গোপালগঞ্জে হচ্ছে ওষুধ তৈরির বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান

Print

১৯৬২ সালে প্রথম যাত্রা শুরু করে ইডিসিএল। তখন এটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে জিপিএল (গভর্নমেন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড) নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে এর নামকরণ হয় ফার্মাসিউটিক্যালস প্রোডাকশন ইউনিট (পিপিইউ)। ১৯৮৩ সালে দেশীয় ওষুধের চাহিদা মেটাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইডিসিএল নামে এর যাত্রা শুরু হয়।

ইডিসিএলের সার্বিক বিষয় নিয়ে এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অধ্যাপক ডা. এহসানুল কবির জগলুলের সাক্ষাৎকার –
প্রশ্ন : ইডিসিএলের উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ওষুধ কারখানার নির্মাণ কাজ চলছে গোপালগঞ্জে। বর্তমানে এ কারখানার অগ্রগতির কী অবস্থা? সম্ভবত ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এ কারখানা উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে।

ইডিসিএল এমডি : দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ওষুধ কারখানা হচ্ছে গোপালগঞ্জে। এ প্রকল্পটির তিনটি ভাগ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে এরিয়া ডেভেলপ করা, দ্বিতীয়টি কনস্ট্রাকশন এবং তৃতীয়টি হলো মেশিনারিজ। এর মধ্যে কনস্ট্রাকশনের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩০ শতাংশ খুব শিগগিরই শেষ হবে বলে আশা করছি। আগামী বছর আগস্টের মধ্যে পরীক্ষামূলক চালু করতে পারব। গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত সিজিএমপি (কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস) অনুসরণ করে দেশের সর্ববৃহৎ ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণ কাজের পর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপন করা হবে। ওষুধ শিল্পটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় অনেক কিছু বিবেচনায় আনতে হয়। প্রথমেই ট্রাইল প্রোডাকশন করতে হয়। ৩ থেকে ৬ মাস লেগে যায় ট্রাইল প্রোডাকশনে। এতে ফ্যাক্টরির অবস্থায় ওষুধের কোয়ালিটিসহ অনেক কিছু দেখতে হয়। বাজারে দেয়ার জন্য যে ওষুধ তৈরি হবে, সেটা আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের শেষের দিকে হবে। ইনশাআল্লাহ ডিসেম্বরের দিকে ওষুধ সাপ্লাই দিতে পারব।
প্রশ্ন : এ কারখানায় কী কী ওষুধ তৈরি হবে?
ইডিসিএল এমডি : সিজিএমপি অনুসরণ করে এ প্রতিষ্ঠানে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী (পিল ও ইনজেকশন), বিভিন্ন ধরনের ইন্ট্রাভেনাস (আইভি) ফ্লুইড এবং পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদিত হবে। এছাড়াও আয়রন ট্যাবলেট, হরমোনাল প্রোডাক্ট উৎপাদন হবে।
প্রশ্ন :কারখানার ব্যয় কেমন এবং কতজন লোকের কর্মসংস্থান হবে?
ইডিসিএল এমডি : এ কারখানার ব্যয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা হবে। সর্বমোট কর্মসংস্থান হবে ৭০০ লোকের। তবে একসঙ্গে ৭০০ জনকে নিয়োগ দেয়া হবে না। ফেইজ বাই ফেইজ লোক নেয়া হবে। প্রথম ফেইজে ৩০০ থেকে ৩৫০ লোক নেয়া হবে। এটা প্রোডাক্টের ডিমান্ডের ওপর নির্ভর করবে। বাজারে আমরা কী রকম রেসপন্স পাব, সেটার ওপরও নির্ভর করছে। আর এটা তো (ইডিসিএল) হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকার কীভাবে নেবে, সেটা আবার সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করবে।
প্রশ্ন : খোলা বাজারে কি এ প্রতিষ্ঠানের ওষুধ বিক্রি হবে না? 
ইডিসিএল এমডি : খোলাবাজারে বিক্রি হতে পারে। কারণ, আমরা শ্রীলঙ্কায় ওষুধ রফতানি করছি। আমাদের ওষুধ বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে।
প্রশ্ন : বিগত বছরগুলোতে এ প্রতিষ্ঠানের সফলতা কেমন?
ইডিসিএল এমডি : আমি যখন এ প্রতিষ্ঠানে যোগদান করি, প্রথমত আমার যে কাজ ছিল, সেটা হলো প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা আনা। কারণ, বেশকিছু সেক্টরে শৃঙ্খলা ছিল না। সেসব সেক্টরকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসি এবং অহেতুক খরচ কমিয়ে আনি। অতীতে কেনাকাটার বিষয়ে যথারীতি নিয়ম-কানুন মানা হয়নি। আমি আসার পর এসব বিষয়ে কোনো ছাড় দিইনি। আমার প্রথম কাজই ছিল প্রতিষ্ঠানকে সাশ্রয় এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনা। এ কাজগুলো আমি সফলভাবে করতে পেরেছি। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা এই প্রথমবারের মতো ২৮ কোটি টাকার এফডিআর করতে পেরেছি।
দ্বিতীয়ত, এখানে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার জন্য আমি নির্বাচিত সিবিএ’কে আমন্ত্রণ জানাই, যাতে তাদের সঙ্গে আমি বার্গেনিং করতে পারি। তৃতীয়ত, আমার ওপর যে জিনিসটি বর্তায় সেটি হলো পে-স্কেল। আল্লাহর রহমতে এ জিনিসটিও আমি সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছি। পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর কর্মরতদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। চতুর্থ হলো, আমি একটি বিশাল সমস্যায় পড়েছিলাম। সেটি হলো বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটা টানপড়েন অবস্থা চলছিল। পরে আমরা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি সুন্দর সমাধানে আসতে পারি। এরপরই বিশ্বব্যাংক আমাদের বিষয়ে ভালো ধারণা নেয় এবং বিনা টেন্ডারে ১২০ কোটি টাকার অর্থ দেয়। আমাদের সুনাম এত ভালো হয় যে দুইবার তদন্ত আসে। তারা আমাদের বলে, তোমাদের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে। সুতরাং টেন্ডারের কোনো প্রয়োজন নেই।
আমার সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আমি এসে দেখি গোপালগঞ্জের প্রজেক্টটা ২০১১ সালে একনেকে পাস হয়। অথচ ২০১৪ পর্যন্ত কোনো কাজই হয়নি। আমি এসে ২০১৫ সালের মে মাসে এর কাজ শুরু করি। এর মধ্যে আমি ৭০ ভাগ কাজ শেষ করি।
আমি সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির (এসএমসি) সঙ্গে ২ বছরের চুক্তি করি। সে চুক্তি অনুযায়ী এসএমসি আমাদের কাছ থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী রেগুলার ভিত্তিতে ক্রয় করছে।
আমাদের আরেকটা প্রজেক্ট ছিল ১৫০ কোটি টাকার। ১১ বছরের সেই প্রজেক্ট যে কোনো কারণেই হোক ২০০৩ সাল থেকে বন্ধ ছিল। বন্ধ মানে সেখানে একেবারে ধীরগতি চলে আসে। আমি এসে ওই প্রজেক্টটি চালু করি। আশা করছি, আগামী মার্চ মাসে এ প্রজেক্টে ফোর্থ জেনারেশনের ‘সেফালোস্পোরিন’ অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হবে। সরকার আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে তা বিনামূল্যে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বিতরণ করবে।
প্রশ্ন :আপনার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের জন্য কী করেছেন?
ইডিসিএল এমডি : আমাদের শ্রমিকদের জন্য ইডিসিএলে কোনো চিকিৎসক ছিল না। আমার চোখের সামনে দুই শ্রমিক মারাও গেছেন। একজন চিকিৎসক থাকলে হয়তো বাঁচানো যেত। আমি এসে এখানে একজন চিকিৎসক নিয়োগ দিই। পরে তার অধীনে আরও তিনজন সহকারী দেয়া হয়।

 

প্রশ্ন :আপনার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা কি তাদের পোশাক পাচ্ছেন? সিবিএ’র কোনো অফিস আছে কি?
ইডিসিএল এমডি : আমি যোগদানের পর আরেকটি জিনিস খেয়াল করি, সেটা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ড্রেস ও জুতা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের পোশাক ও জুতা দিতে হয়। এখানে এসবের কোনো সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা ছিল না। পোশাকের বিষয়ে সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিবিএ’র কোনো অফিস ছিল না। আমি এসে একটি সুন্দর অফিস করে দিয়েছি। তবে সিবিএ’র আইন অনুযায়ী ফ্যাক্টরির ভেতরে তাদের কোনো অফিস রাখতে পারবে না। ফ্যাক্টরির ভেতরে আড্ডা মারা বা চা-সিগারেট খেতে পারবে না। আমি তাদের জন্য ফ্যাক্টরির বাইরে একটি অফিস করে দিই। মধুপুরে জঙ্গলের মধ্যে একটি ফ্যাক্টরি ছিল। সেখানে শ্রমিকরা মানবেতর জীবন-যাপন করতেন। তাদের থাকা বা খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মধুপুর থানা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার ভেতরে। আমি সেখানে একটি ডরমেটরির ব্যবস্থা করি। রোজার সময় ভোর রাতে আমাদের শ্রমিকদের সাহরি খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমার নির্দেশে সাহরি খাওয়ার ব্যবস্থা হয়।
প্রশ্ন : আপনার প্রতিষ্ঠানের এতকিছুর পরিবর্তন আনতে গিয়ে কখনও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন কি?
ইডিসিএল এমডি : লেবার প্রতিষ্ঠানে সঠিকভাবে কাজ করতে গেলে কিছু না কিছু হুমকি মোকাবিলা করতেই হয়। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট মানে ম্যানেজ করা। ম্যানেজমেন্ট ইজ নট অর্ডার। যদি কোনো কর্মকর্তার বেসিক চরিত্রই দেখা যায় অন্য রকম, সেটাকে অর্ডার দিয়ে ঠিক করা যাবে না। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। কারণ, এ ধরনের কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা সাধারণত উগ্র স্বভাবের হয়ে থাকেন। তাকে অর্ডার দিলে তিনি আরও উগ্র হয়ে যাবেন। তাকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তার খারাপ কর্মগুলোর বিষয়ে বলতে হবে।
প্রশ্ন : আপনার এখানের শ্রমিকদের কোনো বদলির ব্যবস্থা আছে কি?
ইডিসিএল এমডি : অতীতে কী অবস্থা ছিল, তা আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর অনেক শ্রমিককেই বদলি করেছি।
প্রশ্ন : প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে আসার কথা ছিল। শেয়ারবাজারে কি আসবে?
ইডিসিএল এমডি : এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি বলেছে, এ মুহূর্তে আমাদের শেয়ারবাজারে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এর চেয়ারম্যান হচ্ছেন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়। কোম্পানি শেয়ার হোল্ডারে গেলে কিন্তু ফেইস করতে হবে। মন্ত্রী মহোদয় তো ফেইস করতে পারবেন না। এ প্রতিষ্ঠান সরকার তৈরি করেছে, আবার সরকারই এ প্রতিষ্ঠান থেকে কিনে নিচ্ছে। তাই আমাদের লাভ কিন্তু খুবই সীমিত।
প্রশ্ন : আপনার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কি ৬ মাসের জন্য বন্ধ ছিল? সেটা কী কারণে?
ইডিসিএল এমডি : এটা ভুয়া খবর। এক মিনিটের জন্যও বন্ধ হয়নি।
প্রশ্ন :সরকারের কাছে আপনাদের কী চাওয়ার আছে?
ইডিসিএল এমডি : আমরা চাই ‘পারমানেন্ট ওয়্যার হাউস’। আমরা ভাড়া করে চালাই। আর এটার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা চলে যায়। আমরা যদি সরকারের কাছে একটা জমি পাই, তাহলে সেখানে ‘ওয়্যার হাউস’ তৈরি করা হতো। চিকিৎসা কেন্দ্রের জন্য যদি জমি পাওয়া যেত, তাহলে তিন-চারটি বেড দিয়ে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করা যেত। অসুস্থ শ্রমিকদের আর হাসপাতালে পাঠাতে হতো না। আমাদের চিকিৎসা কেন্দ্রেই সেবা দেয়া যেত। আমাদের ঢাকা ফ্যাক্টরিটা অনেক পুরনো। এসেনশিয়াল ড্রাগের এ ফ্যাক্টরিটা রিসার্কিলিং প্রয়োজন। মোট কথা, আমাদের জমির প্রয়োজন।
প্রশ্ন : অপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য অপনাকে ধন্যবাদ।

ইডিসিএল এমডি :আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1917 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ