খেলার বয়সে মা

Print

খেলার বয়সে মা

রাবেয়ার শিশু বয়স কাটেনি। কিন্তু সে এখন আরেক শিশুর মা। ছবিটি পটুয়াখালীর বগিখাল থেকে তোলা।

রাবেয়ার বয়স ১৪। তার চোখেমুখে এখনো শিশুসুলভ ভাব। অথচ তার কোলজুড়ে ছয় মাসের সন্তান। খেলার বয়সে মা হয়ে বইছে আরেক শিশুর বোঝা। কত বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে—প্রশ্ন করলে কপাল কুঁচকে মাথা হেলিয়ে সে বলে, ‘বিয়া অইছে তিন বচ্ছর তো অইবেই। আমার যহন বিয়া অইছে তহন আমি হাফপ্যান্ট পরি।’

রাবেয়ার নৌকাটি ছিল পটুয়াখালীর বাউফল ও দশমিনা উপজেলা বিভক্তকারী বগি খালে। তার স্বামী রুবেল সরদার (২০)। ওই বহরের অন্য নৌকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাবেয়ার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন তার বয়স ১০ বছরের চৌকাঠ পেরোয়নি। বিয়ের দুই দিন পরই স্বামীর সংসারের দায়িত্ব শুরু। সন্তান হওয়ার পর ভেঙে পড়েছে শরীর। রাবেয়া বলে, ‘বিয়ার বয়স অইছে দেইক্যাই বাপ-মায় বিয়া দেছে। নৌকার সবার ওই বয়সেই বিয়া অয়।’

বহরের আরেক নৌকায় ছিল কুলসুম বিবি (১৩)। গত অক্টোবরের মাঝামাঝি চরকাজল খালে তার সঙ্গে বিয়ে হয় রিপন সরদারের (১৬)। খুবই দুর্বল শারীরিক কাঠামো নিয়ে স্বামীর সংসার শুরু করেছে কুলসুম। সে বলে, ‘বাপ-মায় বিয়া দেছে, আমি কী করমু? বিয়ার বয়স না অইলে কি বিয়া দেতে?’

বাল্যবিয়ে শুধু এ দুই মেয়ের জীবনে আসেনি। এ সম্প্রদায়ের প্রতিটি নৌকায় মেয়েদের বিয়ে হয় এ বয়সে। পটুয়াখালীর বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকায় নৌকায় বসবাস করা অভিভাবকরা মনে করেন, বিয়েটা কন্যা বিদায়ের দায়মুক্তি। কত বছর বয়সে কন্যাসন্তানের বিয়ে দেওয়া উচিত তা জানেন না তাঁরা। এমনকি বিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয় না। ফলে প্রয়োজন হয় না বর বা কনের জন্ম সনদের। মূলত এসব বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।

বাউফল উপজেলার নারাইনপুর, কালাইয়া, হোগলা, তালতলি; গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া, পক্ষিয়া, চরকাজল, বোয়ালিয়া, পানপট্টি, বদনাতলী, রামনাবাদ, পাউট্টা ও ডেবপুরা; রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া, চালিতাবুনিয়া, বড় বাইশদিয়া, কোড়ালিয়া ও চরমোন্তাজ স্লুইস বাজার খালে ১০ হাজারের বেশি মান্তা পরিবারের বাস। এসব পরিবারের বেশির ভাগ মেয়েকে ১০ থেকে ১৩ বছর বয়স হলে অন্য নৌকায় বর খুঁজে বিয়ে দেওয়া হয়।

বগি খালের কদম আলীর স্ত্রী পিয়ারা বেগম (৩০) জানান, আট কিংবা ৯ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়। বর্তমানে পাঁচ সন্তানের জননী। অভিভাবকরা শিশু বয়সে কন্যাসন্তানকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। বিয়েতে কাজি ডাকা হয় না। শুধু কলেমা পড়িয়ে কবুল বলাতে একজন হুজুর বা মৌলভি ডাকা হয়। পিয়ারা বলেন, ‘বিয়ে ছাড়া আমাগো নৌকার মাইনষের কোনো আনন্দ অয় না। আনন্দ-ফুর্তির লইগ্যা কোম বয়সে মাইয়াগো বিয়া অয়। আর বোঝেন-ই তো, বিয়ার লইগ্যা এউক্কা পোলা আর এউক্কা মাইয়া অইলেই অয়। আমাগো নৌকায় গুরাগ্যারার (ছেলেমেয়ে) অভাব নাই। কোম বয়সে বিয়া অইলেও বয়স তো বাড়তেই থাহে। আমি সাবল্লক অইছি স্বামীর নৌকায় যাইয়া। আমার বিয়ায় নৌকার মাইনষে খুবই আনন্দ-ফুর্তি করছে।’

প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দেন কালু সরদারের স্ত্রী তিন সন্তানের জননী রাহিমা বেগম (২৮), শুক্কুর সরদারের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সূর্য বেগম (১৫)। রিপন সরদারের স্ত্রী এক সন্তানের জননী মুক্তা বেগম (১৬)। এদের সবারই বিয়ে হয়েছে ১৩ বছর বয়সের মধ্যে।

মান্তা পুরুষরা জানায়, ভাসমান জীবনে কোনো সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কিংবা ধর্মীয় উৎসব তারা উদ্যাপন করতে পারে না। এ কারণে বিয়ে তাদের একমাত্র উৎসব। ছোট ছোট শিশুর বিয়ে দিয়ে তারা আনন্দ করে।

মান্তা নারীরা জানায়, পরিকল্পিত পরিবার সম্পর্কে তারা জানে না। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানে না। কারণ নৌকাবহরে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী কখনো আসেননি। ফলে ফি বছর সন্তান হয়। বেশির ভাগ মা ১৮ বছরের মধ্যে একাধিক সন্তানের জন্ম দেয়। তা ছাড়া বয়স যত বাড়ে মায়েদের সন্তানও তত বাড়ে। আনছার সরদারের স্ত্রী মিনারা খাতুন (৪৫) ৯ সন্তানের জননী। পরিবার পরিকল্পনা বা জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওই সব আমরা বুঝি না। আমাগোরে কেউ ওই সব কিছু কয় নাই।’

বাউফল ও রাঙ্গাবালী উপজেলার দায়িত্বে থাকা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মাহাবুব হাসান ভূঁইয়া বলেন, ‘স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা তাদের সেবা দিতে পারছেন না। কারণ তাদের কোনো হোল্ডিং নম্বর নেই। তবে এ জনগোষ্ঠীর লোকজন যদি আমাদের কোনো কর্মীর কাছে গিয়ে সেবা চায়, তাহলে কর্মীরা সেবা দিতে বাধ্য। কিন্তু অসচেতনতার কারণে তারা কোনো কর্মীর কাছে সাধারণত যায় না। নদীতীরবর্তী এলাকায় আবাসন বা আশ্রয়ণ প্রকল্পে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা হলে তাদের সব ধরনের সেবা দিতে পারব।’

পটুয়াখালী জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শাহিদা বেগম বলেন, ‘মৌখিকভাবে এ সম্প্রদায় এবং তাদের জীবনমান সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর জন্য মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত পরিকল্পনা চাওয়া হলে আমরা তা তৈরি করে দেব।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 74 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ