ওষুধের দামের লাগাম ধরবে কে?

Print

 

 

‘শরীরে ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি পূরণ করে’—১৩ ভিটামিন ও ১৯টি মিনারেলসমৃদ্ধ এমন একটি জেনেরিকের ওষুধ বাজারে আছে। দেশের ৪৫টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানই ওই ওষুধ বাজারজাত করছে।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পুরো জেনেরিক উল্লেখ না করেও কেবল মাল্টিভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ ট্যাবলেট বলে উল্লেখ করছে। দু-একটি ছাড়া বাকি বেশির ভাগ কম্পানির নিজস্ব ব্র্যান্ড নামের সঙ্গে যুক্ত করেছে ‘গোল্ড’ শব্দটি।

বেশির ভাগ কম্পানি ওই আইটেমটির ১৫ ও ৩০টি করে ট্যাবলেটসমৃদ্ধ কৌটা বাজারজাত করেছে। কম্পানি ভিন্ন হলেও এ ওষুধের দাম প্রায় কাছাকাছি।  ১৫টি ট্যাবলেটের প্রতি কৌটার খুচরা বিক্রয় মূল্য ৯০ টাকা আর ৩০টির বোতলের খুচরা বিক্রয় মূল্য ১৮০ টাকা।

তবে হঠাৎ করেই গত মাসে একটি কম্পানি তাদের ওই ওষুধের দাম দ্বিগুণ করে ফেলে। ৩০টির কৌটার খুচরা বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে ২৮৫ টাকা। এর পর থেকে একই আইটেমের অন্য কোম্পানির ওষুধগুলোর সরবরাহ কমতে শুরু করে বাজারে।

শুক্রবার দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

কারণ জানতে চাইলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হল ওষুধ মার্কেটের অপূর্ব ফার্মেসির বিক্রেতা সুজন সোজাসাপটা বলেন, ‘সব সময়ই আগে বড় কোম্পানি ওষুধের দাম বাড়ায়। তার দেখাদেখি অন্যরাও দাম বাড়িয়ে দেয়। আর দাম বাড়ানোর আগে ওই ওষুধ অনেকটাই মার্কেট আউট করে ফেলে। যেমন করে গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। আর বৃদ্ধির হার এক বা দুই টাকা নয়, কেউ প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলে আবার কেউ ৩০-৪০ শতাংশ বা তারও বেশি বাড়িয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার থাকে না।’

একটি ওষুধের বোতল হাতে নিয়ে সুজন বলেন, এই ওষুধটির এক মাস আগেও দাম ছিল ২১০ টাকা। এখন সেটি বিক্রি করতে হচ্ছে ২৮৫ টাকায়। কোম্পানি আগের ওষুধ তুলে নিয়ে এই নতুন দাম ছাপ মারাগুলো সরবরাহ করেছে।

ওই বিক্রেতা বলেন, ‘কোম্পানি যে দাম লিখে দেয় আমরা সেই দামেই ওষুধ বিক্রি করি। মাঝখান থেকে দাম বেশি চাইলেই ক্রেতারা আমাদের ওপর ক্ষেপে যায়। কথা-কাটাকাটি করতে হয়। কৈফিয়ত দিতে হয়।’

কেবল ওই মোহাম্মদপুরের ওষুধ বাজারেই নয়, গতকাল রাজধানীর ধানমণ্ডি, মিরপুর, বনানী, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, গত এক মাসের মধ্যে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের দাম বেড়েছে বেশি মাত্রায়। আর শুরুতে কোনো ওষুধের দাম বাড়ায় বড় দু-তিনটি কম্পানি। এর দেখাদেখি অন্যরা বাড়াতে শুরু করে, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ রোগীদের ওপর।

মিরপুরের ক্রেতা কামরুন নাহার বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ক্তারের পরামর্শে নিয়মিত ‘ক্যালবো-ডি’ নামের একটি ওষুধ খাই। কয়েক দিন আগেও ওই ওষুধ কিনেছি ১৫০ টাকায়। আর এই সপ্তাহে সেটি কিনতে গিয়ে দেখি দাম হয়ে গেছে ২১০ টাকা। ঠিক করেছি অত দামে ওই ওষুধ খাব না। আবার ‘লোসেকটিল’ নামের একটি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের দামও দেখলাম বেড়ে গেছে।

ওই রোগী বলেন, ওষুধের দাম যদি এমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে, এক কোম্পানির দেখাদেখি অন্যরাও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে সরকার এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে না কেন? এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা চললে তো রোগীদের সর্বনাশ!

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, হঠাৎ ইচ্ছামতো ওষুধের দাম বাড়ানোর বিষয়ে নজর আছে সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। গত ১৮ অক্টোবর জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কমিটির সর্বশেষ সভায়ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে বিষয়টির কোনো সুরাহা না করে বরং ওই সভায় এ জন্য টেকনিক্যাল কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পরবর্তী সভায় প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য।

সভার সভাপতি ও সদ্য অবসরে যাওয়া স্বাস্থ্যসচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিজেই ওই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে এর পর থেকে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কিছুটা তৎপর হয়ে ওঠে। তবে তাতেও শেষরক্ষা হচ্ছে না ক্রেতাদের। কারণ বর্তমানে দেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ জেনেরিক আইটেমের ২৭ হাজার ব্র্যান্ড ওষুধ তৈরি হলেও সরকার আইনগতভাবে কেবল দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ১১৭টি ওষুধের।।

ওই তালিকায় তেমন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের নাম নেই। আছে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসার আওতায় থাকা জ্বর, সর্দি, কাশি, পেটের পীড়া, গায়ে ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক ধরনের রোগ বা প্যারাসিটামল, এন্টাসিড, ফ্লাজিল বা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাটাগরির মাত্র ১১৭টি জেনেরিক ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের দায়।

বাকি প্রায় এক হাজার ২০০ জেনেরিক ওষুধের দাম ওষুধ কম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছামাফিক নির্ধারণ করে থাকে। ফলে একই জেনেরিকের ওষুধে একেক কোম্পানির একেক রকম মূল্য হয়ে থাকে। এমন অবস্থায় দোকানে দোকানে ক্রেতাদের প্রভাবিত করতে সব ওষুধের মূল্যের দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ওষুধের দাম বাড়লে কী পরিমাণ বাড়ল, কয়টা ওষুধের দাম বাড়ল, গত কয়েক বছরে এ দাম বাড়ার হার কেমন ছিল বা এর পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কি না, এসব দেখভাল সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান আজ পর্যন্ত করেনি। ফলে এসব তথ্য-উপাত্ত যেমন পাওয়া যায় না, তেমনি কার্যকর ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক ড. মুনীর উদ্দীন বলেন, ‘ওষুধের দাম কেবল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই নয়, সরকারেরও নাগালের বাইরে চলে গেছে। কারণ সরকার কোনোভাবেই এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ওষুধ কোম্পানিগুলো নানা কারসাজির মাধ্যমে ইচ্ছামাফিক সব ওষুধের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে। এমন বিশৃঙ্খলা রোধ করতে না পারলে আমাদের দেশে ওষুধের শিল্পের অর্জন ও অহংকার টেকসই হবে না।’

ওই বিশেষজ্ঞ যোগ করেন, ওষুধ অন্য কোনো পণ্যের সঙ্গেই তুলনাযোগ্য নয়। একটি জেনেরিকের ওষুধের নানা ব্র্যান্ডের মধ্যে গুণগত কোনো পার্থক্য থাকার কথা নয়। তাই মূল্যেও কোনো পার্থক্য হওয়ার সুযোগ নেই। আর অন্য পণ্যের মতো যদি এ ক্ষেত্রে মানের তারতম্য থেকে থাকে তবে তো সেটা রোগীর জন্য সর্বনাশের কথা। তাই ওষুধ প্রশাসন আর ওষুধ প্রস্তুতবারী কম্পানিকে একটি সুশৃঙ্খল অবস্থায় আসতে হবে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থেই।

সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই কিছু কম্পানির মধ্যে ওষুধের দাম বাড়ানোর একটি ঝোঁক উঠেছিল। পরে এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার মুখে এখন ওই ঝোঁক কমে গেছে। আমরাও আপাতত কোনো ওষুধের দাম বৃদ্ধির অনুমোদন কমিয়ে দিয়েছি।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে অ্যালোপ্যাথিকের প্রায় এক হাজার ৪০০ জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের অনুমোদন আছে। এর মধ্যে ১১৭টি এসেনশিয়াল বা প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ক্যাটাগরির ওষুধের মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্যসচিবের নেতৃত্বে নির্দিষ্ট একটি কমিটির মাধ্যমে ওই মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এর  বাইরে অন্য সব ওষুধের মূল্য ওষুধ কম্পানিগুলো নিজেরাই নির্ধারন করে কেবল আমাদের দেখিয়ে একটা অনুমোদন নিয়ে নেয়। এ ক্ষেত্রে আমরা কেবল নীতিগত অবস্থান থেকে তাদের ওই সব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুরোধ জানাতে পারি।’

ওষুধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুনীর উদ্দীন বলেন, আইনের সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে। আগে ১৯৮২ সালে এক আদেশে সব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছিল সরকারের ওপর। কিন্তু পরে ১৯৯৪ সালে ওই আদেশ বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে আবার ১১৭টি ওষুধের দাম সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করে দেওয়ার বিধান চালু করা হয়েছে। কিন্তু উচিত আগের মতো সব ওষুধের দামই সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এদিকে আগের মতোই গতকালও বিভিন্ন এলাকায় ফার্মেসিতে ঠিকই ঝুলতে দেখা যায় ‘সরকার নির্ধারিত’ মূল্যে ওষুধ বিক্রির বিশেষ প্ল্যাকার্ড। এ ক্ষেত্রে ওষুধের মূল্যের ক্ষেত্রে আরেক কারসাজির কথা জানা যায় ওষুধ মার্কেটিংয়ে জড়িত একাধিক সূত্র থেকে।

ওই সূত্র জানায়, এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) ও আইপির (নির্দেশিত মূল্য) ক্ষেত্রে। নিয়ম অনুসারে কেবল সরকারের নির্ধারিত মূল্যের ওষুধগুলোর প্যাকেটের গায়ে কিংবা ফোল্ডারে এমআরপি লেখা থাকবে। এর বাইরের অন্য সব ওষুধের গায়ে এমআরপি লেখা যাবে না। সেগুলোর গায়ে থাকবে ‘আইপি’। কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ ওষুধেই এমআরপি ব্যবহার করছে কম্পানিগুলো। আর ওই এমআরপি দেখিয়েই ক্রেতাদের কাছ থেকে মূল্য আদায় করা হয়। আবার যেসব ওষুধের প্যাকেটের গায়ে আইপি লেখা থাকে তাও সাধারণ ক্রেতাদের কাছে মৌখিকভাবে এমআরপি বলেই চালিয়ে দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো ওষুধের গায়ে মূল্য লেখাও থাকে না।

অবশ্য দাম বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. সফিউজ্জামান বলেন, সব কিছুর দাম বাড়লে এর প্রভাব তো স্বাভাবিকভাবেই খুচরা মূল্যের ওপরও পড়বে। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে ওষুধের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি খরচ বৃদ্ধি, দেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতনও বাড়াতে হয়।

এর সঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে বিক্রেতারাও ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেয়, যার নাম পড়ে ওষুধ কোম্পানির ওপর। ফলে সব সময়ের জন্য মার্কেটে একটি মনিটরিংয়ের ওপর আমরাও জোর দিয়েছি।’

তবে ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘কেবল যে ওষুধের দাম বাড়ে তা নয়, এখন ওষুধের দাম কমছেও। যেসব কাঁচামালের দাম কমে সেসব ওষুধের দামও আমরা কমিয়ে দেওয়ার কথা বলেছি। ইতিমধ্যেই কয়েকটি কম্পানি কিছু ওষুধের দাম কমিয়ে ফেলেছে।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 135 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ