কিশোর প্রেমিককে সঙ্গে নিয়ে স্বামী খুন

Print

%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8b%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%bfছেলের বয়সী কিশোর প্রেমিকের সঙ্গে প্রেম। তারপর বিয়ে। গল্পের এখানেই শেষ নয়। প্রেমিক ও তার দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীকে খুনের পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নও করে। সুযোগ বুঝে মেহমান সাজিয়ে খুনিদের বাসায় ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাত ও পিটিয়ে স্বামীকে হত্যার পর ঘটনাটি ডাকাতি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা। সবই করেন মিরপুরের গৃহবধূ লাভলী আক্তার লীনা (৪০)। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। স্বামী হত্যা মামলায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেফতার হয় সে। গ্রেফতার হয় তার কিশোর প্রেমিক মিরপুরের বিএন কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র তানভীর (১৮), ঢাকা বিজ্ঞান কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র জিসান (১৮) ও কর্মাস কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র মুক্ত (১৮)।
ঘটনাটি ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসের। ওই বছর ১৯ অক্টোবর রাতে মিরপুর ১০ নম্বর সি ব্লকের ১৫ নম্বর লেনের ১১ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিনকে। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে অসম প্রেমের ভয়ংকর নৃশংসতার অজানা কাহিনী। এলাকার সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে লীনার অপকৃর্তির নানা খবর। গ্রেফতারের পর সবার ধারণা ছিল, এমন পরিকল্পিত হত্যার সঙ্গে জড়িত লীনা, তার প্রেমিক ও সহযোগীদের বিচার হবে। নিহত গিয়াস উদ্দিনের পরিবারও আশা করেছিল, খুনিরা ছাড় পাবে না। কিন্তু না। সেই লীনা, তার প্রেমিক তানভীর, তানভীরের দুই বন্ধু অনেক আগেই জামিনে বেরিয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা জানান, লীনা এখনও আগের মতোই উচ্ছৃংখল ও বেপরোয়া জীবনযাপন করছে। জিন্সপ্যান্ট পরে বিভিন্নজনের সঙ্গে এলাকায় ঘোরাফেরা করে। তানভীরের সঙ্গেও এলাকায় দেখা যায় মাঝেমধ্যে। জামিনের পর মামলার সাক্ষী ও নিহত গিয়াসের আত্মীয়দের হুমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিহত গিয়াস উদ্দিনের ভাই মাসুদুর রহমান মঙ্গলবার জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবা হাজী সিরাজ উদ্দিন মাতবর বাদী হয়ে গিয়াসের স্ত্রী লাভলী আক্তার লীনা ও অজ্ঞাত ৩-৪ জনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে লীনা, তানভীর, মুক্ত ও জিসানকে আসামি করে চার্জশিট দেয় পুলিশ। চার্জশিট দাখিলের আগেই মুক্ত ও জিসান জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পায় লীনা। এরপরই জামিনে ছাড়া পেয়েছে তানভীর। মাসুদুর রহমান আরও জানান, জামিনে বের হওয়ার পর লীনা ও তার সহযোগীরা বাদী পক্ষকে দেখে নেয়ার হুমকিও দিচ্ছে। কিছুদিন আগে তার বাবা (মামলার বাদী) মারা গেছেন। তিনি এই নিষ্ঠুর হত্যার বিচারও দেখে যেতে পারেননি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর থানার এসআই মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, গিয়াস উদ্দিন খুন হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মাথায় চৌকস পুলিশ অফিসার মিরপুর থানার তৎকালীন ওসি প্রয়াত মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন খান হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ও আসামিদের গ্রেফতার করেন। দু’জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হওয়ার পর মোয়াজ্জেম হোসেন মামলার তদন্তভার পান। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সিআইডির কাছ থেকে ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বছরের জুলাই মাসের প্রথমদিকে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এখন মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম জানান, আসামিরা নিম্ন আদালতে যখনই জামিন আবেদন করেছে তখনই বিরোধিতা করেছেন। তবে কোন আসামিকে জামিন দেবেন সেটা আদালতের বিষয়। তিনি আরও জানান, মহানগর দায়রা জজ আদালতে মালাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এ পর্যন্ত ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
স্বামী খুন ও জেলে যাওয়া এবং জামিন সম্পর্কে জানতে চাইলে লীনা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বরং তার বাবার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। জানতে চাইলে তার বাবা লিয়াকত আলী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ফার্স্ট ইজ ফার্স্ট। এগুলো নিয়ে আর কথা বলতে চাই না।’
স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ধনকুবের লিয়াকত আলী মেয়েকে নতুন করে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। মামলা থেকে খালাস করে আনার চেষ্টাও চলাচ্ছেন। লীনার সন্তানরাও এখন নানার বাসায় থাকে। তাদের দেখাশোনা নানা-নানিই করেন।
আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও চার্জশিটে বেরিয়ে আসে গিয়াস উদ্দিনকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই কিলিংমিশনে অংশ নেয় ৪ জন। লীনার প্রেমে পড়ে তানভীর তার (লীনা) পরামর্শ ও উৎসাহে গিয়াসকে খুন করেছে। এজন্য লীনা তাকে ৫০ হাজার টাকা দেয়ার অঙ্গীকার করেছিল। যার মধ্যে ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছে। জিসান ও মুক্ত হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় তানভীরের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে। লীনার টাকায় খুনের সময় পরার জন্য গ্লাবস, গেঞ্জি ও টাউজার কেনে। লীনা নিজে কিনে দেয় ছুরি। হত্যার সময় লীনা নিজে উপস্থিত ছিল। খুনের কৌশল ও পরবর্তী ঘটনা কিভাবে সাজাবে তাও শিখিয়ে দেয় লীনা। হত্যাকাণ্ড শেষে ৩ কলেজ ছাত্রই তাদের বাসায় ফিরে স্বাভাবিক ছিল। লীনাকে পুলিশ আটক করার পর তানভীর কয়েকবার থানার সামনেও ঘোরাঘুরি করেছে। উঁকিঝুঁকি দিয়ে থানার ভেতরে থাকা লীনাকে দেখার চেষ্টা করেছে।
স্বীকারোক্তি থেকে আরও জানা যায়, ঘটনার বছরখানেক আগে নিহত গিয়াস উদ্দিনের বাসার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তানভীরকে হাই-হ্যালো দেয় লীনা। কয়েকদিন পর একটি কাগজে লীনার মোবাইল নম্বর লিখে রাস্তায় ফেলে রাখে। সেই কাগজ তুলে নেয় তানভীর। এরপর তারা প্রতিদিন কথা বলতে থাকে। কয়েকদিন পর তারা মিরপুর স্টেডিয়ামের পাশে ফুচকার দোকানে দেখা করে। লীনা নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দেয়। তার বাসায় গেলে দুই সন্তান তার ভাইয়ের বলে পরিচয় দেয়। পরে একদিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে লীনা নিজেকে বিবাহিত ও দুই সন্তানের মা বলে স্বীকার করে। এক পর্যায়ে সে জানায়, তার স্বামী অত্যন্ত খারাপ লোক। সে তাকে মারধর ও নির্যাতন করে। সে চরম মানসিক কষ্টে আছে। লীনার মা-বাবাও বিষয়টি বুঝতে চাইছে না। তানভীরকে লীনার অনেক ভালো লাগে। সে হ্যান্ডসাম, সুন্দর করে কথা বলে। গিয়াসকে খুন করলে দুই সন্তানসহ লীনা তার হবে। সঙ্গে গিয়াসের মার্কেট, বাড়িসহ সব সম্পত্তিও পাবে।
তানভীরের ভাষায় লীনা তাকে বলেছিল, ‘সে অনেক ভালো মেয়ে, তাকে আমি অনেক লাভ (ভালোবাসা) করি। সেও আমাকে অনেক লাভ করে।’ এক পর্যায়ে লীনার দুই সন্তানকে বাবা হিসেবে তানভীরকে পরিচয় করিয়ে দেয় লীনা। তারাও তানভীরকে বাবা বলে ডাকত। ঘটনার তিন মাস আগে তানভীরকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় লীনা। পরিকল্পনা মোতাবেক কাজীপাড়ার এক মাদ্রাসায় ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর ৫ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে করে তারা। সেখানে তানভীর ও লীনার কয়েক বন্ধু উপস্থিত ছিল।’ বিয়ের পর তারা গিয়াসের বাসাতেই বাসর ঘরও করে।
বিয়ের পর লীনা বরাবরই গিয়াসকে মেরে ফেলার জন্য চাপ দিতে থাকে। বিয়ের পর দু’জনের একসঙ্গে থাকার বাধা দূর করতে লীনা পরিকল্পনা করে। লীনার পরামর্শে জিসান ও মুক্তর সঙ্গে ৩০ হাজার টাকায় চুক্তি করে তানভীর।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আগে থেকেই বাসায় গিয়ে অবস্থান নেয় তিনজন। এ সময় লীনা ফোন করে গিয়াসকে বলে বাসায় মেহমান এসেছে। তাদের জন্য কোক ও বিস্কিট নিয়ে যেতে। গিয়াস কোক নিয়ে বাসায় যাওয়ামাত্রই গিয়াসকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় আঘাত করে তানভীর। মুহূর্তের মধ্যে জিসান ও মুক্ত হাত-পা ধরে ফেলে গিয়াস উদ্দিনের। বাইরে যাতে শব্দ না যায় সেজন্য লীনা টিভির বলিউম বাড়িয়ে দেয়। সোফার কুশন এনে তানভীরের হাতে দেয় গিয়াসের নাকে-মুখে চেপে ধরার জন্য।
এ সময় লীনা নিজেই গিয়াসের শরীরে কয়েকবার ছুরিকাঘাত করে। গিয়াসের মৃত্যু নিশ্চিত করে মুক্ত ও জিসান হাত-মুখ ধুয়ে কোক খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। জিসান একটু পরে বের হয়। কেউ দেখে ফেলতে পারে এজন্য সে লীনার বোরখা পরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 118 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ