১২ বুদ্ধিজীবীর কাছে নতুন সূর্যের প্রত্যাশা

Print

ওরা উজ্বল নক্ষত্রই। নিজ নিজ পেশায় সাফল্যের শিখরে উঠে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। এক নামে সবাই চেনেন-জানেন। পেশায় প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েই নিজেদের ‘দেশের সম্পদে’ রূপান্তর করেছেন। দেশে বিভাজনের রাজনীতিচর্চায় বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, বিদ্যাজীবী, পেশাজীবীদের দলবাজির বিতর্ক আছে। কারো কারো মেরুদ-হীনতা, দলদাস মনোবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপরও অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা দেশের জন্য নিজের মেধা-চিন্তা চেতনা কাজে লাগাতে সক্ষম। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষে প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ পাঠানোর আগে সার্চ কমিটি যে ১২ জন সিনিয়র নাগরিকের মতামত নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন; এরা তাদের অন্যতম। দু’একজনের বিরুদ্ধে বিশেষ রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি দুর্বলতার অভিযোগ থাকলেও ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক অবস্থানে তারা জাতীয় সম্পদ। জাতীয় স্বার্থে তারা সুচিন্তিত মতামত দিয়ে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ভোটের অধিকার রক্ষায় খাদের কিনার থেকে গণতন্ত্রের সূর্যের উদয় ঘটাতে পারেন। সিনিয়র নাগরিক হিসেবে তাদের যেমন এটা নৈতিক দায়িত্ব; তেমনি দেশের ১৬ কোটি মানুষ সে প্রত্যাশায় প্রহর গুনছেন।
‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি হঠাৎ অনেকের হৃদয়ে দোলা দিতে শুরু করেছে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় আইসিওতে থাকা ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ এবং বিভেদের জরাজীর্ণতা ঘুচে গণতন্ত্রের আকাশে রাজনীতির নতুন সূর্যের উদয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন ১২ সিনিয়র নাগরিক। প্রেসিডেন্টের সার্চ কমিটি ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিতর্ক উঠেছে; অনুসন্ধান কমিটির প্রথম বৈঠকে ‘১২ নাগরিকের সঙ্গে সংলাপ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’ সেই বিতর্ক চাপা দিয়েছে। ছয় সদস্যের সার্চ কমিটির ৩১ রাজনৈতিক দলের কাছে পছন্দের ১৫৫ জনের নাম আহ্বান করেছেন। দেশের ১২ জন সিনিয়র নাগরিকের মতামতকে নতুন ইসি গঠনে গুরুত্ব দেয়া হবে এমন প্রত্যাশা দেশবাসীর। কারণ যাদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন ইসি গঠনে প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় তারা সবাই দেশের সূর্য সন্তান। নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়ে জাতির বিবেকের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠত। তারা জাতীয় বৃহৎ স্বার্থে সবার গ্রহণযোগ্য ইসি গঠনে পরামর্শ দেবেন সে প্রত্যাশা করছে দেশের মানুষ। দেশের যে শতাধিক ব্যক্তি সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন তাদের মধ্যে এই ১২ ব্যক্তিত্ব অন্যতম।
নতুন নির্বাচন কমিশন হবে দেশের রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের টার্নিং পয়েন্ট। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ যে ভোটের অধিকার হারিয়েছে তা দেশে-বিদেশের বিবেকবানদের ভাবিয়ে তুলেছে। এখন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষে মহামান্য প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের সার্চ কমিটি গঠনের পর ওই কমিটির দিকে যায় সবার দৃষ্টি।  গঠিত সার্চ কমিটির সদস্যদের দল সম্পৃক্ততা নিয়ে শুরু হয় দলাদলি এবং সিনিয়র-জুনিয়র ইস্যুতে বিতর্ক। কিন্তু প্রথম বৈঠকে কমিটি সংলাপের মাধ্যমে ১২ বিশিষ্টজনের মতামত নেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় সবার দৃষ্টি এখন ওই ১২ জন সিনিয়র নাগরিকের দিকে। মূলত ওই ১২ নাগরিকের মতামতের উপর আগামী দিনে জনগণের ভোটের অধিকার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি, প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্কসহ অনেক কিছু নির্ভর করছে।
যে ১২ সিনিয়র নাগরিকের সঙ্গে আজ সার্চ কমিটির বৈঠকের কথা তারা হলেনÑ বিচারপতি মো. আবদুর রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ও পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা।
দেশের এই স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের অন্যতম অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপনা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্তিকা বিভাগের শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হন। তার সাফল্য আকাশছোঁয়া। অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালও সফল ব্যক্তিত্ব। মানবাধিকারকর্মী হিসেবে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। আইন ও শালিস কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় সুলতানা কামাল সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। ২০০৭ সালে তারা চার উপদেষ্টা সংলাপের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের চেষ্টা করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে রাজী করতে না পারায় উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা ছিলেন ঝানু আমলা। সিইসি হিসেবে তিনি ভোটারদের আইডি কার্ডের প্রবর্তণসহ জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী সাফল্য দেখিয়েছেন। সিইসি হিসেবে তিনিই রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনে বাধ্য করেন এবং প্রতিবছর দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়ার আইন করেন। নির্বাচন কমিশন সংস্কারে তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ইসিতে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নের্তৃত্বেই কাজ করেছেন। তারা নির্বাচনে পেশিশক্তি রোধ, জাল ভোট ঠেকানো এবং জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিইসিকে সহায়তা করেন। তাদের সময় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসির ভাবমর্যাদা গড়ে ওঠে। দু’জনই নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত। তিনি কয়েক যুগ ধরে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, জনগণের ভোটের অধিকার ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করছেন। জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে তার গবেষণাধর্মী লেখা দেশ-বিদেশে সমাদৃত। ড. বদিউল আলম মজুমদার সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক। দীর্ঘ দিন থেকে তিনি নির্বাচন, সরকার ব্যবস্থা, জনগণের ভোটের অধিকার, যোগ্য প্রার্থী বেছে নেয়া ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করছেন। তারা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে এবং জনপ্রতিনিধিদের জনগণের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন নতুন আইন প্রণয়নে নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করেন। শুধু তাই নয়, নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্যাদি জনগণের সামনে তুলে ধরেন এবং যোগ্য প্রার্থীদের ভোট দিতে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দলমত নির্বিশেষে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। পেশাগত জীবনে তিনি শুধু সাফল্যই দেখাননি, পাশাপাশি দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে নিজেকে সবার কাছে গ্রহণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছেন। তিনি নানা বিষয়ে গবেষণার পাশাপাশি গাছপাথর ছদ্ম নামে একটি জাতীয় দৈনিকে দীর্ঘ দিন ‘সময় বাহিয়া যায়’ কলাম লিখে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তার ওই লেখা এতই পাঠক সমাদৃত ছিল যে, দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতাসীনদের বাধ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি তিনি এতোই সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন যে, ব্যক্তি জীবনের চেয়ে দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ চিন্তাই তাকে বেশি করতে দেখা যায়। তিনি কয়েক যুগ ধরে দেশের মানুষ, রাজনীতি, জনগণের অধিকার, ইসলামবিদ্বেষী ইঙ্গ-মার্কিনীদের মৌলবাদ, জঙ্গি শব্দগুলোর অপপ্রচারণার কারণ খুঁজতে গবেষণা করেন। রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে তার লেখা প্রচুর বই রয়েছে। তিনি ব্যক্তি জীবনের চেয়ে দেশের স্বার্থ এতই বেশি গুরুত্ব দেন যে, নিজের একমাত্র পুত্র ফয়সাল আরেফিন দীপন দুর্বৃত্তের হাতে খুন হওয়ার পর তিনি ছেলে হত্যার বিচারের বদলে দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। মানুষ হিসেবে তিনি এত বড় মনের যে ব্যক্তি জীবন, দলীয় চিন্তা-চেতনার চেয়ে দেশের ভবিষ্যই তার জীবনের মুখ্য চাওয়া। পুলিশের মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা পুলিশ সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে নিজেকে অন্যরকম মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। বিচারপতি আবদুর রশিদ হাইকোর্ট থেকে অবসর নিয়ে বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হন। তার মেয়াদকালে আইন কমিশনের সবচেয়ে বড় সুপারিশ ছিল ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন।
এই ব্যক্তিত্বের প্রতি দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। সাধারণ মানুষ মনে করেনম এই ব্যক্তিত্ব দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জনগণের ভোটের অধিকারের কথা চিন্তা করে জাতির বিবেক হিসেবে সার্চ কমিটিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন। কারণ মানুষ সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের প্রত্যাশা করে। তাদের সুপরামর্শ গ্রহণ করে সার্চ কমিটি নতুন ইসি গঠনে প্রেসিডেন্টের কাছে নামের তালিকা দেবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে প্রেসিডেন্ট সেখান থেকে সর্বজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে নতুন ইসি গঠন করবেন। যা বিরোধের বদলে সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। দেশের গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকারের চরম দুর্দিনে ১২ সিনিয়র নাগরিক সুবিবেচক হিসেবে সার্চ কমিটিরকে পরামর্শ দেবেন; যাতে দেশের গণতন্ত্রের আকাশে নতুন সূর্যের উদয় ঘটে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা জাতি ভোটের অধিকার হারা। ‘আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র’ এই আজগুবি তত্ত্বে দিশেহারা মানুষ। জনগণ ভোট দিতে না পারায় গণতন্ত্রের সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম। গ্রহণযোগ্য ইসি গঠনে ভূমিকা রেখে ১২ বিশিষ্ট নাগরিক জনগণের ভোটের অধিকারের সূর্য উঠাবেন সে প্রত্যাশায়।

-ইনকিলাব

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 106 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ