কী হবে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে

Print

%e0%a6%95%e0%a7%80-%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a6%bfপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন দিল্লি সফরকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পানি সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হবে। আর ভারত চাইবে নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা। একইসঙ্গে সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতার ওপরও জোর দেবে দেশটি। শেখ হাসিনার এবারের সফরের নতুন বিষয় হিসেবে নিউক্লিয়ার, স্পেস, স্যাটেলাইট, বাণিজ্য সহযোগিতাসহ ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। ইতোমধ্যে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি, এজেন্ডা, প্রকল্পসহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি রূপরেখা তৈরির বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত একমত হতে পারে। এছাড়া ‘লাইন অব ক্রেডিট ফরম্যাট’-এর বদলে প্রকল্পভিত্তিক সহায়তার আওতায় ভারত বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারে বলেও আভাস পাওয়া গেছে।
পানি সহযোগিতা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তিস্তা চুক্তি বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের বিষয়। এ চুক্তি সম্পাদনের জন্য সরকার দিল্লিকে বলেছে। দিল্লির সঙ্গে পশ্চিম বঙ্গ সরকারের সমীকরণ তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এ বিষয়ে আমাদের কোনও বক্তব্য নেই। কিন্তু আমরা চাই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব এ চুক্তি করা।’
২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময়ে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির চরম বিরোধিতার কারণে তখন সম্ভব হয়নি। তিস্তা চুক্তি ছাড়াও গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ প্রকল্প দুদেশের জন্য লাভজনক হবে। ভারত পানির ব্যাক ফ্লো ও পলিস্থর যে উদ্বেগ জানিয়েছে, আমরা তার জবাব দিয়ে বলেছি, এ বিষয়ে উদ্বেগের কোনও কারণ নেই।’ তিনি বলেন, ‘অক্টোবরে ভারতের একটি টেকনিক্যাল দল গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প এলাকা প্রদর্শন করে। এ সময় এ বিষয়ে দু’পক্ষ একসঙ্গে কাজ করার লক্ষ্যে একমত পোষণ করে।’
প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে এ বিষয়ে কোনও চুক্তি হবে কিনা—জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি ঘোষণা আসবে।’
রবিবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের সঙ্গে দেখা করার পরে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলা সাংবাদিকদের বলেন, ‘পানি সহযোগিতা নিয়ে দু’দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।’
২০টির বেশি চুক্তি
গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময়ে ২২টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও দলিল স্বাক্ষরিত হয়। এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর প্রসঙ্গে একজন কূটনীতিক বলেন, ‘এবার প্রায় ৫০টির মতো চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও দলিল নিয়ে আলোচনা চলছে। আশা করা হচ্ছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০টির বেশি চুক্তি সম্পন্ন হবে।’ তিনি বলেন, ‘নিউক্লিয়ার শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার বিষয়ক একটি চুক্তি দু’পক্ষই চূড়ান্ত করেছে। আশা করা হচ্ছে, এটি প্রধানমন্ত্রীর সফরকালেই স্বাক্ষরিত হবে।’
উল্লেখ্য, চলতি মাসের ১৫-১৬ তারিখে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্তজুড়ে বর্ডার হাট স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন, স্যাটেলাইট ব্যবহার, আউটার স্পেস সংক্রান্ত একাধিক কাঠামো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে এ সফরকালে।’
এছাড়া পায়রা গভীর সুমদ্র বন্দরের একটি অংশের কাজের জন্য ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।
সামরিক সহযোগিতা
সকারের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ঢাকা সফর করবেন। তিনি আগামী ৩০ নভেম্বর দু’দিনের সফরে ঢাকা আসবেন। এটি হবে ভারতের কোনও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম ঢাকা সফর। সে হিসেবে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
পারিকরের সঙ্গে কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে—জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতার একটি রূপরেখা কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে। অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক বেশি গভীর ও ব্যাপক।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কৌশলগত সম্পর্কের চেয়েও বেশি কিন্তু এ সম্পর্কের কোনও নাম দেওয়া হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে বাংলাদেশ-ভারতের এ সম্পর্কের কোনও নাম দেওয়া হবে কিনা—জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দেখা যাক।
অক্টোবর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে ‘কৌশলগত সম্পর্কে’ উন্নীত করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনেক গভীর। দু’দেশ নিরাপত্তা ক্ষেত্রে তথ্য আদান-প্রদানসহ সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া আয়োজন করে থাকে।’
এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের দিল্লি সফরের সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে দু’দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রকল্প সহযোগিতা
২০১০ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এক বিলিয়ন ডলারের প্রথম লাইন অব ক্রেডিট স্বাক্ষরিত হয়। তবে এর অধীনে নেওয়া সব প্রকল্পের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। এরপর ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকালে দুই বিলিয়ন ডলারের দ্বিতীয় লাইন অব ক্রেডিট স্বাক্ষরিত হয়। এর অধীনে নেওয়া প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রক্রিয়া শেষ হতে সাত থেকে আট বছর লাগবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ অবস্থায় ভিন্ন একটি ব্যবস্থা চিন্তা করা হচ্ছে। লাইন অব ক্রেডিটের অধীনে প্রথমে এক বা দুই বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়। তারপর প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়।’ ভিন্ন ব্যবস্থার অধীনে প্রথমে প্রকল্প চিহ্নিত করে পরে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে যেসব বিগ টিকেট বা বড় প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হবে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিমানবন্দর বা সুমদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প।’
মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সম্মাননা
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে নিহত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সকারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এবার দিল্লি সফরের সময় একটি অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে কয়েকজন শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে সম্মাননা তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। বাকিদের পর্যায়ক্রমে সম্মননা দেওয়া হবে।
সম্ভাব্য সফর সূচি
দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়াও শেখ হাসিনা ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করবেন। ভারতের বিরোধী দলীয় নেতা সোনিয়া গান্ধি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। এছাড়া গান্ধি আশ্রম রাজঘাট পরিদর্শন করবেন শেখ হাসিনা।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ডিসেম্বরের ১৮-১৯ ভারত সফর করবেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 46 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ