চট্টগ্রামে ৩১৪ ইটভাটার রাজস্ব ‘গিলে খাচ্ছে’ অসাধু চক্র

Print

%e0%a6%9a%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a7%a9%e0%a7%a7%e0%a7%aa-%e0%a6%87%e0%a6%9f%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b0চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে উঠা ৩১৪ ইটভাটা থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর অবৈধভাবে চলছে এসব ইটভাটা। এ সুযোগে নানা রকম ভয়-ভীতি দেখিয়ে এসব ইটভাটার মালিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু চক্র।
এরমধ্যে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সংবাদপত্রের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসী চক্র রয়েছে। আবার এসব অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে চক্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দলাদলি, খুনোখুনির ঘটনাও। নিজেদের আড়াল করতে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন জড়িয়ে রয়েছে মিথ্যা মামলা বাণিজ্যে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ে সরকারি তোড়জোড় শুরু হলে এ নিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ শুরু করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন। তবে সেদিক থেকে নজর সরিয়ে জেলা প্রশাসন এখন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায়ে মাঠে নেমেছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, পটিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলায় ৪০৮ টি ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে বৈধ ইটভাটার সংখ্যা মাত্র ৯৪টি। অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা ৩১৪টি। এসব ইটভাটা থেকে সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে এ ব্যাপারে হালনাগাদ কোনো তথ্যও নেই।
২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ইটভাটার সংখ্যা ৩৪৯টি। এরমধ্যে উন্নত প্রযুক্তির কিলনের সংখ্যা ৪৩টি। আর ফিক্সড চিমনি কিলনের সংখ্যা ৩০৬টি।
পরিবেশ আইনে বলা হয়েছে, ইটভাটাকে পরিবেশ উপযোগী করতে ভাটার চিমনির উচ্চতা ১২০ ফুট এবং চিমনি তৈরিতে জিগজ্যাগ কিলন, হাইব্রিড হফম্যান কিলন, ভারটিক্যাল স্যাফট কিলন, টানেল কিলন পরিবেশ সম্মত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ২০১৩ সালের ৫৯নং আইনে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত্র আইনের ৪নং ধারায় লাইসেন্স ছাড়া ইট তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে, কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করিতে পারিবেন না।’
এছাড়া ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইনের ৮ ধারায় রয়েছে, আবাসিক, জনবসতি, সংরক্ষিত, বাণিজ্যিক এলাকা, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষি জমি, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন সদরের এক কিলোমিটার ও বনভূমি, জলাভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দুই কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিতের বিধান রয়েছে।
অথচ আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে আবাসিক-জনবসতি এলাকা, ফসলি জমি, বনভূমি ও নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বহু ইটভাটা। এসব এলাকায় ইটভাটা স্থাপনে কড়াকড়ি বিধিনিষেধ থাকায় জেলা প্রশাসন ইটভাটার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিতে পারছে না। কিন্তু জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বনবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশসহ অসাধু চক্রের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ ইটভাটা চলে আসছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর সাব্বির রহমান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক ইটভাটার অনুমতি বা লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন করেন। কিন্তু লাইসেন্স যেহেতু নেই তাই অবৈধ ইটভাটা থেকে সরকারের কোনো রাজস্ব আসে না। তবে জেলা প্রশাসন অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধের জন্য সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারদের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ে সরকারি তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ফলে জেলা প্রশাসন এসব অবৈধ ইটভাটা থেকে গত মৌসুমে ৫২ লাখ তিন হাজার ৮৫ টাকা ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে। আর চলতি মৌসুমে ধরা হয়েছে ৫৯ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৫ টাকা।
ইটভাটার মালিকদের ভাষ্য, সরকারি আইনে এতগুলো ইটভাটা অবৈধ। যদি বৈধ করা হত তাহলে সরকার রাজস্ব পেত। অবৈধ হওয়ার কারণে সরকারি রাজস্বের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি টাকা আমাদের গচ্চা দিতে হয়। বৈধ হলে সরকারি রাজস্ব যারা আদায় করত তারাই এখন এসব টাকা গিলে খাচ্ছে।
ইটভাটার একাধিক মালিকের অভিযোগ, ইটভাটা বন্ধ বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের ভয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ, পত্রিকায় সংবাদের প্রকাশের ভয়ে স্থানীয় সাংবাদিক, স্থানীয় প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আমাদের কাছ থেকে টাকা নেয়। গত ৮-১০ বছর ধরে সমিতির নামে এসব টাকা আদায় করে ভাগ-বাটায়োরা চলছে। এছাড়া অবৈধ হওয়ার কারণে আইনি সহয়তা ঝামেলার ভয়ে সন্ত্রাসীদেরও মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আইনে কড়াকড়ির কারণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ, কৃষি অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দিলেও ইটভাটা পরিচালনায় কোনোরকম বাধা দেন না। যখন কোনো পত্রিকায় রিপোর্ট হয়, বা কেউ কোনো অভিযোগ করে তখন বিভিন্ন অজুহাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান বা মামলার ভয় দেখিয়ে জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি নিজেদের অর্থের অংকটা বাড়িয়ে নেয়। সেই ভয়ে সংবাদপত্রের স্থানীয় প্রতিনিধিদেরও মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়।
এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাটাইমসকে বলেন, লাইসেন্স না থাকায় ইটভাটা থেকে সরকার প্রতিবছর বড় ধরনের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লাইসেন্স থাকলে প্রতিবছর নবায়ন হতো। নবায়ন না হলে তো আর রাজস্ব আদায় হবে না। এ সুবাধে অসাধু চক্র লাভবান হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মকবুল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ইটভাটা নিয়ে অনেক মামলা রয়েছে। এছাড়াও সংশোধিত আইনে চলতি বছরের জুনের মধ্যে অবৈধ ইটভাটা সরিয়ে নেয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। এরপর অবৈধভাবে ইট পোড়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন অসাধু চক্রও সরকারি রাজস্ব গিলে খাওয়ার সুযোগ পাবে না বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 41 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ