কর্ণফুলীর মরণদশা!

Print
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কঠিন ও তরল বর্জ্য এভাবেই প্রতিদিন দূষণ করছে কর্ণফুলী নদী -সমকাল

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কঠিন ও তরল বর্জ্য এভাবেই প্রতিদিন দূষণ করছে কর্ণফুলী নদী

দূষণ আর দখলে কর্ণফুলী নদীর এখন মরণদশা! চট্টগ্রামের ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে পরিচিত এই নদী শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালির কঠিন বর্জ্য, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেলে মারাত্মক দূষণের শিকার। বাড়ছে লবণাক্ততা। এতে বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ধ্বংস হচ্ছে মাছের নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্রও। অন্যদিকে, নদীর দুই পাড় ভরাট করে চলছে দখলের প্রতিযোগিতা। ফলে দিন দিন সরু হয়ে পড়ছে প্রমত্তা এ নদী। পরিবর্তিত হচ্ছে গতিপথ। সম্প্রতি কর্ণফুলী নদী নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিচালিত এক প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দখল ও দূষণ এখনই রোধ করা না গেলে
নিকট ভবিষ্যতে কর্ণফুলীও বুড়িগঙ্গা নদীর পরিণতি ভোগ করবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মো. কামরুল হাসান এবং সহকারী পরিচালক খন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী কর্ণফুলী নদী সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে জমা দেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্ণফুলীর দু’পাড়ে এবং আশপাশে গড়ে ওঠা প্রায় তিন থেকে চারশ’ ছোট-বড় কলকারখানার এবং নগরীর বিভিন্ন কঠিন বর্জ্য গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলীতে। প্রতিদিন বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য এভাবে নদীতে পড়ায় জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদীর মূল প্রবাহও এখন হুমকির মুখে। নদীর দুই পাশে গড়ে ওঠা পেপার মিল, রেয়ন মিল, সার কারখানা, অয়েল রিফাইনারি, বিদ্যুৎ প্রকল্প, সিমেন্ট কারখানা, ডাইং ও ওয়াশিং কারখানা, ট্যানারি শিল্প, সাবান তৈরির কারখানা ও অন্যান্য শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যে এই দূষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ডাইং, ওয়াশিং, ট্যানারি ও পেপার মিলের অপরিশোধিত তরল রাসায়নিক বর্জ্য ইটিপিতে পরিশোধন ছাড়াই নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা পয়োবর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ না করায় প্রতিনিয়ত পানিতে তরল বর্জ্য পড়ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কঠিন ও তরল বর্জ্য মানসম্মত পরিশোধন না করে সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে জড়িত পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী সমকালকে বলেন, সরেজমিন পরিদর্শন করে কর্ণফুলীর বর্তমান অবস্থার প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। নদীর বর্তমান অবস্থা ভালো নয়। নদীর পানির গুণগত মান পরীক্ষা করে যে রিপোর্ট পাওয়া গেছে, তা এক কথায় আশঙ্কাজনক। খুব শিগগির দূষণ রোধে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। নদীর দূষণ প্রতিরোধে আটটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ করিম সমকালকে বলেন, কর্ণফুলী রক্ষায় জন্য নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ করেছে। নদীর দখল রোধে হাইকোর্টের নির্দেশ দুই হাজার ১৭৫ দখলদার উচ্ছেদে শিগগির অভিযান পরিচালিত হবে। যেসব শিল্প-কলকারখানা ইটিপি ব্যবহার না করে দূষণে সম্পৃক্ত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন কঠিন বর্জ্য এবং ওয়াসার তরল বর্জ্যে দূষণরোধে ব্যবস্থা নিতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।

তরল বর্জ্য ও তেল দূষণ

নদীর দু’পাড়ের গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলোতে তরল বর্জ্য শোধনাগার না থাকায় নিঃসৃত বর্জ্য নদীতে মিশছে। এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে কর্ণফুলী পেপার মিল লিমিটেড (কেপিএম), এশিয়ান পেপার মিল, এমইবি পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিল, রিফ লেদার লিমিটেড, মদিনা ট্যানারি লিমিটেড, পটিয়ায় টিকে কেমিক্যাল, এফএমসি পেইন্টস অ্যান্ড কেমিক্যাল, আম্বিয়া পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস, মোস্তফা পেপার প্রোডাক্টস ও মোস্তফা পেপার কমপ্লেক্সসহ কালুরঘাটে অবস্থিত ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং দেশ ডেনিম ও ফোর এইচ ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের মতো শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জুলাইয়ে কর্ণফুলী নদীর মেঘনা অয়েল জেটির অপর পাশে ডাঙার চর এলাকায় ডিজেল বোঝাই অয়েল ট্যাঙ্কার আরজুর সঙ্গে অয়েল ট্যাঙ্কার মারকেন্টাইল-১৯-এর সংঘর্ষে কর্ণফুলী নদীতে ছড়িয়ে পড়ে প্রায় দুই হাজার লিটার ডিজেল। এ ছাড়া কর্ণফুলী তীরবর্তী পাওয়ার প্ল্যান্টের কারণে নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে তেল। ২০১৫ সালে দোহাজারী পিকিং বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আনা ফার্নেস তেলবাহী ওয়াগন রেলসেতু ভেঙে বোয়ালখালী খালে পড়লে প্রায় ৭৬ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল কর্ণফুলীর পানিতে মিশে যায়।

বিলুপ্তির পথে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ

কর্ণফুলী নদীতে ৬৬ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ এবং মিশ্র পানির ৫৯ প্রজাতির ও সামুদ্রিক ১৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে মিঠা পানির ২০-২৫ প্রজাতির ও মিশ্র পানির ১০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত প্রায়। বাকিগুলোর মধ্যে ১০-২০ প্রজাতির মাছ ছাড়া অন্য প্রজাতির মাছ এখন বিপদাপন্ন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও নদী গবেষক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদীর গবেষণায় দেখা যায়, কর্ণফুলীতে মোট মাছ রয়েছে প্রায় ১১৯ প্রজাতির। এর মধ্যে ১০১টি রয়েছে ফিন ফিশ, ১৮টি শেল ফিশ (১৬ প্রজাতির চিংড়ি এবং দুই প্রজাতির কাঁকড়া)। এর মধ্যে সংকটাপন্ন রয়েছে ৯টি প্রজাতি, বিপদাপন্ন ১২টি এবং অতি বিপদান্ন রয়েছে পাঁচ প্রজাতির মাছ।

বাড়ছে লবণাক্ততা

ক্রমাগত দখল-দূষণের পাশাপাশি নদীতে বাড়ছে লবণাক্ততা। কর্ণফুলীর দুটি পয়েন্ট থেকে পানি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। বর্ষাকলে লবণাক্ততার পরিমাণ কম হলেও শীতকালে তা বেড়ে যায়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে লবণাক্ততার পরিমাণ প্রতি লিটার পানিতে ১৭-২১ মিলিগ্রাম থাকে ।

দূষণ রোধে সুপারিশ

কর্ণফুলীর দূষণ রোধে যে সুপারিশ করা হয় তাতে বলা হয়, নগরবাসীকে নদীর দূষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলা। তরল বর্জ্য সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নির্মাণ ও তা কার্যকরভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা নেওয়া। চট্টগ্রাম শহরের প্রায় ৬০ লাখ নগরবাসীর পয়োবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য পরিশোধনের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃক স্যুয়ারেজ টিটমেন্ট পল্গ্যান্ট নির্মাণ করা। চট্টগ্রাম শহরের কঠিন বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মতভাবে অপসারণ এবং ডাম্পিং করার জন্য চসিকের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী সমকালকে বলেন, জোয়ার-ভাটার কারণে কর্ণফুলী এখনও বেঁচে আছে। ব্যাপক হারে বাড়ছে লবণাক্ততা ও ক্লোরাইডের মাত্রা। নদীর ফিরিঙ্গিবাজার থেকে সমুদ্র মোহনা পর্যন্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটার পানিতে এক থেকে দেড় মিলিগ্রাম। যেখানে মাছসহ অন্যান্য জলজ-প্রাণীর জন্য প্রয়োজন প্রতি লিটারে তিন মিলিগ্রাম অক্সিজেন। যে কারণে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 82 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ