আমাদের কি ভোটের অধিকার প্রয়োজন আছে

Print

%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%ad%e0%a7%8b%e0%a6%9f%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a7%8dপ্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রাকিবউদ্দিন আহমেদের গুরুদায়িত্ব পালনের অধ্যায় শেষ হয়ে আসছে। এই প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে ‘অসামান্য’ দক্ষতা দেখিয়েছেন সে জন্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি তার নেতৃস্থানীয় দায়িত্ব পালন কালে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার যে সর্বনাশ করেছেন এবং দীর্ঘ নয় বছর ধরে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে রেনেসাঁর উদ্ভব ঘটে তাকে উল্টোরথে নিয়ে ছেড়েছেন। ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ নির্বাচনী উৎসবের আমেজে এধরনের শ্লোগানকে কবর দিয়েছেন এই প্রধান নির্বাচনী কমিশনার।
অবশ্যই নির্বাচনী ব্যবস্থার এ হালের জন্যে তিনি একা দায়ী নন। তাকে এককভাবে দায়ী করা উচিতও নয়। তার আশেপাশে ও আড়ালে আরো অনেক খেলোয়াড় ছিলেন ও রয়েছেন। তারা কখনো কখনো সরব হয়ে উঠেছেন কখনো কখনো নিরবে নিভৃতে যা করার তা করেছেন। জনগণের ভোটের অধিকার নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে ছুরে, দুমড়ে মুচড়ে ফেলে এমন এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি তারা করেছেন এখন আর তাদের প্রতি ভোটারদের কোনো আস্থা নেই। এখন পর্যন্ত এর বিপরীতে ভোটারদের ভোটের অধিকার বা নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্যে বিন্দুমাত্র কার্যকর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সংবিধান ও রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ, সার্চ কমিটির কথা বলা হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রুপরেখা ঘোষণার পর তার দল বিএনপি রাষ্ট্রপতির সাক্ষাতের জন্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু স্বাধীন ও উপযুক্ত নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্যে কোনো আন্তরিক উদ্যোগ দৃশ্যপটে দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে তা আরো জটিল আকার ধারণ করার আশঙ্কা টের পাচ্ছেন অনেকেই। রাজনৈতিক কুটিলতায় ভোটারদের মতামতকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দল এখনো নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে কোনো প্রস্তাবনা দেয়ার তাগিদ অনুভব করছে না।
সাংবাদিক সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া তার রুপরেখা উপস্থাপন শেষ করতে না করতেই এর প্রতিক্রিয়ায় তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। পর্যালোচনার সময়টুকু পায়নি কোনো রাজনৈতিক দল। এসব রাজনৈতিক দল মহান সংসদকে কার্যকর করার জন্যে জনগণের পক্ষে দায়িত্ব পালনে ব্রত রয়েছে। অবহেলায় খালেদার প্রস্তাব নিয়ে কেউ আলোচনার ফুরসত পাচ্ছেন না। এই বিতর্কে সুশীল সমাজের কণ্ঠ এতটাই নম্র ও নীচু স্বরে শোনা গেছে যা আদৌ রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো ধ্বনি প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করতে পারেনি। বিষয়টি এমন যে সুশীল সমাজ কথা বলেছে, পাছে কেউ রুষ্ট হয় তা বিবেচনায় রেখেই।
বরং দেখা যাচ্ছে ভোটারদের ভোটের অধিকারের বিপরীতে কণ্ঠস্বর অনেক উঁচু। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দল হিসেবে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। উভয় দল নিজেদের মধ্যে এমন বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে যা আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে দুর্ভেদ্য হয়ে আছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার জন্যে উপযুক্ত করার চেয়ে দুটি দলের রাজনৈতিক ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হওয়ার বাসনাই প্রবল হয়ে উঠেছে। তাহলে কি বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই চায় না নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হয়ে উঠুক। তাহলে কি দেশের কোথাও কোনো ভোটার বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তষ্ট নয় ? ৫ই জানুয়ারির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কি তারা সুষ্ঠুভাবে নিজেদের ভোট প্রয়োগের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পেরেছে ?
৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর উপজেলা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে যা হয়েছে তাতে এর সুবিধাভোগীরা শুধু হেসেছেন। বাহবা কুড়িয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাকিবউদ্দিন আহমেদ এই বলে যে তার অধীনে এসব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, নিরপেক্ষ হয়েছে, যদিও সকলেই দেখেছে সন্ত্রাস ও নির্বাচনী কারচুপিতে অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশের ভোটার বা জনগণ এই ভোটের অধিকার আদায়ের জন্যে ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়েছে, ১৯৭১ এ বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে। তারা ভোটের অধিকার নিশ্চিত করে উৎসবমুখর আমেজে নির্বাচনী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে সর্বস্ব ত্যাগ স্বীকার করতেও কুণ্ঠিত হয়নি।
রাকিবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের ভোটারদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থেকে একদলীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথপরিক্রমা তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যদি নির্বাচন কমিশনাররা বলেন যে নির্বাচনে ভোট কারচুটি ও সন্ত্রাসের জন্যে তারা দায়ী নন তাহলে তাদের এও বলা উচিত যে তারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এটা খুবই প্রাসঙ্গিক, শক্তিশালী একটি কমিশন গঠন ও পরিচালনা করতে যে উচ্চমানের সততার প্রয়োজন হয় তা নির্বাচন কমিশনারদের ছিল না। তারা এজন্যেই কমিশনকে শক্তিশালী করতে পারেনি অথবা পিছপা হয়েছেন। আইন সংশোধনে আগাননি। রাজনৈতিক সরকারের নির্বাহী কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছেন। সবাইকে তোষামোদ করে চলেছেন।
আপনি যদি পদ্ধতির ত্রুটি ধরেন তাহলে বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আসা আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল। আপনি যদি ভোটারের ভোট দেয়ার অধিকার পুনরুদ্ধার করতে চাইতেন তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার সুযোগ দেয়া উচিত ছিল। নির্বাচন কমিশন তা করেনি। সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এবং তা করতে যেয়ে দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে নিজেরাই ছিটকে পড়তে যাচ্ছেন।
বিএনপি না হয় তাও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাবনা দিয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে আলোচনায় সুশীল সমাজ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আলোচনা অব্যাহত রাখছেন না কেন? কারণ কোনো বিকল্প পথের সন্ধান না দিয়ে শুধু যারা সমালোচনা করেন আদতে তাদের ভূমিকা ক্ষমতার রাজনীতির পক্ষেই যায়। আর ক্ষমতার রাজনীতি জবাবদিহীতা, স্বচ্ছতার ধারে কাছে না যেয়ে জনগণের বৈচিত্রময় অধিকারকে কেবলমাত্র অস্বীকার করে। এরফলে ভোটারদের ইচ্ছা প্রকাশের কোনো সুযোগ থাকে না।
অনেক সময় শক্তিশালী উপাদান দেখতে পেয়ে কোনো পক্ষ মনে করে তারা কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারের পক্ষে দাঁড়াতে পারলে বরং নিজেরা নিরাপদ থাকবেন। তারা জনআকাঙ্খার ধার ধারেন না। কিন্তু তারা যখন গত হয়ে যান তখন ইতিহাসের দূরবর্তী স্থানে তাদের কোনো স্থানই থাকে না। তাদের অনুসারীরাও বলেন, যদি উন্নয়নের লক্ষ্যই হয়ে থাকে নির্বাচন তাহলে স্থিতিশীল পরিবেশ আগে জরুরি। এক ভয়ানক তামাশা তাদের পেয়ে বসে। তারা ভাবেন কেন জনগণকে কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে?
এই ধরনের বোধের মধ্যে দিয়ে তারা আসলে গণতন্ত্র বর্জিত অক্ষাংশের বাসিন্দায় রুপান্তরিত হন। তারা বড় ধরনের সাফল্য খুঁজে পান উন্নয়নের ভেতরে কোনো ধরনের প্রশ্ন না তোলার মধ্যে, দুর্নীতির ও সকল ধরনের অনিয়মের মধ্যে তিনি লাভবান হতে পছন্দ করেন, পদ ও ব্যাংক ব্যালান্স, ফ্লাট ও বিদেশে বাড়ি যা কিছুই হোক না কেন তা কাঙ্খিত হিসেবেই মেনে নেন।
গণতন্ত্র ছাড়া এধরনের উন্নয়ন সাধারণ মানুষের নাগাল কখনোই পায় না। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার পাটাতন ছাড়া ও ভোটের অধিকার ব্যতিত জনগণের সদিচ্ছার যাচাই কখনো সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদি জবাবদিহীতার বালাই না থাকে তাহলে কে জনকল্যাণের বিষয়কে পাত্তা দেয়। তারা তাদের সর্বোৎকৃষ্ট দক্ষতা ও পরিশ্রম জাতিকে দেয়ার জন্যে কেন ভোটারদের সমর্থন নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না?
২০১৪ সালের নির্বাচন কি দেশে বিনিয়োগ স্থবিরতা দূর করতে সহায়ক হতে পেরেছে? কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে? জনগণের মধ্যে প্রবল আস্থা ফিরে এসেছে? কোথাও কি আশাবাদ জাগ্রত হয়েছে, সুস্থির পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে তরুণদের মধ্যে যাতে করে তারা আগামী দিনের নেতৃত্বের স্বপ্ন নিজেদের মধ্যে দেখতে পারছেন? যারা ভোটারদের ভোটের অধিকার আদায়ে বাধা সৃষ্টি করতে অবদান রাখছেন, ব্যালটের ভাষা প্রয়োগে বাধা দিচ্ছেন, রাস্তায় অধিকার আদায়ের জন্যে দাঁড়াতেও দিচ্ছেন না তারা আসলে জাতির ক্ষতি করছেন।
নির্বাচন কমিশনকে কেউ যদি অপরাধী বা সহযোগী ভেবে বসেন কারচুপির নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টির জন্যে যা আদতে পুরো শাসনব্যবস্থাকেই ক্ষতি করে এবং রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে তাহলে কি খুব দোষ হবে? শুধু মাত্র নিরপেক্ষ নির্বাচনের সর্বোত্তম পদ্ধতি এধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সহায়ক। তাই জাতি রাকিবউদ্দিনের নেতৃত্বে এধরনের নির্বাচন কমিশন আর দেখতে চায় না।
ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি শুধু বেগম জিয়ার একার দায়িত্ব হতে পারে না। কারো এমন অভিপ্রায় যদি থাকে যে যিনি ভোটারকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখতে চান তাহলে তা বোধগম্য।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 84 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ