল ধানের জাত এবং ধান উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠার পর বর্তমানে ধান উত্পাদন বেড়েছে তিনগুণের বেশি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটি ৭৮টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া উদ্ভাবন করেছে চারটি হাইব্রিড ধানের জাত।
মঙ্গা মোকাবেলার জাত ব্রি ধান-৩৩, বন্যা পরবর্তী সময়ের উপযোগী জাত ব্রি ধান ৪৬, লবণাক্ত এলাকার উপযোগী জাত ব্রি-৪০, ব্রি-৪১ ও ব্রি-৪৭, অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা এলাকার উপযোগী জাত ব্রি-৪৪, সুগন্ধি ধান ব্রি ধান-৫০ (বাংলামতি), জিংক সমৃদ্ধ ধান ব্রি-৬২। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্রি-২৯ জাতে ভিটামিন ‘এ’ সংযোজন করা হয়েছে। হঠাত্ বন্যা ও জলাবদ্ধতায় আমন চাষে কৃষকদের সকল অনিশ্চয়তা দূর করে সুখবর নিয়ে আসে ব্রি-৫১ ও ব্রি-৫২ জাতের ধান। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. ভাগ্যরানী বনিক বলেন, প্রতিকূল পরিবেশ সহনীয় বোরোর প্রায় সবধরনের জাত আমাদের রয়েছে। এখন আউশ ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য আমরা কাজ করছি। দিন কম লাগে এবং ফলনও ভালো থাকে এমন জাত উদ্ভাবন করা হবে বলে তিনি জানান।
অন্যান্য ফসল গবেষণা
ধান বাদে অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রধানত আমদানি নির্ভর। নানা কারণে কৃষকদের এসব পণ্য আবাদে আগ্রহও কম। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আবুল কালাম আযাদ জানালেন, একটি নতুন জাত উদ্ভাবনের পর এটা বেশ ভালোভাবেই চাষাবাদ হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর রোগজীবাণুর আক্রমণ শুরু হয়। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় এনে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করতে হয়।
ধান, পাট ও আখ ছাড়া অন্যান্য কৃষি পণ্য ও ফসল নিয়ে গবেষণার জন্য ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। গবেষণালব্ধ নতুন নতুন জাতের কারণে দেশে সব ধরনের ফসলের উত্পাদন বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটি দুশর বেশি ফসল ও বিভিন্ন শস্যের ৪৯৬টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা করছে গম, ভুট্টা, চীনা, কাউন, ডালশস্য, তেলবীজ, কন্দাল জাতীয় ফসল, ফল-ফুল, সবজি ও মসলাজাতীয় ফসল নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটি দানাজাতীয় ফসলের ৬৭টি জাত উদ্ভাবন করেছে, এর মধ্যে ২৮টি গমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
ডালের উত্পাদন বাড়াতে মসুর, ছোলা, মুগ, খেসারিসহ ৩৬টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন ফলের ৭৫টি জাত উদ্ভাবন করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ঘাটতি কমাতে পেঁয়াজ, হলুদ, আদা, কালোজিরা, মরিচসহ মসলার ৩১টি জাত উদ্ভাবন করেছে। কন্দাল জাতীয় ফসল ১০৫ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। তেলবীজের ৪৪টি জাত উদ্ভাবন করেছে। বছরজুড়ে সবজির উত্পাদন বাড়াতে ১০৯টি সবজির নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, অর্কিড, জারবেরা, অ্যান্থুরিয়ামসহ ১৯টি ফুলের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে।
সব ফসল নিয়ে গবেষণা করছে বিনা
পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও জীব-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বংশগতি ধারায় পরিবর্তন করে অধিক ফলনশীল ও মানসম্মত ধান, পাট, তেলবীজ, ডাল ও সবজিজাতীয় শস্যের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা করছে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউটে এ যাবত্ ১২টি ফসলের ওপর গবেষণা করে ৮১টি নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবিত বিনাধান-৭ কার্তিকের মঙ্গা নিরসনে ভূমিকা রাখছে।
পাট নিয়ে গবেষণা
দেশের কৃষি পরিবেশ ও কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করছে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ৪১টি উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে ১৬টি জাত মাঠ পর্যায়ে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। এসব জাত ব্যবহার করে পাটের গড় উত্পাদন বেড়েছে এবং কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন। গত সপ্তাহে এ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত পাটের একটি নতুন জাত কৃষকদের মাঠে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দিয়েছে সরকার। নতুন এ জাত নিয়ে গবেষণা করেছেন কৃষিবিজ্ঞানী আল-মামুন। তিনি বলেন, জাতটি আঁশ উত্পাদনকারী একটি উন্নত জাত। জাতের কাণ্ড লাল রঙের, যা এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত জাতসমূহ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, জাতটি দ্রুত বর্ধনশীল, জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু, অধিক ফলনশীল। উঁচু-নিচু পাহাড়ি অঞ্চল, চর অঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলে চাষাবাদ উপযোগী।
ইক্ষু গবেষণায় বিজ্ঞানীরা
ক্রমবর্ধমান গুড় ও চিনিশিল্পের জন্য ইক্ষু উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৫১ সালে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আখচাষ দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে স্বল্প বৃষ্টিপাত এলাকার জন্য উপযোগী এক নির্ভরযোগ্য অর্থকরী ফসল। এ যাবত্ ইনস্টিটিউট ইক্ষুর জাত ৪১টি উদ্ভাবন করেছে।
চা নিয়ে গবেষণা
চায়ের রাজ্য খ্যাত সবুজ-শ্যামলে ঘেরা শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)। ১৯৫৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইনস্টিটিউট এ যাবত্ উচ্চফলনশীল ও আকর্ষণীয় গুনগতমান সম্পন্ন ২০টি ক্লোন ও ৫টি বীজজাত উদ্ভাবন করেছে। বর্তমানে ৮টি গবেষণা বিভাগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
চলছে গবেষণা মাটি নিয়ে
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট মাটি নিয়ে গবেষণা করছে। মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উপর প্রভাব, মাটির উর্বরতা নিয়ে গবেষণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
রেশম শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যে ৯টি উচ্চফলনশীল তুঁতজাত এবং ২৮টি রেশমকীটের উচ্চফলনশীল জাত ও ২টি সঙ্কর জাত উদ্ভাবন করেছে।
বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ড নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করছে তুলার। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, প্রাণীর রোগবালাই ও নতুন জাত নিয়ে গবেষণা করছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট।
বন গবেষণা ইনস্টিটিউট
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা করছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন করছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 79 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ