গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে না কোন সময়ে শারীরিক মিলন করলে?

Print

milon1

গর্ভধারণের বিষয়টি আসলে একটি হিসেবের সাথে জড়িত। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বলা যায় পিরিয়ড বা মাসিকের দিন থেকে ৭ দিন পর্যন্ত গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে না। আবার অষ্টম দিন থেকে ১৭ দিন পর্যন্ত গর্ভধারণের মোক্ষম সময়। ১৮ তম দিন থেকে পিরিয়ড হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ সময়। অর্থাৎ পিরিয়ডের ৭ দিন আগে ও পরের সময় নিরাপদ। এ সময়ে গর্ভধারণ হয় না। মাঝামাঝি দিনগুলোতে গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা একটি পদ্ধতি, এই পদ্ধতিতে আপনি কোনরকম জন্মনিরোধ পদ্ধতি ব্যবহার না করেই সহবাস করতে পারবেন, এবং আরও জানতে পারবেন কোন সময় আপনার গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। এই পদ্ধতিতে গণনা করে বোঝা যায় মাসের কোন সময় আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি এবং কোন সময় আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে কম। এখানে আপনি আপনার বিভিন্ন শারীরিক বিভিন্ন লক্ষনের ব্যাপারে জানবেন। এই শারীরিক লক্ষণগুলো দেখে এবং খেয়াল রেখে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন কোন সময় সহবাস করলে আপনার গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে কম সম্ভবনা। আপনাকে খেয়াল করতে হবে – শরীরের তাপমাত্রা, স্রাবের ঘনত্ত ও প্রকৃতির উপর এবং এইগুলি পর্যবেক্ষণ করে আপনাকে বুঝতে হবে কখন সহবাস করলে আপনি গর্ভবতী হবেন না।

আপনি এই পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি নিজে নিজে বই পড়ে শিখতে পারবেন না। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকেই আপনি সঠিকভাবে শিখতে পারবেন।

এক নজরে – প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনার ব্যাপারে কিছু কথা

• আপনি প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতির নিয়মগুলি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, তাহলে এই পদ্ধতি ৯৯% পর্যন্ত কার্যকর। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারি ১০০ জন মহিলার মধ্যে মাত্র ১ জন গর্ভবতী হন।

• সঠিক নিয়ম অনুযায়ী যদি এই পদ্ধতি ব্যবহার করা না হয়, তাহলে এর কার্যকারিতা অনেক অংশেই কমে যায়। এটি ৯৯% কার্যকারী করতে সময় এবং দায়িত্ব নিয়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।

• এর কোন শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এছাড়া এই পদ্ধতি দিয়ে আপনি বের করে নিতে পারেন আপনার মাসিক চক্রের কোন দিনগুলো গর্ভবতী হওয়ার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়।

• আপনার প্রতি মাসিক চক্রের কিছু দিন আছে যেগুলো গর্ভবতী হওয়ার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়। সেই সময় আপনার কিছু শারীরিক উপসর্গ হয় ও কিছু লক্ষন দেখা দেয়। সেই শারীরিক উপসর্গ ও লক্ষণগুলো কি কি তা আপনাকে বুঝতে হবে। সেই জন্য আপনাকে প্রতিদিন লিপিবদ্ধ করে রাখতে হবে বিভিন্ন শারীরিক লক্ষন কিংবা পরিবর্তন – যেমন আপনার শরীরের তাপমাত্রা, আপনার স্রাবের ধরণ, রকম ইত্যাদি। এইভাবে যদি আপনি এই শারীরিক লক্ষণগুলি ৩-৬ মাসিক চক্র ধরে খেয়াল করেন, তাহলে আপনি নিজে বুঝতে পারবেন কোন সময় সহবাস করলে আপনার গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং কোন সময় ঝুঁকি কম। তাই এই পদ্ধতি সঠিকভাবে শিখতে প্রায় ৩-৬ মাসিক চক্র লাগে।

• আপনার যদি কোন শারীরিক সমস্যা হয়, বা আপনি কোন শারীরিক বা মানসিক চাপে থাকেন বা ভ্রমন করেন, তাহলে আপনার শারীরিক লক্ষনগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।

• আপনার যখন গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে বেশী সম্ভবনা, তখন যদি আপনি সহবাস করতে চান, তাহলে তখন আপনাকে কোন অস্থায়ী জন্ম নিরোধ পদ্ধতি ব্যাবহার করতে হবে যেমন কনডম (condom), ডায়াফ্রাম (diaphragm), বা ক্যাপ (cap)।

• প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি এবং কনডম ব্যবহার করে আপনি নিজে যৌন রোগ (STI – sexually transmitted infections) থেকে নিরাপদ থাকতে পারেন।

প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে?

এই পদ্ধতিতে প্রধান লক্ষ হচ্ছে গর্ভনিরোধ করা। এটি করার জন্য আপনাকে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে (আপনার যখন গর্ভধারন করার সবচেয়ে বেশি সম্ভবনা তখন) সহবাস এড়িয়ে চলতে হবে, বা যদি সেই সময় সহবাস করেনও, তাহলে অস্থায়ী গর্ভনিরোধ পদ্ধতি ব্যাবহার করতে হবে। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গ ও লক্ষণ দেখে আপনাকে বুঝতে হবে সেই সময় আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা কতটুকু এবং তখন সহবাস করলে, আপনি গর্ভবতী হবেন কি না।

একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি থেকে এই পদ্ধতিটি শিখে নেওয়া খুবই জরুরী। আমরা এখন যে তথ্য আপনাকে দিবো, তা আপনাকে এই পদ্ধতি ব্যাপারে কিছু প্রাথমিক ধারণা দিবে। তবে এই তথ্যকে সঠিক নির্দেশনা এবং প্রশিক্ষণের বিকল্প ধরা যাবে না!

প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতিতে ৩ টি ভিন্ন ভিন্ন প্রণালী আছে। এই সব প্রণালী একযোগে ব্যাবহার করলে আমরা প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতির কার্যকারিতা অনেকাংশে বৃদ্ধি করতে পারি। সেই ৩ টি প্রণালী হল –

• আপনার মাসিক চক্রের কোন পর্যায়ে আপনি আছেন তা গননা করা

• প্রতিদিন আপনার শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা

• আপনার যোনিমুখে যা পরিবর্তন হচ্ছে তা লক্ষ করা। এর জন্য আপনার স্রাবের ধরণ ও রকম পর্যবেক্ষণে রাখাই যথেষ্ট।

এই প্রণালির ব্যাপারে আরও বিস্তারিত নিম্নে দেয়া হল।

আপনার মাসিক চক্র

একজন মহিলার মাসিক চক্র ধরা হয় তার মাসিকের প্রথম দিন থেকে তার পরের মাসিকের প্রথম দিন পর্যন্ত। মহিলাদের মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য বিভিন্ন হতে পারে। সাধারণত্ব তা ২৪- ৩৫ দিন পর্যন্ত হয়, তবে মাসিক চক্র এর চেয়ে ছোট বা এর চেয়ে বড়ও হতে পারে। গড়ে মাসিক চক্র ২৮ দিন ধরা হয়।

ডিম্বস্ফোটন

আপনার মাসিক চক্রের সময়-
• আপনার শরীর হরমোন নিঃসরণ (secrete) করে যা আপনার ডিম্বাশয়য়ের (ovary) উপর কাজ করে

• আপনার একটি ডিম্বাশয়য়ে সংরক্ষিত ছোট্ট একটি ডিম্বাণু (ovum) আস্তে আস্তে বড় এবং পরিপক্ক (mature) হতে থাকে

• যখন এই ডিম্বাণু পরিপক্ব হয় তখন তা ডিম্বাণু থেকে বহিরাগত (released) হয় (এই পদ্ধতিকে বলা হয় ডিম্বস্ফোটন – ovulation) । ডিম্বানু এখন আপনার গর্ভনালী (fallopian tube) দিয়ে আপনার জরায়ুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
মাঝে মাঝে প্রথম ডিম্বাণু বহিরাগত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্য ডিম্বাশয় থেকেও আরেকটি ডিম্বাণু বহিরাগত হতে পারে।

মাসিক চক্রের ঠিক মধ্য সময়ে (mid-cycle) এই ডিম্বস্ফোটন (ovulation) হয়। সেই সময়টি সাধারণত্ব আপনার পরবর্তী মাসিক শুরু হওয়ার ১০-১৬ দিন আগে হয়। তবে এটি নিশ্চিত একটি সময় নয়। আপনার মাসিক চক্রের উপরে নির্ভর করে এই সময় আগে পিছে হতে পারে।

ঠিক কখন নিশ্চিত ডিম্বস্ফোটন হবে সেই ব্যাপার সবসময়ই কিছুটা অনিশ্চিত। যখন আপনি আপনার গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভব্য সময় গণনা করবেন, এই অনিশ্চয়তাটি আপনাকে মনে রাখতে হবে, এবং সেই অনুযায়ী হিসাব করতে হবে।

যখন শুক্রাণু (sperm) একটি ডিম্বাণুর(ovum) সাথে মিলিত হয় (fertilization occurs), তখনই গর্ভধারণ করা সম্ভব। সহবাসের পর শুক্রাণু (sperm) একজন মহিলার শরীরে প্রায় ৭ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

আপনাকে প্রায় ৫-৬ টি মাসিক চক্র ধরে এই গননা করতে হবে। এর কারণ আপনার মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য সময়ের সাথে সাথে বদলায় এবং এই পদ্ধতি ব্যাবহারের জন্য আপনার গননা যথাসম্ভব নির্ভুল হওয়া উচিত।

এই গণনা করার একটি পদ্ধতি হচ্ছে ক্যালেন্ডার পদ্ধতি (calendar method)।

এটি এইভাবে করতে হবে-
• প্রতি মাসে আপনি আপনার মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য সঠিক ভবে লিখে রাখুন। এই ভাবে ৬ মাস করুন।

• আপনার সবচেয়ে ছোট মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য এবং আপনার সবচেয়ে লম্বা মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য নিন।

• আপনার সবচেয়ে ছোট মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য থেকে ১৮ দিন বাদ দিন। আপনার যেই সময়টি আসবে, মাসিকের সেই দিন থেকে আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশী।

• এইবার আপনার সবচেয়ে লম্বা মাসিক চক্রের থেকে ১১ দিন বাদ দিন। এইবার যেই সময়টি আসবে, মাসিক চক্রের সেই দিন পর্যন্ত আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশী।

• এইভাবে আপনি ভের করতে পারেন আপনার মাসিক চক্রের কোন দিন থেকে কোন দিন পর্যন্ত গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে উত্তম সময়। এখন এই সময় আপনি সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যদি সহবাস করেনও তাহলে কোন অস্থায়ী জন্ম বিরতিকরন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

উদাহরণ-

আপনার সবচেয়ে ছোট মাসিক চক্র যদি ২৫ দিন হয় এবং আপনার সবচেয়ে লম্বা মাসিক চক্র যদি ৩৩ দিন হয় তাহলে –
• ২৫ থেকে ১৮ বাদ দিলে থাকে ৭

• ৩৩ থেকে ১১ বাদ দিলে থাকে ২২

• এখন বের হয়ে গেলো আপনার মাসিক চক্রের কোন দিন থেকে কোন দিন আপনার গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভব্য সময়। আপনি আপনার মাসিক চক্রের ৭ দিন থেকে ২২ দিন পর্যন্ত সহবাস করবেন না।

তাছাড়া আপনি ovulation calculator ব্যবহার করতে পারেন। কোন সময় আপনার গর্ভধারণ করার সবচেয়ে বেশী সম্ভবনা তার একটি ধারণা পাবেন ovulation calculator ব্যবহার করে। তবে এটি মনে রাখতে হবে যে এটি ১০০% সঠিক নয় এবং ovulation calculator এর দেওয়া তারিখ ডিম্বস্ফোটনের নিশ্চিত তারিখ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবেনা।

এক্ষেত্রে আপনি ovulation calculator ব্যবহার করে আপনার হিসেবটি করে ফেলতে পারেন।


তাপমাত্রা পরিমাপ

আপনার যখন ডিম্বস্ফোটন (ovulation) হয়, তার ঠিক পরপর আপনার শরীরের তাপমাত্রা হালকা বেড়ে যায়। এই পদ্ধতিটি এই ভিত্তির উপরে তৈরি করা।

আপনাকে একটি ডিজিটাল থার্মোমিটার (digital thermometer) বা এমন একটি থার্মোমিটার ব্যাবহার করতে হবে যা প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতির জন্য তৈরি। এই সব থার্মমিটার যেকোনো ঔষধালয়ে (pharmacy) সহজেই পাওয়া যায়। কান বা কপাল থার্মোমিটার (ear or forehead thermometer) এই কাজের জন্য উপযুক্ত নয় কারণ এইসব যথেষ্টভাবে সঠিক সংকেত দেয় না।

এই পদ্ধতিতে আপনাকে যা করতে হবে –
• প্রতিদিন সকালে বিছানার থেকে ওঠার আগে আপনাকে নিজের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হবে। এটি কিছু খাওয়ার , পান করার বা ধূমপান করার আগেই করতে হবে এবং প্রতিদিন একই সময়ে করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।

• আপনি খেয়াল করবেন যে পরপর তিন দিন আপনার শরীরের তাপমাত্রা অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি পাবেন। তাপমাত্রায় বৃদ্ধি খুবই কম হবে ০.২ C (বা ০.৪ F)। তবে হতে পারে যে এই সময়ে আপনার গর্ভবতী হওয়ার আর সম্ভবনা নেই।

স্রাবের ধরণ, প্রকৃতি এবং ঘনত্ব

আপনার মাসিক চক্রের এক এক সময় এক এক রকম স্রাব তৈরি হয়। আপনাকে আপনার স্রবের ধরণ, প্রকৃতি এবং ঘনত্ত খেয়াল করতে হবে।
আপনি এটি খেয়াল করতে পারেন এই ভাবে –

আপনাকে হাতের মধ্যের আঙ্গুল যোনিমুখ দিয়ে আলতো করে ঢুকাতে হবে। তবে বেশী ভিতরে ঢুকানোর দরকার নেই। আঙ্গুলের গিঁট পর্যন্ত ঢুকালেই হবে। আপনি লক্ষ করবেন যে মাসিকের পর পর আপনার যোনিমুখ শুকনো মনে হবে এবং আপনি কোন স্রাব বা স্রাবের মত কিছুই পাবেন না।

যখন আপনার ডিম্বস্ফোটনের (ovulation) সময় ঘনিয়ে আসবে তখন আপনি আবার লক্ষন করে দেখবেন যে আপনার যোনীমুখে এখন স্রাব আছে এবং স্রাবের ধরণ হচ্ছে এই রকম –

• ভেজা ভেজা এবং আঠালো

• সাদা এবং মাখনের মত

এখনই আপনার গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভব্য সময় শুরু ।

ডিম্বস্ফোটনের ঠিক আগে আপনি দেখবেন আপনার স্রাব-
• আরও বেশী ভিজা ভিজা হয়ে গেছে

• পরিষ্কার

• পিচ্ছিল – ডিমের সাদার মত

এখনি আপনার গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে উত্তম সময়।

শীঘ্রই আপনি দেখবেন যে আপনার স্রাব আবার ভিজা ভিজা এবং আঠালো হয়ে আসছে। এর থেকে ৩ দিন পর আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা অনেকাংশেই কমে যাবে।


সব পদ্ধতির সংমিশ্রণ

সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি তিন রকমের পদ্ধতিই ব্যবহার করেন। এতে আপনি আরও নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারবেন কখন আপনার ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে এবং কখন আপনার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশী।

কিছু চার্ট (chart) পাওয়া যায় বা আপনি একটি চার্ট বানিয়ে নিন । আপনার সব তথ্য আপনি ওই চার্টে বসিয়ে নিতে পারবেন এবং পুরো মাসিক চক্রে কি হল তা আপনি দেখতে পারেন এক ঝলকেই।

তাছাড়া আপনার কম্পিউটারে বা স্মার্ট ফোনে (smart phone) কিছু আপ্লিকেসান (application) ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে (download) নিতে পারেন যা আপনাকে এই পদ্ধতি ব্যাবহার করতে সাহায্য করবে।


এই পদ্ধতি কতটুক কার্যকরী ?

যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, এই পদ্ধতি প্রায় ৯৯% কার্যকরী। এর মানে প্রতি বছর প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারি ১০০ জন মহিলার মধ্যে মাত্র ১ জন গর্ভবতী হবেন। তবে এই পদ্ধতি দায়িত্ব নিয়ে চর্চা করতে হবে।

তারপরও মানুষ ভুল করে, ঠিক মত নিয়মাবলী মেনে চলে না, এবং আরও অন্যান্য সমস্যা হয়। তাই ধারণা করা হয় যে এই পদ্ধতি মাত্র ৭৫% কার্যকরী। এর মানে যদি ১০০ মহিলা এই পদ্ধতি ব্যাবহার করে, তাহলে তার মধ্যে ২৫ জন গর্ভবতী হওয়ার সম্ভবনা আছে।

আপনি যদি মন স্থির করে থাকেন যে আপনি প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যাবহার করবেন, তাহলে আপনাকে এমন একজন লোকের কাছ থেকে এই পদ্ধতি শিখতে হবে যিনি এই ব্যাপারে সব জানেন এবং দক্ষ। তারপর তার সাথে আলোচিত সব কথা এবং নিয়মাবলী সঠিকভাবে মেনে চলবেন। এই ভাবে আপনি অনাকাঙ্খিত গর্ভাবস্থার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন।

কারা এই প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যাবহার করতে পারেন?

বেশিরভাগ মহিলাই এই প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির ব্যবহার বা গর্ভনিরোধের জন্য শুধু মাত্র এই পদ্ধতির ব্যবহার সুপারিশ করা হয় না। আপনাকে অন্য পদ্ধতির কথা চিন্তা করতে হবে যদি –

• আপনি গর্ভবতী হলে আপনার নিজের জীবনের ঝুঁকি চলে আসবে। যেমন যদি আপনার অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ (uncontrolled high blood pressure) থাকে বা হৃদরোগ (heart disease) থাকে।

• আপনি যদি অ্যালকোহল গ্রহন করেন, নেশা করেন বা এমন কোন ঔষধ খান যা খেলে গর্ভের ভ্রূণের বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভবনা আছে। তখন যদি আপনি গর্ভবতী হন, তাহলে আপনার গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্য সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়।

• যদি আপনার মাসিক অনিয়মিত হয়। তখন আপনি এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন না কারণ আপনি সঠিক ভাবে গননা করতে পারবেন না আপনার ডিম্বস্ফোটনের (ovulation) সময় কখন। অনিয়মিত মাসিক বিভিন্ন কারণে হতে পারে। বয়সের কারণে, যদি চাপে থাকেন, হঠাৎ যদি আপনার ওজন বেড়ে যায় বা ওজন কমে যায়, যদি বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেন, অথবা আপনার থাইরয়েড (thyroid) যদি বেশি কাজ করে – এই সমস্যাকে আমরা বলি হাইপোথাইরয়েডিস্ম (hyperthyroidism)।

• যদি আপনার কোন অসুস্থতা হয়ে থাকে যা আপনার ডিম্বস্ফোটনের সময় (ovulation) শারীরিক ইঙ্গিতগুলো উল্টাপাল্টা করে দিবে। যেমন – Pelvic Inflammatory Disease, যে কোন রকমের যৌনরোগ, অথবা জীবাণু দ্বারা bacterial vaginosis. এই অসুস্থতা ভালো না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আপনি আবার এই পদ্ধতি ব্যাবহার করতে পারবেন।

• আপনার কোন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা (বা কোন শারীরিক সমস্যা) থেকে থাকে যা আপনার ডিম্বস্ফোটনের সময় যে শারীরিক ইঙ্গিত ও লক্ষন থাকে তাকে পরিবর্তন করে দেয়। যেমন – যদি আপনার যকৃতের সমস্যা (liver disease) থাকে, থাইরয়েড (thyroid) যদি বেশি কাজ করে বা কম কাজ করে, আপনার যদি জরায়ুর মুখের ক্যানসার থাকে (cervical cancer) বা আপনার Polycystic Ovarian Syndrome থাকে।


কি কি সমস্যা থাকলে আপনার ডিম্বস্ফোটনের ইঙ্গিতগুলো পরিবর্তন হয়ে যাবে তা জেনে নিন

• আপনি এমন কোন ঔষধ খাচ্ছেন যা আপনার জরায়ুর মুখ থেকে স্বাভাবিক স্রাব ভাঙাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এতে আপনার কখন ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে, তা আপনি সঠিক বুঝতে পারবেন না। যেমন Lithium – এই ঔষধটি বিভিন্ন রকম জটিল মনোরোগের চিকিৎসা যেমন bipolar disorder এবং বিষণ্ণতার চিকিৎসা করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

• আপনার যদি যৌনরোগ হওয়ার সম্ভবনা থাকে – যদি আপনার একাধিক যৌন সঙ্গী থাকে।

আপনার ডিম্বস্ফোটনের সময় যে যে সমস্যা হলে আপনি আপনার শারীরিক ইঙ্গিতগুলো বুঝতে পারবেন না সেইগুলি হল –
• যদি আপনার মাসিক অনিয়মিত হয়

• যদি আপনি কিছুদিন আগে গর্ভনিরোধ পিল খাওয়া বন্ধ করে থাকেন

• যদি আপনার কিছু দিন আগে গর্ভপাত হয়ে থাকে

• যদি আপনি কিছু দিন আগে সন্তান প্রসব করে থাকেন এবং এখন সন্তানকে স্তন্যপান করাচ্ছেন

• যদি আপনি নিয়মিত ভ্রমন করেন বিভিন্ন time zone দিয়ে

• যদি আপনার যোনীতে কোন রোগ থাকে যেমন thrush বা আপনার যদি কোন যৌনরোগ থাকে


আরও অন্যান্য সমস্যা যা আপনার শরীরের প্রাকৃতিক সব লক্ষন নষ্ট করবে –

• আপনি কিভাবে এবং কখন আপনার নিজের শরীরের তাপমাত্রা নিচ্ছেন
• যদি আপনি মদ পান করেন
• যদি কোন নির্দিষ্ট ঔষধ খান
• অসুস্থ থাকেন
• কোন দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়

এই পদ্ধতির কিছু সুবিধা এবং অসুবিধা

সুবিধা
• এটির কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই

• এটি সব ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের পক্ষে গ্রহণযোগ্য

• বেশিরভাগ মহিলারাই এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন্ন যদি তারা একজন দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে এই পদ্ধতি শেখেন এবং সঠিকভাবে মাসিক চক্রের দিনগুলো গননা করতে পারেন।

• একবার আপনি এই পদ্ধতি শিখে নিলে আপনার আর কোন স্বাস্থ্য কর্মীর সাহায্য লাগবে না।

• প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী আপনি ব্যবহার করতে পারেন। আপনি চাইলে এই পদ্ধতি গর্ভবতী হওয়ার জন্য ব্যবহার করতে পারেন এবং গর্ভনিরোধ করতেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন।

• এই পদ্ধতিতে কোন রাসায়নিক উপাদান বা কোন বস্তু-জাতীয় জিনিস ব্যবহার করতে হয় না।

• আপনাকে এই পদ্ধতি শিখিয়ে দিবে কোন স্রাব স্বাভাবিক ও কোন স্রাব অস্বাভাবিক। তখন আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন আপনার যোনিপথে যদি কোন ইনফেকশান (infection) হয়।

• এই পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য আপনার সঙ্গীর মতামত ও সম্পৃক্ততা দরকার আছে। তাই এই পদ্ধতি ব্যবহারে আপনাদের ঘনিষ্ঠতা ও বিশ্বাস বাড়বে।

অসুবিধা
• প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি আপনাকে যৌনরোগ যেমন chlamydia এবং HIV থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

• যখন আপনার গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে বেশি সমস্যা তখন আপনাকে সহবাস এড়িয়ে চলতে হবে, বা আপনাকে কোন অস্থায়ী গর্ভ নিরোধ পদ্ধতি যেমন কনডম (condom) ব্যবহার করতে হবে। কোন কোন দম্পতির তাই এই পদ্ধতি মেনে চলতে কষ্ট হয়।

• আপনি যদি এই পদ্ধতি ব্যাবহার করেন তাহলে আপনাকে সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে বেশ কিছু দিন, যা আপনার মাসিক চক্রের উপর নির্ভর করে মাঝে মাঝে ১৬ দিন পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

• এটি অন্যান্য গর্ভনিরোধ পদ্ধতির চেয়ে অনেক কম কার্যকরি। এই পদ্ধতি সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না তার নিশ্চয়তার উপর নির্ভর করে দেখা গেছে যে প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যাবহারকারি প্রতি ৪ জন মহিলা মধ্যে ১ জন গর্ভবতী হয়ে পারেন।

• আপনি এবং আপনার স্বামীর অব্যাহত প্রতিশ্রুতি ও সহযোগিতা ছাড়া এই পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব না।

• মাসিক চক্রের কোন সময় আপনার গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভবনা সেইটি সঠিক ভাবে বুঝতে বেশ কয়েকটি মাসিক চক্র লেগে যাবে। তাছাড়া আপনার কি রকম স্রাব ভাঙছে, তার রকম ও ধরণ বুঝতে এবং আপনার নিজের শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তন খেয়াল রাখা শিখতে আপনার প্রায় আরও ২-৩ মাসিক চক্র লেগে যেতে পারে। সেই সময় আপনাকে কোন অস্থায়ী গর্ভনিরোধ পদ্ধতি যেমন কনডম ব্যবহার করতে হবে।

• আপনাকে আপনার শারীরিক ইঙ্গিতগুলো প্রতিদিন খেয়াল করে, দেখে, লিখে রাখতে হবে।

• আপনার মাসিক যদি সবসময় অনিয়মিত থাকে, তাহলে আপনি এই পদ্ধতি আপনার জন্য উপযুক্ত নয়।

• আপনি চাপে থাকলে, অসুস্থ হলে, ভ্রমন করলে, জীবনধারার কারণে বা আপনি যদি কোনরকম হরমোন জাতীয় ঔষধ খান, তাহলে গর্ভবতী হওয়ার শারীরিক ইঙ্গিতগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়। ইমার্জেন্সি গর্ভ নিরোধ পিল খেলেও এই সমস্যা হয়। আপনি যদি ইমার্জেন্সি গর্ভনিরোধ পিল খেয়ে থাকেন, তাহলে দুই মাসিক চক্র পার হয়ে যাওয়ার পর আপনি আবার এই প্রাকৃতিক-উপায়ে-পরিবার-পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যাবহার শুরু করতে পারবেন.

Lactational Amenorrhoea Method (LAM)
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের মাসিক বন্ধ থাকে। এটিকে Lactational Amenorrhoea বলে। তাই এই পদ্ধতি গর্ভনিরোধ হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এই পদ্ধতির নাম Lactational Amenorrhoea Method (LAM)

আপনি যখন শিশুকে স্তন্যপান করছেন, তখন আপনার গর্ভধারণের সবচেয়ে সম্ভব্য সময়ে যে শারীরিক ইঙ্গিত হবে তা সঠিক হবে না হবে।
যেই মহিলারা সন্তানকে স্তন্যপান (বা শুধুমাত্র স্তন্যপান) করাচ্ছেন, প্রসবের পর প্রথম ছয় মাস এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। তবে এই পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য কিছু শর্ত আছে।

• আপনার সন্তান প্রসবের পর কোন মাসিক এই পর্যন্ত হইনি।

• আপনি আপনার সন্তানকে বুকের দুধ এবং শুধু মাত্র বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। তার মানে আপনার সন্তান শুধু বুকের দুধ খাচ্ছে বা প্রধানত বুকের দুধই খাচ্ছে এবং সামান্য অন্য ফর্মুলা দুধ খাচ্ছে।

• আপনার বাচ্চার বয়স ৬ মাসের কম।

যদি এই পদ্ধতি সঠিক ভাবে এবং সংগতিপূর্ণ ভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে যেই মহিলারা এই পদ্ধতি ব্যাবহার করছে, তাদের মধ্যে প্রতি ২০০ জনে মাত্র ১ জন গর্ভবতী হতে পারেন। তবে এই পদ্ধতি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয়। আপনি আপনার সন্তানকে বুকের দুধ ছাড়া আর কোন খাবার দিবেন না। তাহলে আপনার বুকের দুধের পরিমাণ কমে যাবে।

LAM এর কার্যকারিতা কমে যায় যদি –

• আপনি শিশুকে বুকের দুধ না খাইয়ে তাকে অন্য খাবার বা পানীয় দেন।

• আপনার সন্তানের বয়স ছয় মাস হলে।

সন্তান প্রসবের পর মাসিক হওয়ার আগেই আপনি আবার গর্ভধারন করতে পারেন। এর কারণ আপনার মাসিক শুরু হওয়ার ২ সপ্তাহ আগে আপনার ডিম্বস্ফোটন হয়। স্তন্যপান, LAM, এবং গর্ভনিরোধের আরও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতির ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আপনার নিকটস্থ স্বাস্থ্য কর্মী বা আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। আপনি আরও জানুন বুকের দুধ ও baby Guide।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 186 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ