এখানে এমবিবিএস সার্টিফিকেট দেয়া হয় !

Print
সকাল বেলা একটা এমবিবিএস সার্টিফিকেট দেখে চোখ আটকে গেলো। চোখ আটকে যাওয়ার কারণ হলো – ‘সার্টিফিকেট ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান’ এর নাম দেখে । সেই প্রতিষ্ঠানের নাম- বাংলাদেশের কম্বাইন্ড মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (BCMDC).. চোখ চড়ক গাছ অবস্থা! ভালো করে পড়ে দেখলাম– তারা দিব্যি এমবিবিএস ডিগ্রী দিয়ে দিচ্ছে জনগণকে টাকার মাধ্যমেই। ‘উত্তরার পিচ ব্লেন্ড ইউনিভার্সিটি’ নামের এক ইউনিভার্সিটির নামে, তারা এই সার্টিফিকেট দিচ্ছে ।

আমরা জানি– বাংলাদেশের মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল নামে একটা কাউন্সিল আছে, যেখানে থেকে আমাদের দেশ থেকে পাস করা ও বিদেশ থেকে পাস করা (পরীক্ষা ও ট্রেইনিং সাপেক্ষে) সমস্ত এমবিবিএস ও বিডিএস পাস করা চিকিৎসকদের সার্টিফিকেট ইস্যু করে থাকে। তারা দেশের প্রত্যেক চিকিৎসকের প্রাক্টিসিং এর জন্য রেজিস্ট্রেশন দিয়ে থাকে । সেটা নির্দিষ্ট মেয়াদে হয়ে থাকে । মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর, সেটা রিনিউ করা বাধ্যতামূলক। নয়তো সেই চিকিৎসকের সেবা অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

এছাড়াও বাংলাদেশের মেডিকেল সাইন্সের ‘Supreme authority’ হিসেবে কাজ করে এই বিএমডিসি। মেডিকেল সংক্রান্ত সকল আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সমস্ত দায়িত্ব ওই কাউন্সিলের হাতে। এছাড়াও মেডিকেলের কোর্স প্রণয়ন ও কোয়ালিটি মনিটরিংও বিএমডিসির কাজ।

বিএমডিসির হেড অফিস ২০৩, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে অবস্থিত। বিএমডিসি ব্যতীত অন্য কারো এমবিবিএস বা সমমানের সার্টিফিকেট দেয়ার অধিকার নেই। বিএমডিসির ওয়েবসাইট হলো –www.bmdc.org.bd
এবার আসুন কম্বাইন্ড বিএমডিসির দিকে তাকাই, তারা কি কি ভাবে, আসল বিএমডিসিকে নকল করার চেষ্টা করেছে।

১। সার্টিফিকেটের চেহারা : দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তাদের সার্টিফিকেট ভুয়া এমবিবিএস সার্টিফিকেট । সিলমোহর, লেখা, স্টাইল সবকিছুই হুবহু কপি পেস্ট ।

২। ওয়েবসাইট: কম্বাইন্ড বিএমডিসি আসল বিএমডিসি’র অনুকরণে একটা ওয়েবসাইটও বানিয়েছে।www.bcmdc.org. যদিও ওয়েবসাইটে তেমন কোনো কন্টেন্ট নেই… । ডাক্তারদের লিস্ট দেখে সার্চ দিলাম। মনে হয়– সব মিলিয়ে দুই এক জনের নাম আছে। বাকি সব ফাঁকা । এডমিনিস্ট্রেশন লিস্ট দেখে ঢুকলাম। তাদের এতো বড় কাউন্সিল , অথচ একজন ডাক্তারের নাম পাওয়া গেলো, সিন্ডিকেটের বাকি মেম্বাররা নন মেডিকেল । অবাক হই এই ভেবে, নন মেডিকেল পার্সন কেমনে মেডিকেল এমবিবিএস সার্টিফিকেট দেয় ।

৩। সারা জীবন দেখলাম সব মেডিকেল ছাত্রছাত্রী পড়ায়, আর বিএমডিসি থেকে এসে সার্টিফিকেট নিতে হয়। কিন্তু এখানে দেখি,BCMDC নিজেই পড়ানো আর সার্টিফিকেট দেয়ার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। সার্টিফিকেট দিতে যারা বিজ্ঞাপন দেয়, তাদের কোয়ালিটি নিয়ে আর কি বলব।

৪। তাদের ওয়েবসাইটে কম্বাইন্ড বিএমডিসির ঠিকানা দেয়া, ১৩, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, গুলিস্তান-১০০০ । আবার পত্রিকার বিজ্ঞাপনে ওয়েবসাইট দেয়া সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, ঢাকা, আর সেক্টর-৪, উত্তরা, ঢাকা। ফোন-০১৭২৯৮৪৪৪৪৩, ০২-৭৯১৩২৯৭ । কোনটা আসল, জাতি জানতে চায় ।

আমাদের দেশের সাংবাদিকরা আসল এমবিবিএস দের পিছনে লেগে থাকে ভুল ধরার জন্য। কিন্তু কিছু কুচক্রী ভুয়া এমবিবিএস তৈরি করছে তা দেখে না। এসব এমবিবিএস যখন কোনো জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া ভুল করে রোগী মারবে, সাংবাদিকরা আসল এমবিবিএসদের দোষ দিয়ে নিউজপেপারে ছাপাবে আর রসিয়ে লিখবে ডাক্তারদের কুকীর্তি।

ওয়েবসাইটে যেই একজন ডাক্তারের নাম দেয়া আছে , তার নাম – প্রফেসর নুরুল হক । জানি না, তিনি কোন বিষয়ের অধ্যাপক। ওয়েবসাইট ঘাটাঘাটি করে প্রফেসর নুরুল হকের নাম্বার যোগাড় করে ফোন দিয়েছিলাম।। জানতে চাইলাম- কম্বাইন্ড বিএমডিসি কি সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নাকি, বা আপনাদের দেয়া এমবিবিএস ডিগ্রী ভ্যালিড কি না, সাথে সাথে ফোন কেটে দিলো । মজা পেলাম এই ভেবে- সে মনে হয়, আমাকে সাংবাদিক ভাবছে ।

‘ত্রিশ দিনে ডাক্তার হোন’ এমন বই দেখে যখন অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখি দিব্যি এমবিবিএস সার্টিফিকেট পাওয়া যাচ্ছে টাকার বিনিময়ে।। ‘বিকল্প পদ্ধতি’ বা Alternative System (AS) থাকতে, এত পড়ালেখার কি দরকার। এখানে ভর্তি হলেই পারতাম… । এগুলো দেখার কি কেউ নাই।

লেখক: ডাঃ সৈয়দ সুজন, বিএসএমএমইউ

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 98 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ