জীবন বাজি রেখে যানজট নিরসন

Print

জীবন বাজি রেখে যানজট নিরসন ,পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয় মানুষের গালাগালি ময়মনসিংহে ভোর থেকে শুরু হয় ট্রাফিক কনস্টেবলদের জীবন যুদ্ধ

জীবন বাজি রেখে যানজট নিরসন ,পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয় মানুষের গালাগালি
ময়মনসিংহে ভোর থেকে শুরু হয় ট্রাফিক কনস্টেবলদের জীবন যুদ্ধ

ময়মনসিংহ নগরীতে বর্তমানে ৫ লক্ষ মানুষের বাস। নগর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ট্রাফিক সিস্টেম। প্রতিদিন লাখো মানুষের কর্মস্থল ও আপন গন্তব্যে সঠিক সময়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ বিভাগের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আর এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে ময়মনসিংহ ট্রাফিক পুলিশ । ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন চৌকস ট্রাফিক কনস্টেবলগণ।
নিত্যদিন ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া , ব্রীজ মোড়, গাঙ্গিনারপাড়সহ বিভিন্ন মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, যানচলাচল স্বাভবিক রাখতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ট্রাফিকের কনস্টেবলগণ ।  প্রখর রৌদ্র , ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাতে লাঠি নিয়ে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন যানচলাচল। তীব্র যানজটকালে হাতের লাঠি যখন সজোড়ে বাড়ি দেয়া হয় দায়ী ব্যাটারি চালিত অটো বাইক, সিএনজি চালিত অটো রিকশা আর প্যডেল চালিত রিকশার উপর , মুহুর্তেই যানজট পরিস্থিতি চলে আসে ট্রাফিক পুলিশদের হাতে ।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ডিউটি করার কারণে ট্রাফিক কনস্টেবলদের জয়েন্ট পেইন, হাঁটু ফুলা, অস্টিও আর্থাইটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে হয়। এছাড়া দিনের পর দিন রাস্তায় ধূলাবালি, কালো ধোঁয়া আর শব্দদূষণের মধ্যে ডিউটি করতে গিয়ে শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগ, অ্যাজমা, পাইলস, জন্ডিস, নাক কান গলার সমস্যা, ঘন ঘন পেটের পীড়ার মতো রোগ হয়ে পড়ে ট্রাফিক পুলিশের নিত্য সঙ্গী।

দায়িত্বরত কনস্টেবলরা জানান, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ পুরো বিষয়টাই ব্যবস্থাপনার বিষয়, নিয়ম ও আইন মানার বিষয়। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সব চেয়ে বেশি প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা । এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, পুলিশিংয়ে থানা ও ট্রাফিক আলাদা বলে কিছু নেই। আমরা সবাই পুলিশ।
তারা বলেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা , পর্যবেক্ষণ তথা  যানজট নিয়ন্ত্রণে সব কিছু করাই আমাদের  কাজ। আমাদের চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে ভালো লাগে আর সেকারণেই পুলিশে আসা। আমরা যখন ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে রাস্তায় নামি তখন অনেক পথচারীই বাহবা দেন-প্রশংসা করেন।
আইন সম্পর্কে আমাদের আরও পজেটিভ হতে হবে। আইন মেনে চললে রাস্তায় কোনো যানজট থাকবেনা বলে মনে করেন তারা। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় যে কোনো পরিস্থিতিতেই ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে রাস্তায় থেকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে থাকতে হয় আমাদের। ময়মনসিংহ নগরীতে বিকল্প পথ না থাকা ও রাস্তায় অতিরিক্ত অটো , রিকশা, সিএনজিসহ নানান ধরনের গাড়ি চলাচলের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক কন্ট্রোলে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আর প্রযুক্তিগত অভাব রয়েছে। ডিজিটাল যুগে আমরা ট্রাফিক কন্ট্রোল করি এনালগ পদ্ধতিতে অর্থাৎ হাতের লাঠি দিয়ে।
ট্রাফিক পুলিশরা রাস্তায় শুধু ট্রাফিক কন্ট্রোলই করেন না যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নিরসন করার কিছু উপায়ও তারা বের করেন। নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে হলে  ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়ে তারা বলেন, সবাই মিলে একসাথে কাজ করলে যানজট নিরসন সম্ভব।

খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, রোদ ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহ নগরীতে দায়িত্ব পালন করে চলে ট্রাফিক পুলিশ। অথচ পুলিশের এ অংশটি সবচেয়ে অবহেলার স্বীকার। প্রতিনিয়ত ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থায় তারা সেবা দিয়ে চলেছে নগরবাসীকে। নিয়মানুযায়ি ডিউটি করার কথা আট ঘন্টা। কিন্তু এমনো দিন যায়, কখনো দিনে বারো ঘন্টাও ডিউটি করতে হয়।
তবে একথা অনস্বীকার্য যে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে প্রচুর। চাঁদাবাজি, চালককে হয়রানিসহ নানা অভিযোগ নির্দ্বিধায় মাথা পেতে নিয়েছেন মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের অনেকেই। কেউ যুক্তি দিয়েছেন, কেউ বাস্তবতা বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, আবার কেউ বা বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকেছেন।
রাস্তায় চাহিদার তুলনায় ট্রাফিক কনস্টেবলের সংখ্যা সীমিত। জীবন বাজি রেখে যানজট নিরসণ করে চলে তারা। ঘন্টার পর ঘন্টা ধূলোবালি, শব্দ দূষণ আর কালো ধোঁয়ার মধ্যে ডিউটি করার কারণে প্রত্যেকেই কোন না কোন ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। কিন্তু তাতেও মন গলে না ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয় মানুষের গালাগালি।
ভোর থেকে শুরু হয় ট্রাফিক কনস্টেবলদের জীবন যুদ্ধ। সকাল সাড়ে ছয়টার মধ্যেই বাসস্থল ছেড়ে বেরুতে হয় নির্দিষ্ট পয়েন্টের উদ্দেশে। কারণ ডিউটি শুরু সকাল সাতটা থেকে। এর ফলে সকালের নাস্তা অনেক সময় করা হয় না বাসস্থলে। তাই পয়েন্টে এসে দুটি পরোটা, একটু ভাজি আর এককাপ চা খেতেই পকেট থেকে বেরিয়ে যায় ত্রিশ টাকা। সকালের ডিউটিতে আসার সময় গাড়ি ভাড়া যায় নিজের পকেট থেকেই। এক্ষেত্রে সে টাকাটা বাঁচাতে অনুনয় বিনয় করতে হয় বাস, অটো রিকশা অথবা টেম্পো চালক ও হেলপারকে। তারা করুণা করে গাড়িতে কখনো তুলে, কখনোবা অনুরোধ উপেক্ষা করে গাড়ি টেনে চলে যায়। বেলা দুইটার দিকে ডিউটি পরিবর্তনের সময় বদলি কনস্টেবল না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বদলিকৃত কনস্টেবল এলে তবেই ছুটি।

তাদের সমস্যায় পড়তে হয় রাতে ফিরে আহার করার ক্ষেত্রে। রাতের রান্না হয়ে যায় বিকেল পাঁচটায়। অথচ বিকেলের শীফটে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক কনস্টেবলদের বাসস্থলে ফিরতে ফিরতে বারোটা একটা বেজে যায়। রাতের খাবার খেতে গিয়ে দেখা যায়, ভাতগুলো হয়ে গেছে স্যাঁতস্যাঁতে, তরকারি হয়ে পড়েছে টক। বাধ্য হয়ে পাশের কোন হোটেল বা দোকান থেকে গাঁটের পয়সা খরচ করে খাবার কিনে খেতে হয়। যে শ্রম ও মানসিক চাপ, মেধা ও শক্তি ক্ষয় হয় তাদের, সে অনুযায়ি পুষ্টি নেই। সাপ্তাহিক ছুটি নেই। ডিউটি যেখানে, সেখানে একটুও বিশ্রামের ব্যবস্থা নেই, নেই পানীয় জল ও টয়লেটের ব্যবস্থা। এত সমস্যার পরও যানজন নিরসনে আপ্রান চেষ্টা করে যার তারা ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 78 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ