ঘর বাংলাদেশে উঠোন ভারতে

Print

%e0%a6%98%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87-%e0%a6%89%e0%a6%a0%e0%a7%8b%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a7%87সীমান্ত পিলার দুই দেশের জানান দিলেও বাংলাদেশ ও ভারত একাকার হয়েছে সাতক্ষীরার হড়দহ ও ভারতের চব্বিশ পরগনার পানিতরের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের।
কারও ঘর বাংলাদেশে হলেও উঠোন পড়েছে ভারতে, আবার কারও গোয়াল ঘর বাংলাদেশে শোবার ঘর পড়েছে ভারতের মধ‌্যে। কাজকর্মেও নেই তাদের দেশভাগের ভেদরেখা। বাংলাদেশি চাষী আবাদ করছেন ভারতীয় মালিকের জমি।

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের এই এলাকার অধিবাসীদের কাছে দুই দেশের অস্তিত্ব যেন ওই সীমানা পিলার আর চেকপোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে তা শুধু নিজেদের এলাকার মধ‌্যে, ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেই বিপত্তি। এজন‌্য স্বল্পকালীন ভিসা দেওয়ার দাবি তুললেন তারা।
বৃহস্পতিবার হড়দহে কথা হয় ৭৫ বছর বয়সী জাম্মাদ আলী গাজীর সঙ্গে। দশ বছর বয়সে প্রথম বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পিলার দেখলেও ‘বর্ডার লাইন’, ‘সীমান্ত পিলার’ এসবের তাৎপর্য তার কাছে খুব একটা নেই বলে জানান তিনি।
বাড়ির ডান অংশ বাংলাদেশে বাড়ির ডান অংশ বাংলাদেশে জাম্মাদ গাজীর বাড়িটি বাংলাদেশে হলেও নামাজ পড়ার জন্য তাকে যেতে হয় ভারতে। কারণ বাংলাদেশের সীমানার ভেতরের মসজিদটি কিছুটা দূরে।
এভাবে এপার-ওপার যাওয়া আসা থাকলেও দুই দেশ হওয়ার কারণে নিজের ইচ্ছামতো স্বজনদের দেখতে যেতে না পারার কথা জানালেন তিনি।
“আমার পাঁচ ছেলের পাঁচজনই ইন্ডিয়ায় থাকে। কাজের সুবিধের জন্য তারা ওকিনি থাকে। ৪০ বছর তাদের সঙ্গে দিখা হয় না। আমার বউও চলি গেছে ২০ বছর,” সাতক্ষীরার আঞ্চলিক ভাষায় বলেন জাম্মাদ গাজী।
পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা লাগিয়ে ভারত যাওয়ার চেষ্টা করেন না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি একা থাকি। কে করি দ্যাবে? যদি পারমিট (স্বল্পকালীন ভিসা) থাইকতো তবে ঘুরি আসতাম।”
সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে কথা হয় নাসিমা মণ্ডলের (৩৪) সঙ্গে। শ্বশুরবাড়ি সাতক্ষীরা সদর থেকে হড়দহে বাবার বাড়িতে এসেছেন তিনি। বাড়ির ঘরগুলো বাংলাদেশে পড়লেও উঠানের একটা অংশ পড়েছে ভারতে।
নাসিমা বলেন, “ছোট বেলা থেকেই এমন দেখি আসতিছি। আমরা বাংলাদেশের লোক। ওপারে (ভারতের) আত্মীয় আছে। বেশি দূর যেতি পারিনে। তবে দুই দেশ মনে হয় না। সবাইতো অনেকদিনির পরিচিত।”
সেখানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিজিবি-বিএসএফ সদস‌্যরা স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ আচরণ করেন বলে জানান বাসিন্দারা।
ভারতের নাগরিক আমারুল্লাহ গাজী বলেন, “আমার প্রায় সব বন্ধু ওই এলাকার। মাঠে কাজ করতি করতি কথা হয়। আড্ডা মারি। বর্ডারের লাইন দেখি মনে হয় দুটো দেশ। কিন্তু সবতো একই।”
একই কথা বলছিলেন রজব আলী মোল্লা (৬০)। ভারতের এই নাগরিক বলেন, “একসময় বিয়ে শাদী হতো দুইপারের মানুষের মধ্যে। এখন আর হয় না। কিন্তু এলাকায় ঘুরলেতো আর সমস্য নেই। বেশি দূর যাইনে। এলাকার লোকজন চলি গিলি বিডিআর ফেরত পাঠায় দেয়। বিএসএফও বাংলাদেশের লোকদের সাহাইয্য করে। পারমিট থাকলি ভালো হত।”
একই এলাকার জাকির আলী গাজীর (৫০) গোয়াল ঘরের একটা অংশ পড়েছে বাংলাদেশে, আর থাকার ঘর ভারতে।
বাড়ির বাঁ অংশ ভারতে বাড়ির বাঁ অংশ ভারতে “ছোট বিলাততে এরকম দেখি। আলাদা দেশ মনে হয় পোস্ট-পিলার দেখলি (সীমান্ত পিলার-চেক পোস্ট)। ছোট বিলায় খুব যাতাম। একন কম যাই,” বলেন তিনি।
দুই দেশে বাড়ির অংশ পড়ায় সমস্যা হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নাহ, সমস্যা কীসের? একটুখানি জমিতো। তবে ইকেনের তে (এখান থেকে) পারমিট থাকলি ভালো হইত।”
জয়নাল গাজী (৪২) পেশায় কৃষি শ্রমিক। বাড়ি বাংলাদেশে হলেও বর্গা কাজ করেন ভারতীয় মালিকের জমিতে।
তিনি বলেন, “কাজ করতি অসুবিধে হয় না তবে পারমিট থাকলি ভালো হতো। দু-চারদিন কাজ করি চলি আসতাম।”
পানিতর বিএসএফ বর্ডার আউট পোস্টের (বিওপি) কোম্পানি কমান্ডার অশোক হালদার বলেন, “এই এলাকার বর্ডার লাইন যেহেতু জিগজ্যাগ (আঁকাবাঁকা) সেজন্য বিজিবি-বিএসএফ দুই বাহিনীই এখানে মানবিকতাকে প্রাধান্য দেয়।
‘সীমান্ তপিলার’কোনো অর্থ বহন করে না৭৫ বছর বয়সী জাম্মাদ গাজীর কাছে। ‘সীমান্ তপিলার’কোনো অর্থ বহন করে না৭৫ বছর বয়সী জাম্মাদ গাজীর কাছে। “এখানে দুই ফুটের মধ্যে দুটো দেশ। নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা দুই বাহিনী কোনো ছাড় দেই না। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনে যৌথভাবে আমরা সমস্যার সমাধান করি।”
বিএসএফ’র ১৪৪ ব্যাটালিয়ন মোতায়েন রয়েছে এই এলাকায়।
সীমান্তের বাসিন্দাদের স্বল্প সময়ের ভিসা প্রত‌্যাশার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার বিক্রম শর্মা বলেন, দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলে এটার ব্যবস্থাপনা তারা করতে পারবেন।
“বিজিবির সঙ্গে বিএসএফের বর্তমান সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হলে আমরা দুই বাহিনী মিলে এটা তদারক করতে পারব। আর এটা যদি হয় তাহলে এই সীমান্ত এলাকার উভয় দেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে।”

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 181 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ