৪ গুণ ব্যয় বাড়বে গ্যাস কিনতে

Print

চড়া দামে এলএনজি আমদানি। ৬ টাকা ২২ পয়সার প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ২০১৮ সালে সাড়ে ৩২ টাকায় কিনতে হবে গ্রাহককে
চড়া দামের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (লিক্যুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস-এলএনজি) আমদানির কারণে সার্বিকভাবে উচ্চমূল্যের গ্যাসের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে উত্পাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে এলএনজি মিশিয়ে বিক্রি করা হলেও তা বর্তমান দামের চেয়ে গড়ে সোয়া চারগুণ বেশি দামে বিক্রি করতে হবে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। আবাসিক থেকে শিল্প, সবশ্রেণির গ্রাহকদেরকেই গ্যাস কেনা বাবদ অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হবে। সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক প্রতিবেদনে এ চিত্র ফুটে উঠেছে।

দেশে বর্তমানে গ্রাহকরা গড়ে প্রতি মিটার গ্যাস কিনছেন ৬ টাকা ২২ পয়সায়। ২০১৮ সালে যখন এলএনজি বাজারজাত করা হবে তখন এর দাম বেড়ে ৩২ টাকা ৫৩ পয়সায় দাঁড়াতে পারে। অর্থাত্ গ্রাহকদেরকে বর্তমানের চেয়ে ৪২৫ শতাংশ বেশি দামে গ্যাস কিনতে হবে। দেশের ভবিষ্যত্ জ্বালানি মিশ্রণে গ্যাসের দাম এত বাড়লে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের অগ্রগতিতে বড় বাধা তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমদানিকৃত এলএনজিকে রিগ্যাসিফিকেশন করে উত্পাদিত গ্যাস এবং দেশে উত্পাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মিশ্রণের মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর একটি কমিটি গঠন করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ওই কমিটির জমা দেয়া প্রতিবেদন গত মঙ্গলবার জ্বালানি বিভাগের এক সভায় উপস্থাপন করা হয়।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়, এলএনজি আমদানির জন্য বাজার মূল্য অনুযায়ী গ্যাস বিক্রি করা প্রয়োজন। এটি শুরুতেই করা সম্ভব হবে না। অপরদিকে এলএনজি রিগ্যাসফিকেশন করে উত্পাদিত গ্যাস অবকাঠামোগত এবং উচ্চ বিক্রয় মূল্যের কারণে সরাসরি বিক্রি করা সম্ভব হবে না। তাই দেশিয় গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে সরবরাহ করাই হবে বাস্তবসম্মত। গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে এলএনজি আমদানির জন্য রাজস্ব সংগ্রহ করা যেতে পারে। সরকার এলএনজি আমদানির জন্য সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট সম্পূর্ণ রেয়াত দেবে। এভাবে সংগৃহিতব্য রাজস্ব এলএনজি আমদানিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস শুল্ক হারও পুননির্ধারণ করা হতে পারে। শ্রেণিভেদে গ্যাস ব্যবহারে অগ্রাধিকার ক্রম তৈরি করে দিতে পারে সরকার। এতে গ্যাসের উপযুক্ত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার হবে এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির পরিমাণ কমানো যাবে ।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ছাড়া প্রতি ঘনমিটার দেশিয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্পাদন ব্যয় প্রায় ৪ টাকা ৩০ পয়সা। এসডি ও ভ্যাটসহ প্রতি ঘনমিটারের উত্পাদন ব্যয় দাঁড়ায় ৯ টাকা ৫৫ পয়সা। ভর্তুকি দেয়ার পর আবাসিক, বিদ্যুত্, সার, শিল্পসহ আটটি খাতে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি হয় ৬ টাকা ২২ পয়সায়। কিন্তু ২০১৮ সালের জুলাইয়ের পর জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনে ৫০ কোটি ঘনফুট ও ২০২৪ সালে আরো ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি যোগ হলে ঘনমিটার প্রতি গ্যাসের উত্পাদন ব্যয় দাঁড়াবে ১৪ টাকা ৬৪ পয়সা। আর আমদানি পর্যায়ে এলএনজির কর ও ভ্যাট যুক্ত হয়ে এর বিক্রয় মূল্য দাঁড়াবে ৩২ টাকা ৫৩ পয়সার বেশি। এটি বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় ৪২৫ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উত্স জ্বালানীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। অল্প সময়ের ব্যবধানে গ্যাসের দাম সোয়া চার গুণ বাড়লে পরিবহন, শিল্পসহ সব খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে অরাজকতার সৃষ্টি হতে পারে। এতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে ও বাজার ব্যবস্থাপনায় পড়বে তার প্রভাব।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৩০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাত্ দেশে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি মেটাতে ২০১০ সালে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু এটি বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা দেয়। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। চুক্তি অনুযায়ী কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১ লাখ ৩৮ ঘনমিটার এলএনজি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এ টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানিকৃত এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট হারে ওই টার্মিনাল থেকে প্রতি শিপমেন্ট থেকে জাতীয় গ্রিডে ছয়দিন গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে। এ টার্মিনাল থেকে ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ নাগাদ গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার আশা করছে সরকার। ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজে করে এলএনজির একটি চালান আসতে সাতদিন সময় লাগবে। আর খালাসসহ আনুষঙ্গিক দুই দিন যোগ করলে মোট নয়দিন সময় লাগবে। ফলে এ প্রক্রিয়ায় একাধিক এলএনজি জাহাজ ব্যবহার করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়া প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (বিটিইউ) এলএনজির আমদানি ব্যয় ৮ ডলার বিবেচনায় প্রতি চালান অর্থাত্ ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে ২৪ মিলিয়ন ডলার বা ১৯২ কোটি টাকা। প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহের জন্য প্রতি মাসে এমন পাঁচটি চালান দরকার হবে। এ হিসাবে মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে ৯৬০ কোটি টাকা।
আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করতে আমদানি শুল্ক, অগ্রিম আয়কর, টার্মিনাল চার্জ, সঞ্চালন চার্জ, বিতরণ চার্জ ও ভ্যাট পরিশোধের কারণে মোট উত্পাদন ব্যয় আরো বাড়বে। এ প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী এলএনজি চালু হলে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে গ্যাস বিক্রি বাবদ ঘাটতি দাঁড়াবে ৬৮ কোটি ডলার বা ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকায়। এজন্য চলতি অর্থবছর থেকেই সব ধরনের খাতে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য বার্ষিক গড়ে ৯ শতাংশ করে বাড়িয়ে এলএনজি আমদানিতে রাজস্ব সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এলএনজি আমদানি ও মূল্যবৃদ্ধি বিষয়ে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, টেকসই জ্বালানি মিশ্রণ নিশ্চিত করার জন্যই এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এখন মূল্য সমন্বয় করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি আমরা পর্যালোচনা করছি। বিশ্ববাজার এবং স্থানীয় চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 87 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ