অনলাইন ডেটিং প্রতারণার ফাঁদ

Print

%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%a8-%e0%a6%a1%e0%a7%87%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%82-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%abকেনিয়ার নাগরিক ইমনোয়ার আর ঢাকার গৃহবধূ রাফিয়া (ছদ্মনাম)। পরিচয়টা ফেসবুক থেকেই। ইংরেজিতে বেশ দক্ষ ইমনোয়ার। বিদেশি বলেই তার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ রাফিয়ার। সহজেই রাফিয়ার মন জয় করে সে। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। এভাবেই এগিয়ে যায় সম্পর্ক। কথা হতো ফোনে, ইন্টারনেটে। রাফিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিতো। দেশের বাইরে নিয়ে যাবে- এরকম নানা স্বপ্ন দেখাচ্ছিলো ইমনোয়ার। ইমোশনাল হয়েই নিজেকে সমর্পণ করেন রাফিয়া। ফেসবুকের মাধ্যমে তার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি, ভিডিও সংগ্রহ করে ইমনোয়ার। রাফিয়া ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি এসবই একসময় কাল হয়ে দাঁড়াবে। হয়েছেও তাই। বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা বলে কিছু ছিল না ইমনোয়ারের। মূলত একজন প্রতারক। নারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, প্রেম-ভালোবাসার অভিনয় করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়াই তার কাজ। অনলাইন ডেটিংকে তারা ব্যবহার করে প্রতারণার কৌশল হিসেবে। ভয়ঙ্কর এ ফাঁদ বিপন্ন করে দেয় অনেকের জীবন। ভাঙে সংসার। এমনকি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এই চক্রের সদস্য শুধু ইমনোয়ার না। এরকম সহস্রাধিক বিদেশিদের প্রতারণার জাল বিস্তৃত আছে বাংলাদেশে। যাদের টার্গেট ধনাঢ্য পরিবারের নারীরা।
তাদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেক নারী। এসব ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়ে অবাক হয়েছেন খোদ গোয়েন্দারাও। ইমনোয়ারের সঙ্গে রাফিয়ার সম্পর্কের শুরু গত বছরের শেষের দিকে। রাফিয়ার ফেসবুক আইডিতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছিলো। বিদেশি নাগরিক। প্রোফাইল দেখে এতোকিছু না ভেবেই গ্রহণ করেন রিকোয়েস্ট। নিজেকে বৃটিশ নাগরিক ও একজন ব্যবসায়ী হিসেবেই রাফিয়ার কাছে পরিচয় দেয় ইমনোয়ার। যখন তখন চ্যাট হতো। চ্যাট করার এক পর্যায়ে ম্যাসেঞ্জার থেকে কল করে। তারপর থেকে কথা হতো দুজনের। ব্যবসায়ী স্বামী যখন বাসার বাইরে তখনই বেশি কথা হতো। রাফিয়া তাকে বাংলাদেশে আসার প্রস্তাব করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আই ওয়ান্ট টু সী ইউ রাইট ওয়ে, প্লিজ ইউ কাম টু বাংলাদেশ’। রাফিয়াকে দেখার প্রচণ্ড আগ্রহ প্রকাশ করেছিলো ইমনোয়ার। সে বলেছিলো, ডু ইউ কাম টু ইংল্যান্ড? আই ওয়ানা ইউ। আই লাভ ইউ… এরকম নানা বাক্য। তবে রাফিয়া তাকে জানিয়েছিলেন, সবসময় বন্ধু থাকবেন। দুজনের দেখা হবে। দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াবেন। এভাবেই এগিয়ে যায় সম্পর্ক। তাকে ভীষণ আপন ভাবতে থাকেন রাফিয়া। এরপর থেকেই স্বল্প বস্ত্র পরনে নিয়েও ভিডিও কলে কথা বলতেন তিনি। কিন্তু ফোনে সমস্যা, এটা সেটা অজুহাত দিয়ে ভিডিও কলে দেখা দিতো না ইমনোয়ার। কখনও কখনও রাফিয়ার ছবি চাইতো ইমনোয়ার। অনেকটা বস্ত্রহীন ছবি। বেশকিছু ছবি সেন্টও করেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যমতে, এভাবে ইমোশন সৃষ্টি করেই ব্ল্যাকমেইলের উপকরণ সংগ্রহ করে প্রতারক চক্র।
কিন্তু তখন কিছুই বুঝতে পারেননি রাফিয়া। একদিন কথা বলার এক পর্যায়ে ইমনোয়ার জানায়, তোমাকে কিছু গিফট পাঠাচ্ছি। রাফিয়া জানতে চেয়েছিলেন, কি সেটা। ইমনোয়ার জানিয়েছিলো, এটা সারপ্রাইজ থাকুক। তবে সে যে খুব দামি কিছু গিফট করছে এটা বুঝিয়েছে বিভিন্ন ইঙ্গিতে। হঠাৎ একদিন অচেনা নাম্বার থেকে কল। জানানো হয়, ইংল্যান্ড থেকে পার্সেল এসেছে। পার্সেলের জন্য চার্জ চাওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। চার্জ দেয়ার পর জানানো হয় পার্সেলে অবৈধ পণ্য রয়েছে। মামলা হবে। এতে ফেঁসে যাবেন রাফিয়া। তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। সংবাদটি জানানো হয় ইমনোয়ারকে। সে জানায়, পার্সেলে গোল্ড ও পাউন্ড রয়েছে। এভাবে পাঠানো যে বাংলাদেশে অপরাধ তার জানা ছিল না। সে রিকোয়েস্ট করে বলে- টাকা দিয়ে তা ছাড়িয়ে নাও প্লিজ। অতঃপর আরো টাকা দিতে বাধ্য হন রাফিয়া। এভাবে ২ লাখ টাকা লুটে নিয়ে ফোন নম্বর বন্ধ। ইন্টারনেট থেকে উধাও ইমনোয়ার।
প্রায় প্রতিটি ঘটনা একই রকম। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অজিল নামে এক আমেরিকান নাগরিকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো সেতু রহমানের (ছদ্মনাম)। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের এই গৃহবধূ পুলিশকে জানিয়েছেন, ফেসবুক থেকেই বন্ধুত্বের শুরু। চ্যাট, কথার এক পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়। সেতুর পারিবারিক-আর্থিক অবস্থান জেনে নেয় অজিল নামে ওই ব্যক্তি। বন্ধুত্বের কারণেই অজিলকে বিশ্বাস করেছিলেন। হঠাৎ অজিল তাকে গিফট পাঠিয়েছে বলে জানায়। তারপরই একটা কল। বিমানবন্দর কাস্টমস অফিস থেকে বলছি- বলে জানায়, সেতুর নামে পার্সেল এসেছে। এ জন্য তাকে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে। জনৈক ব্যারিস্টারের স্ত্রী সেতু তাৎক্ষণিকভাবে ওই পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে তাকে জানানো হয় তিনি সমস্যায় পড়ে যাচ্ছেন। তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। ফোনে হুমকি দিয়ে বলা হয়, এসব কি এসেছে আপনার নামে। নগদ পাউন্ড এবং গোল্ড। এগুলোতো এভাবে আনা অবৈধ। ভয় পেয়ে যান সেতু। তার স্বামী ও স্বজনরা জানলে মান-সম্মান যাবে। বাধ্য হয়েই দফায় দফায় পাঁচটি একাউন্টে সর্বমোট ১৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। তারপর তার গিফটের জন্য ছুটে যান। ভাবছিলেন, যে পরিমাণ টাকা দিয়েছেন গিফট নিশ্চয়ই তার চেয়ে দামি। কিন্তু আশাহত হন তিনি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। টাকা দেয়ার পর সেই নম্বরটি বন্ধ। সন্ধান নেই তার কথিত বন্ধু অজিলের। এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরই অভিযানে নামে বনানী থানা পুলিশ। খুঁজে বের করা হয় অজিল নামধারী কেনিয়ার নাগরিক আফোলায়ানকে। বনানীর হোটেল সেরিনার সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ছদ্মনামধারী এই প্রতারককে। গ্রেপ্তারের পর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিও দিয়েছে সে। এ ঘটনায় ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারমধ্যে ১৪ জন নাইজেরিয়ান বলে জানান কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমের সাইবার ক্রাইম টিমের পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম।
এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, অপরাধী চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের ইংল্যান্ড, আমেরিকার ধনী যুবক পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে। গিফট প্রেরণ ও নারীদের সংবেদনশীল অঙ্গের ছবি ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে। তারা বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা গ্রহণ করছে বলেও অভিযোগ করা হয়। সামাজিক কারণে প্রতারণার শিকার হলেও ওই ব্যারিস্টারের স্ত্রী মামলার বাদী হননি। বনানী থানার তৎকালীন এসআই রফিকুল ইসলাম খান বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। এ বিষয়ে বর্তমানে গুলশান থানায় কর্তব্যরত রফিকুল ইসলাম বলেন, নানাভাবে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলেও সামাজিক কারণে মুখ খুলতে চান না ভুক্তভোগীরা। প্রেম, বন্ধুত্ব, গিফট ও ছবি আদান-প্রদানের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করা হয় বলে জানান তিনি।
এভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন, খুলনা সদরের দারোগাপাড়ার ইস্ট লিঙ্ক রোডের বাসিন্দা আতিয়া সুলতানা (ছদ্মনাম)। তার কাছ থেকে লুটে নেয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণ টাকা। প্রতারকের ছদ্মনাম স্কট মারি। তার সঙ্গে আতিয়ার পরিচয় ফেসবুকে। স্কট মারি বৃটিশ একজন ব্যবসায়ী বলেই জানতেন তিনি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকায় বসেই লন্ডনে অবস্থানের কথা বলে ভাইবার, ট্যাঙ্গো, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কথাও বলতো স্কট মারি। তবে আতিয়ার চাইলেও ভিডিও কলে আসতো না সে। পরে একপর্যায়ে একই কৌশলে তার কাছ থেকেও নেয়া হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। পরে তার অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই বাংলাদেশিসহ ১৩ নাইজেরিয়ানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। স্কট মারি নামে যাকে তিনি ফেসবুক ফ্রেন্ড হিসেবে জানতেন গ্রেপ্তারের পর জানা যায় সে নাইজেরিয়ার নাগরিক এডউইন ইডোসি।
এসব বিষয়ে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমের সাইবার টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রেম-ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের অভিনয় করে প্রতারকদের একটি শ্রেণি নারীদের কাছ থেকে অর্থ লুটে নিচ্ছে। অবৈধভাবে আমাদের দেশে থাকা বিদেশিরা এসব অপকর্মে জড়িত। সহস্রাধিক নাইজেরিয়ান নাগরিক রয়েছে। যাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের টার্গেটের শিকার দেশের বিত্তশালী নারীরা। এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা চালানোর পর তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানান তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 91 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ