২০-৪০ শতাংশ কম দামে বাজারে আসছে এসএমসির ওষুধ

Print

বাজারে আসছে এসএমসির ওষুধ

মা-বাবার হাত ধরে থাকা মাঝের শিশুটির প্রতীক দেখলে কারো বুঝতে বাকি থাকে না এটি এসএমসির (সোশ্যাল মার্কেটিং কম্পানি) লোগো। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এই প্রতিষ্ঠানটিই ৪৩ বছর ধরে দেশে সামাজিক বিপণনের ধারণা জনপ্রিয় করেছে। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু হয় এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের। পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যের পাশাপাশি খাদ্য, পুষ্টি ও সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধের চাহিদা পূরণে এসএমসি এন্টারপ্রাইজ ফার্মা এবং খাদ্য ব্যবসায় যাচ্ছে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী রেজা খান। এ মাসেই বাজারে আসছে কয়েকটি ওষুধ। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসএমসি এন্টারপ্রাইজের পথচলা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এসএমসির শুরুটা হয়েছিল খুব ছোট পরিসরে, প্রকল্প হিসেবে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার, ইউএসএইড এবং পিএসআই নামে ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৯০ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ অলাভজনক কম্পানি হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। দ্রুত জনসংখ্যার বৃদ্ধি থামাতে সদ্য স্বাধীন দেশে সরকারের পাশাপাশি এসএমসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া বাংলাদেশে ডায়রিয়াজনিত কারণে শিশু মৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল।

এটা মোকাবেলায় এসএমসি নিয়ে আসে এক যুগান্তকারী ‘ওআরএস’ যেটা ওরস্যালাইন-এন নামে এখন বাজারে পাওয়া যায়।এসএমসির জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী এবং ওআরএস জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে জানিয়ে এসএমসি এন্টারপ্রাইজের এমডি মো. আলী রেজা খান বলেন, ‘দেশজুড়ে সচেতনতা তৈরি, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশ কৃতিত্বের দাবিদার এসএমসি। ওআরএসের বাজারে এসএমসির মার্কেট শেয়ার ৫৫ শতাংশ। বাকিটুকু অন্য ২০টি কম্পানির। দেশের কনডম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬২ শতাংশ আমাদের পণ্য ব্যবহার করে। ৪৩ শতাংশ পিল ব্যবহারকারী আমাদের সামগ্রী ব্যবহার করে। ১৮ শতাংশ মানুষ আমাদের ইনজেক্টেবল জন্মবিরতিকরণ সামগ্রী ব্যবহার করে। ’

এসএমসির কর্মসূচি বাস্তবায়নে শুধু বিদেশি সংস্থার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসএমসি এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমাদের অলাভজনক প্রতিষ্ঠানেও কিছু অতিরিক্ত রেভিনিউ থেকে যায়, যা পুনঃ বিনিয়োগের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ঘটানো সম্ভব। তখন বোর্ডের সিদ্ধান্তে ২০১৪ সালের অক্টোবরে লাভজনক কম্পানি হিসেবে এসএমসি এন্টারপ্রাইজের যাত্রা শুরু হয়। ’

‘তবে এন্টারপ্রাইজের আওতায় আমরা যত কিছুই করি না কেন আমাদের করপোরেট দর্শন একই। সেটা হলো আমরা যেসব পণ্য বাজারজাত করব সেখান থেকে অর্জিত লভ্যাংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করব। গত অর্থবছরে আমরা ৩৬ কোটি টাকার মতো নিট মুনাফা করেছি। চলতি অর্থবছরে আমরা আশা করছি ৪৬ কোটি টাকা মুনাফা থাকবে। ’ প্রায় ১৩ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা করছেন এসএমসি এন্টারপ্রাইজের এমডি।

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আমরা সচেতনতা তৈরি করি। গত বছর আমরা কড়াইল বস্তিতে নিজস্ব অর্থায়নে একটি কর্মসূচি সম্পন্ন করেছি। এ বছরও আমরা দুটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। ’

দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর প্রবৃদ্ধি খুব একটা ভালো না বলে জানালেন আলী রেজা খান। তিনি বলেন, ‘পিলের ক্ষেত্রে গত ২-৩ বছরে ২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। কনডমের ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা। তবে দেশে ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি এসএমসির একটা বিরাট ভূমিকা আছে। ’

ভালুকায় এসএমসির কারখানায় বছরে ৬৬ কোটি ৫০ লাখ ওআরএস উৎপাদন হয়। ওই কারখানা আরো সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানালেন আলী রেজা খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি রিপ্যাকেজিং ইউনিট আছে যেখানে আমরা বিদেশ থেকে কিছু পণ্য এনে ওভার ব্র্যান্ডিং করি। আমরা সম্প্রতি ওখানে একটি ফুড ম্যানুফ্যাকচারিং ডিভিশন তৈরি করেছি যেখান থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য বাজারজাত করা হবে। এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে পাওয়া যাবে একটি রিফ্রেশিং ড্রিংক পাউডার। ভিটামিন ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ এ পাউডার মানুষের ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতে কাজে লাগবে বলে জানান এসএমসি এন্টারপ্রাইজের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

এসএমসি এন্টারপ্রাইজের আওতায় হাইজিন ডিভিশনের ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট হচ্ছে কুমিল্লায়। সেখানে স্বল্পমূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন, শিশুদের ডায়াপার ইত্যাদি উৎপাদন করা হবে। ইতিমধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন শুরু করেছে এসএমএসি। দুই মাসের মধ্যে শিশুদের হাইজিন সামগ্রী উৎপাদন হবে জানিয়ে আলী রেজা খান বলেন, ‘আমাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ইতিমধ্যে দেশে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে এবং বাজারে এর ভালো চাহিদা রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য এসব পণ্য স্বল্পমূল্যে মানুষের মধ্যে সরবরাহ করা। ’

এসএমসি ওষুধের বাজারেও আসছে জানিয়ে আলী রেজা খান বলেন, “আমরা এ মাসেই ৮-১০টি প্রেসক্রিপশন ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য নিয়ে বাজারে আসছি। আমরা দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে ওষুধ সরবরাহ করতে ওষুধশিল্পে যাচ্ছি। সেগুলোর মান অবশ্যই উন্নত হবে। মান নিয়ে এসএমসি কখনোই আপস করে না। অন্যান্য সমমানের ওষুধ থেকে এসএমসির ওষুধের দাম ২০-৪০ শতাংশ কম রাখা হবে। মহিলাদের ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম ও আয়রনজাতীয় ট্যাবলেট এবং শিশুদের ক্ষেত্রে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জাতীয় পণ্যের প্রতি আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। শিশুদের পুষ্টি ও আয়রন স্বল্পতা দূর করতে আমাদের ‘মনিমিক্স’ বাজারে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যে পণ্য এ দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে, আমরা ভবিষ্যতে সেসব পণ্য বাজারে আনব। আপাতত আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের জুলফারের বাংলাদেশ কারখানায় ওষুধ উৎপাদন করব। ভবিষ্যতে নিজস্ব ফার্মা ফ্যাক্টরি করার পরিকল্পনাও আমাদের আছে, যার জন্য আমরা গাজীপুরে জমি নিয়েছি। এটা করতে বছর দুয়েক সময় লাগবে, তখন আমরা সব ধরনের ফার্মা পণ্য নিজস্ব কারখানা থেকেই উৎপাদন করতে পারব। ”

এসএমসির করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম (সিএসআর) কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে আলী রেজা খান বলেন, ‘সিএসআর কার্যক্রমের আওতায় আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ফার্মগেটে একটি পে টয়লেট কাম বাস শেডের ব্যবস্থা করছি। এখানে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য খুবই পরিচ্ছন্ন দুটি ভিন্ন টয়লেট থাকবে। এটি সফল হলে আমরা ঢাকার অন্যান্য জায়গায়ও একই ধরনের টয়লেট স্থাপন করব। সেখানে সুপেয় পানিও পাওয়া যাবে। ’

আলী রেজা খান মনে করেন, পপুলেশন ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বোনাসকাল কাজে লাগাতে হলে মানুষের দক্ষতা বাড়াতে হবে। তাহলে আরো সমৃদ্ধশালী দেশ গড়া সম্ভব হবে।

এসএমসির এন্টারপ্রাইজের সাফল্যের পেছনে কর্মীদের ভূমিকা স্মরণ করে প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকেই যারা কাজ করেছে তাদের অধ্যবসায়, একাগ্রতা এবং নেতৃত্বদানকারীদের সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এসএমসি এত দূর এগিয়েছে। এসএমসি প্রতি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দরদ এবং চ্যালেঞ্জ নেওয়ার ক্ষমতা এসএমসিকে এত বড় করেছে। ২০১৭-১৮ সালে আমরা ৫৫০ কোটি টাকার রেভিনিউ কল্পনা করছি। আমার স্বপ্ন আগামীতে পণ্যের পরিসর ও রাজস্বকে দ্বিগুণ করা। ’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 53 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ