খুনের অভয় অরণ্য যেন কুমিল্লা, ১০ মাসে ১৩২ খুন

Print

%e0%a6%96%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%85%e0%a6%ad%e0%a7%9f-%e0%a6%85%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%b2দেশের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী প্রাচীন জেলা কুমিল্লায় উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, খুন ও নারী নির্যাতনের ঘটনা। চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে অনেক। প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদ্ধারের তালিকা খুবই নগণ্য।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ১০ মাসে জেলায় খুনের ঘটনা ঘটেছে ১৩২টি। একই সময়ে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, চুরি ডাকাতি, অপহরণ, দ্রুত বিচার, মাদকসহ অন্যান্য অপরাধে মামলা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার।
জাগো নিউজের অনুসন্ধান ও জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় পুলিশের মাসিক পর্যালোচনা রিপোর্টে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত জেলার ১৬ উপজেলার ১৭ থানায় ১৩২ খুনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে চুরি, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, অপহরণ ও মাদকসহ অন্যান্য অভিযোগে মোট মামলা হয়েছে ৫ সহস্রাধিক।
জানুয়ারি মাসে খুনের ঘটনা ঘটে ৯টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৩৬,অস্ত্র মামলা ২, মাদক ২০৭ সহ অন্যান্য অপরাধে মামলা ৪৩৬টি, ফেব্রুয়ারি মাসে খুন ১৪, নারী ও শিশু নির্যাতন ৩৮, অস্ত্র ৭, মাদক ৩৪২ সহ অন্যান্য অপরাধে মোট মামলা ৫০০।
মার্চ মাসে খুন ১৪টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৬১, অস্ত্র ৮, মাদক ১৮৯,অন্যান্য অপরাধ ৪৯২, এপ্রিলে খুন ১৫,নারী ও শিশু নির্যাতন ৪৩, অস্ত্র ৩, মাদক ১৮৮, মোট অপরাধ ৪৯৯, মে মাসে খুন ১৬, নারী ও শিশু নির্যাতন ৪৭, অস্ত্র ৮, মাদক ১৭৫টি মোট অপরাধ ৫০৫।
জুন মাসে খুন ১০টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৫২, অস্ত্র ৭, মাদক ২০৯, মোট অপরাধ ৫৪৬, জুলাই মাসে খুন ৬, নারী ও শিশু নির্যাতন ৪৯, অস্ত্র ৬, মাদক ১৭১, মোট মামলা ৪৫৪টি, আগস্টে খুন ১০, নারী ও শিশু নির্যাতন ৪২, অস্ত্র ১৪, মাদক ৩৩১, মোট অপরাধ ৬৪৯, সেপ্টেম্বরে খুন ১৪, নারী ও শিশু নির্যাতন ৪৭, অস্ত্র ১৪, মাদক ২৪১, মোট অপরাধ ৫৩৫, অক্টোবরে খুন ১৪, নারী ও শিশু নির্যাতন ৪৮, অস্ত্র ৮, মাদক ৩২০ সহ মোট অপরাধ ৫৭৩টি।
অপরদিকে, ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত শুধু খুনের খুনের ঘটনাই ঘটেছে ১০টি। এর মধ্যে গত ৮ নভেম্বর-দাউদকান্দির গৌরীপুর পেন্নাই এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে তিতাস উপজেলার জিয়ারকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনির হোসাইন সরকার ও গাড়িচালক মহিউদ্দিনের হত্যাকাণ্ডটি ছিল বেশ আলোচিত।
১৩২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বেশ কিছু আলোচিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে চলতি বছরে ঘটে যাওয়া কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডটি অন্যতম। যা নিয়ে কুমিল্লাসহ দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যদিও ওই হত্যাকাণ্ডের এখনো কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা সিআইডি।
আগস্টে সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ছিল শোকাবহ আগস্টের প্রথম প্রহরে কুমিল্লা বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ হত্যাকাণ্ড। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই গত ২৩ আগস্ট ভোর ৬টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সালমানপুর এলাকায় ‘প্রশান্তি’ নামে এক বেসরকারি ছাত্রী নিবাসের (মেস) নিচতলায় বিস্ফোরণে ফাহমিদা হাসান নিশা দগ্ধ হন। ঢামেকের বার্ন ইউনিটে ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত ৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে নিশা মারা যান।
গত ১৪ আগস্ট রাতে কুমিল্লা নগরীর হাউজিং এস্টেটে স্ত্রী নাসিমা আক্তার (৩০) ও ছেলে নাফিস (দেড় বছর) হত্যা করে নাসিমার স্বামী নাজমুল হাসান। গত ১২ আগস্ট রাতে রাস্তা নিয়ে বিরোধের জের ধরে সদর দক্ষিণ উপজেলার ধনাইতরী গ্রামের জামাল হোসেন (৬০) ও একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিন (৪৫) খুনের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য।
এর আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা মহানগরীর দক্ষিণ রসুলপুর (ঢুলিপাড়া) এলাকায় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ শেষ বর্ষের ছাত্র মো. আল সফিউল ইসলাম ছোটন তার সৎ ভাই মেহেদী হাসান জয় ও মেজবাউল হক মনিকে গলাটিপে হত্যার ঘটনাটি বেশ আলোচিত হয়।
গত ৮ মে চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় নির্বাচন চলাকালে মাধবপুর ইউনিয়নের উত্তর চান্দলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাপস চন্দ্র দাসকে।
এছাড়াও ২৯ মে পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচন চলাকালে তিতাস উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী তোফায়েল আহাম্মদের সমর্থকরা একই ইউনিয়নের বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও চেয়ারম্যান মো. কামাল উদ্দিনকে কুপিয়ে ও টেটাঁবিদ্ধ করে হত্যা করে।
গত ১৩ মে রাতে মনোহরগঞ্জে যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমকে (৩০) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। একই দিন ভোরে সদর উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের চিহ্নিত সন্ত্রাসী আরিফ ও তার বাহিনীর গুলিতে নিহত হন আদর্শ সদর উপজেলা জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী একেএম রকিব উদ্দিন মুকুল।
সর্বশেষ চলতি মাসে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে গত ৮ নভেম্বর দাউদকান্দির গৌরিপুর পেন্নাই এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে তিতাস উপজেলার জিয়ারকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনির হোসাইন সরকার ও গাড়িচালক মহিউদ্দিনের হত্যাকাণ্ডটি।
এছাড়াও গত ৭ নভেম্বর বুড়িচং উপজেলার নিমসার গ্রামে মাদক বিক্রির টাকা নিয়ে বিরোধের জের ধরে শিক্ষার্থী হাফেজ সালমান খাঁন সবুজ ও মোক্তার হোসেন নামে দুই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ এরই মধ্যে বুড়িচং উপজেলার মোকাম গ্রামের গোলাম কিবরিয়া হাফেজ ও ইব্রাহিম খলিলকে গ্রেফতার করেছে।
কুমিল্লায় খুন, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অস্ত্রবাজিসহ অন্যান্য অপরাধের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করেও জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 88 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ