আমরা পানি খাই বাংলাদেশের আর ঘুমাই ইন্ডিয়ায়

Print

%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0

চর পানিতর গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব গৃহবধূ মাসুরা বিবি এক গাল হাসি দিয়ে বললেন, “আমরা পানি খাই বাংলাদেশের, আর ঘুমাই ইন্ডিয়ায়। আমাগের বাড়িতে কল (টিউবওয়েল) থাকলিও তার পানি ভালো না, তাই খাওয়ার পানি আনতি আমাগের বাংলাদেশেই যাতি হয়। আমরা ইন্ডিয়ার লোক হলুও বিজিবি আমাগের পানি আনতে বাধা দেয় না। বাংলাদেশে পানি আনতি যাতি আমাগের পাঁচ মিনিটও সময় লাগে না।”
সাতক্ষীরা জেলার ভোমরা সীমান্ত থেকে উত্তর-পশ্চিমে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে দুটি গ্রাম। একটির নাম হাড়দ্দা আর অন্য গ্রামের নাম চর পানিতর। বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের মতই সবুজ-শ্যামল দেখতে গ্রাম দুটি। মানুষের কথা-বার্তা আচার-আচরণও প্রায় একই রকমের। কিন্তু গ্রাম দুটির পরিচয়ের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। হাড়দ্দা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা ইউনিয়নের একটি গ্রাম। আর চর পানিতর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বসিরহাট থানার একটি গ্রামের নাম। একটি গ্রামের কোনো বাসিন্দার রান্নাঘর বাংলাদেশে পড়েছে তো, শোয়ার ঘর পড়েছে ভারতে। বাড়িঘরগুলোর মধ্যে কোনো সীমান্ত রেখা নেই। তবে স্থানীয়রা জানেন কোন অংশ বাংলাদেশ আর কোন অংশটুকু ভারতের। চর পানিতর গ্রামের বাসিন্দারা ভারতের ইটইন্ডিয়া নামক বাজার থেকে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় বাজার করলেও খাবার পানি খান বাংলাদেশের টিউবওয়েলের। আবার হাড়দ্দা গ্রামের বাসিন্দারা প্রায় নির্বিঘ্নেই যাচ্ছেন চর পানিতর গ্রামে। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর থেকে এ গ্রাম দুটির মানুষ অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। এ গ্রাম দুটির পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। এ নদীর মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত রেখার ১ নম্বর পিলার। এই সীমান্ত পিলারটিই বুঝিয়ে দিচ্ছে হাড়দ্দা গ্রামের মানুষ বাংলাদেশের আর চর পানিতর গ্রামের বাসিন্দারা ভারতের নাগরিক।
গত সোমবার বাংলাদেশ ও ভারতের একদল সাংবাদিক সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দর সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) দু’দেশের সাংবাদিকদের জন্য এই আয়োজন করে। দুপুরে সাংবাদিকরা বাংলাদেশের সীমানার একেবারে গা ঘেঁষে থাকা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বসিরহাট থানার চর পানিতর গ্রামে কোনো বাধা ছাড়াই ঢুকে পড়েন। দু’দেশের সাংবাদিকদের পেয়ে গ্রামবাসীও খুব খুশি। গ্রামটিতে গিয়ে বোঝার উপায় নেই এটি বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের একটি গ্রাম। তবে অধিকাংশ বাড়ির বেড়ায় সাঁটানো রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পোস্টার। এই পোস্টারের জন্যই বোঝা যায় গ্রামটি বাংলাদেশের নয়, ভারতের। গ্রামের বাসিন্দা জিয়াদ আলী (৪০) বলেন, তাদের গ্রামে মাত্র ৪০/৫০টি পরিবারের বসবাস। সবাই মুসলমান। অধিকাংশ মানুষই গরিব। কৃষিকাজ করে তাদের সংসার চলে। তিনি বলেন, চর পানিতক গ্রামের বাসিন্দারা কয়েক কিলোমিটার দূরে ভারতের ইটইন্ডিয়া বাজার থেকে খাবার-দাবারসহ নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে যান। ভারতীয় নাগরিক হওয়ায় তাদের গ্রামের কাছে বাংলাদেশের ভোমরায় বাজার থাকলেও সেখানে তারা যেতে পারেন না।
চর পানিতর গ্রামের কিশোরী বধূ মমতাজ (১৮) একটি ছোট্ট পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমরা এই পুকুরে গোসল করি। এই পুকুরটির অর্ধেক ভারতে আর অর্ধেক বাংলাদেশে পড়েছে। আমরা ডুব সাঁতার করতে করতে একবার বাংলাদেশে যাই, আর একবার ভারতে আসি।”- বলেই মেয়েটি হেসে ওঠে। চর পানিতর গ্রামের আরেক বাসিন্দা লুত্ফর রহমান গাজী (৩৬) বলেন, “সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় আমরা অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ভারতের মূল ভূখণ্ডে যেতে আমাদের আইডি কার্ড দেখাতে হয়। আর অন্য দেশের নাগরিক হওয়ায় বাংলাদেশের হাট-বাজার কাছে হলেও সেখানে আমরা যেতে পারি না। এই কষ্ট আপনারা বুঝবেন না।”

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 146 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ