অবিশ্বাস্য অনিয়ম

Print

%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%aeঅনিয়মের অবিশ্বাস্য এক নজির স্থাপন করেছে বিটিসিএল। মাত্র চার কার্যদিবসে একটি আন্তর্জাতিক কেনাকাটার যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করে কার্যাদেশ দিয়েছে তারা। ঢাকা-কুয়াকাটা ট্রান্সমিশন লিঙ্ক স্থাপনে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানির (বিটিসিএল) করিৎকর্মা পরিচালনা পর্ষদ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন দ্রুততায় কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি অনিয়মের একটি রেকর্ড হিসেবে গণ্য হতে দেখা গেছে। পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘনসহ পদে পদে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কারিগরি ইউনিট, সিপিটিইউর মহাপরিচালক ফারুক হোসাইন গত সোমবার সমকালকে বলেন, যে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রয় কোনোভাবেই বিধি অনুযায়ী তিন কিংবা চার কার্যদিবসে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কারণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য কমপক্ষে ১৪ দিন সময় দিতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে অবশ্যই তা অনিয়ম।
ঘটনার শুরু ৯ নভেম্বর। শেষ ১৪ নভেম্বর। এর মধ্যে দু’দিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। এর মধ্যেই ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রস্তাব আহ্বান, কমিটি গঠন, প্রস্তাব জমা ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষে কার্যাদেশ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রস্তাব আহ্বানের পরদিনই বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবও পেয়ে যায় বিটিসিএল। তারও মূল্যায়নও হয়ে যায় দিনে দিনেই। পুরো ঘটনায় বিটিসিএলের সঙ্গে রয়েছে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)। দুটি প্রতিষ্ঠানেরই পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরী।
গত ৯ নভেম্বর বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় দ্রুততম সময়ে ঢাকা-কুয়াকাটা ট্রান্সমিশন লিংক
স্থাপনের জন্য সরকারি ক্রয় বিধিমালার ৭৬(ছ) অনুযায়ী টেশিস থেকে ডিডবি্লউডিএম যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত হয়। একই তারিখে দরপত্র বিনির্দেশ করে টেশিস থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়।
পরদিন ১০ নভেম্বর টেশিস থেকে কারিগরি ও অর্থনৈতিক প্রস্তাব সংবলিত একটি ফাইল বিটিসিএলে দেওয়া হয়। ওইদিনই টেশিসের সঙ্গে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চুক্তি করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। টেশিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবীর হাসান জানান, টেশিস ডিডবি্লউডিএমের মতো যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে না। এ জন্য তারা এটি ভারতীয় কোম্পানি তেজাশের কাছ থেকে সেগুলো কিনছেন। অর্থাৎ বিটিসিএল টেশিসের কাছ থেকে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব চাওয়ার পর টেশিস তেজাশের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, টেশিস তাদের প্রস্তাবে তেজাশের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কেনার কথা জানিয়ে ওই কোম্পানির অভিজ্ঞতার সনদসহ কারিগরি ও আর্থিক বিষয়াদির বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। এর অর্থ, ৯ থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে তেজাশ থেকে অভিজ্ঞতার সনদসহ কারিগরি ও আর্থিক বিবরণী টেশিসের হাতে এসেছে। টেশিস সেটা দিনে দিনেই ‘পরীক্ষা’ করেছে এবং ক্রয় প্রস্তাব প্রস্তুত করে বিটিসিএলে জমাও দিয়েছে।
পরের দু’দিন ১১ ও ১২ তারিখ ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। টেশিসের ক্রয় প্রস্তাব পরীক্ষার জন্য ১০ নভেম্বর গঠিত কমিটি ১৩ তারিখ প্রস্তাবটি ‘পরীক্ষা’ করে চূড়ান্ত ক্রয় প্রস্তাব তৈরি করে ফেলে। এরপর ১৪ নভেম্বর বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদ জরুরি বৈঠক ডেকে ওই ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক কেনাকাটার শুরু থেকে যাবতীয় কাজ শেষ করতে তাদের সময় লেগেছে মাত্র চার কার্যদিবস!
পদে পদে অনিয়ম :ওই ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনে বিটিসিএল দরপত্র আহ্বান করে গত এপ্রিলে। প্রায় ছয় মাসের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে ডিডবি্লউডিএম যন্ত্র তৈরিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি সিয়েনার কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত দিয়ে দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কারিগরি কমিটি প্রতিবেদন দেয় এবং সিয়েনার যন্ত্রপাতি সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান নেতাশকে মনোনীত করে। সিয়েনা ২৬ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছিল। গত ১৫ অক্টোবর বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদ এক সভায় দরপত্রটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এ প্রসঙ্গে বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান চৌধুরী বলেন, পরিচালনা পর্ষদ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেসব বিষয় ও শর্ত দিয়ে কারিগরি মূল্যায়ন করে একটি কোম্পানিকে মনোনীত করা হয় সেগুলো সঠিক ছিল না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ দরপত্র বাতিলের পর টেশিসের মাধ্যমে ভারতীয় কোম্পানি তেজাশের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়টিও পর্ষদের ওই সভায় আলোচিত হয়। এর ১২ দিন পর গত ২৭ অক্টোবর বিটিসিএল, টেশিস ও সাবমেরিন কেবল কোম্পানির তিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তেজাশের টাকায় তাদের কোম্পানি দেখতে ভারত যান।
এ ব্যাপারে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত কারিগরি ইউনিটের (সিপিটিইউ) এক মূল্যায়নে বলা হয়, ‘সরকারি ক্রয়ে তফসিল-১৩-এর নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ক্রয় প্রক্রিয়া চলাকালে সংশ্লিষ্ট কোনো কোম্পানির আতিথেয়তা গ্রহণ করা যাবে না। এ ধরনের কোনো অসদাচরণ কেউ করলে তা ২০০৬ সালের সরকারি ক্রয় আইনের ৬৪ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
সিপিটিইউর মূল্যায়নে আরও বলা হয়, ‘২০০৮ সালের সরকারি ক্রয়বিধির ৭৬(ছ) ধারা ব্যবহার করে জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি কোম্পানির কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে অবশ্যই যন্ত্রপাতি ওই কোম্পানি কর্তৃক উৎপাদিত হতে হবে। তৃতীয় কোনো পক্ষ বা কোম্পানির কাছ থেকে যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা যাবে না।’ এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী টেশিসের কাছ থেকে বিটিসিএলের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিই বিধিবহির্ভূত বিবেচিত হয়। সিপিটিইউর ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, সরকারি কোনো বৈধ দরপত্র বাতিলের ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী গুরুতর অপরাধের বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে এবং বিধিতে উলি্লখিত গুরুতর অনিয়মের উল্লেখ ছাড়া কোনো দরপত্র বাতিল করা যাবে না।
অনুসন্ধানে আরও কিছু অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। যেমন_ চলতি বছরের ৫ অক্টোবর বিটিসিএলের কারিগরি কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তেজাশ বিটিসিএলের চাহিদায় উলি্লখিত ১০০ জিবিপিএস সক্ষমতার যন্ত্রপাতি তৈরি করে না। পরবর্তী সময়ে টেশিস বিটিসিএলে একটি পত্র দিয়ে জানায়, তেজাশ বিশ্বখ্যাত সিয়েনা কোম্পানির জন্য ১০০ জিবিপিএস যন্ত্রপাতি তৈরি করে। এতে সিয়েনা চিঠি দিয়ে জানায়, তারা নিজেদের কারখানা ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির কারখানায় যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে না। সর্বশেষ দেখা যায়, টেশিসকে দেওয়া কারিগরি বিবরণীতে তেজাশ বলেছে, ২০১৩ সালে কম্বোডিয়ার একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য তারা ১০০ জিবিপিএস যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছে। বিবরণীর সঙ্গে তেজাশ কম্বোডিয়ার টেলকোটেক গ্রুপের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইজিকমের দেওয়া ২০১৩ সালের সনদও যুক্ত করে। তবে এটি ইস্যুর তারিখ রয়েছে চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি অ্যালকাটেল লুসেন্ট ২০১৫ সালে কম্বোডিয়ায় ১০০ জিবিপিএস সক্ষমতার যন্ত্রপাতি স্থাপন করে। এতে আরও বলা হয়, এটিই কম্বোডিয়ায় ব্যবহৃত প্রথম ১০০ জিবিপিএস যন্ত্রপাতি।
এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে টেশিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবীর হাসান জানান, তেজাশের কাগজপত্র ভালোভাবে যাচাই করা হয়েছে। তার পরও যদি তাদের কাগজপত্রে কোনো গোলমাল ধরা পড়ে তাহলে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিসিএল ও টেশিসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান চৌধুরী সমকালকে বলেন, তিনি তেজাশ নামের কোম্পানিকে চেনেন না। যন্ত্রপাতি কেনার কাজ দেওয়া হয়েছে টেশিসকে। দ্রুততম সময়ে টেশিসের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন সম্পর্কে তিনি বলেন, বিধি ও আইন মেনেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের নথিতে দেখা যায়, চলতি বছরের ১৮ আগস্ট টেশিস পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দলের ভারতের তেজাশ ও চীনের দুটি কোম্পানি সফরের আদেশ জারি হয়। ওই আদেশ অনুযায়ী সচিব গত ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট ভারতের তেজাশ কোম্পানি পরিদর্শনে যান। আদেশের শর্ত অনুযায়ী ভারত সফরের খরচ বহন করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি তেজাশ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 49 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ