টার্গেট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন

Print

%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%b9%e0%a6%a3%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%acএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশ্বদরবারে অবস্থান, ইইউ’র জিএসপি প্লাস, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি। সে জন্য-দেশী-বিদেশী সব মহলের টার্গেট এখন ইনক্লুসিভ (সব দলের অন্তর্ভুক্তিমূলক) নির্বাচন। সব দলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে হয় সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, মাঠের বিরোধী দল বিএনপিসহ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। জাতিসংঘসহ দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ‘ইনক্লুসিভ নির্বাচনের’ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই তৎপরতা শুরু করেছে। ‘আগামী নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ দেখতে চান না’ এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের ‘জনগণের মন জয়’ করে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের ‘রূপরেখা’ উপস্থাপন করে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্নের নির্দেশ দিয়েছেন। ইনক্লুসিভ নির্বাচনের লক্ষ্যে ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন’ গঠনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভূমিকা রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। ঢাকায় কর্মরত ইইউ রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ও ইইউ-এর মধ্যে যৌথ কমিশন আছে। আগামী ২০ ডিসেম্বর এই গণতন্ত্রবিষয়ক সাব গ্রুপের বৈঠক হবে ব্রাসেলসে। সেখানে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে আলোচনা হবে। উল্লেখ্য, ইইউ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
বৈশ্বিক যোগাযোগে পৃথিবী এখন গ্লোবাল ভিলেজে। কবির সেই পঙ্ক্তি ‘সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’ অবস্থা। সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক অপরিহার্য। বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে আমেরিকায় জিএসপি হারিয়েছি। বিদেশী শ্রম বাজার ধরে রাখা, গার্মেন্টস পণ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস অর্জন করে, গণতন্ত্র, সুশাসন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপর সবকিছু নির্ভর করছে। অপ্রিয় হলেও সত্য বাংলাদেশের ‘রাজনীতি’তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত অপ্রত্যাশিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির আন্দোলন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল; তেমনি ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট না দিলেও ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে’ উলঙ্গভাবে হস্তক্ষেপ করেছে ভারত। সেই ভারতের অবস্থা আর আগের মতো নেই। বাংলাদেশে যখন ভোট হবে তার কয়েক মাস পর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা সমস্যায় জর্জরিত ভারতেও নির্বাচন হবে।
বাংলাদেশে একাদশ সংসদ নির্বাচন ২০১৮ সালের শেষের দিকে হবে; আর ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচন হবে ২০১৯ সালের প্রথমদিকে (ভারতের নির্বাচন ২০১৪ ভারতে ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে ৭ এপ্রিল থেকে ১২ মে ভোট গ্রহণ হয়)। অতএব ভারতের ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচাও’ অবস্থা। তাছাড়া জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দাতাদেশ, সংস্থাগুলোর আগামীতে বাংলাদেশের ওপর ‘দৃষ্টি’ কেমন হবে তা নির্ভর করছে জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর। এ বাস্তবতা বুঝতে পেরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেমন সব দলের অংশগ্রহণে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টায় সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে; তেমনি বিএনপিও নির্বাচন বর্জনের চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
আওয়ামী লীগ/বিএনপির প্রস্তুতি
৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মতো জনগণের ভোট ছাড়াই ‘ফাঁকা মাঠে’ গোল দিয়ে সরকার গঠন সম্ভব নয়Ñ এ বাস্তবতা বুঝতে পেরেই কাউন্সিলে ‘নির্বাচনী কমিটি’ গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের দেড় বছর বাকি থাকলেও এখন থেকেই মাঠ গুছিয়ে নিতে চান দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের জাতীয় সম্মেলনেও দলকে শক্তিশালী ও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয়। সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আপনারা মানুষের কাছে যান, জনমত গড়ে তুলুন। আমি নিজেও জেলায় জেলায় আসব, জনসভায় অংশ নেব।’ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ১২ নভেম্বর চট্টগ্রাম, ১৬ নভেম্বর কুষ্টিয়ায়, ২০ নভেম্বর নোয়াখালীতে জনসভা করেছেন। সব জনসভায় ওবায়দুল কাদের দলের নেতা-কর্মীদের জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি ‘আচরণ সংশোধনের’ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের ফুল দিয়ে খুশি করার চেয়ে জনগণের কাছে গিয়ে তাদের খুশি করুন। তারা ভোট না দিলে ক্ষমতায় আসা যাবে না। এ ছাড়া দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি ও আবদুর রহমানকে সংবর্ধনা দিতে টাঙ্গাইল, চাঁদপুর ও ফরিদপুরে পৃথক জনসভা হয়। ওই সভায় নেতারা বলছেন, তাদের দল নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে। আর নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠন শক্তিশালী করে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ডিসেম্বরে বেশ কয়েকটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগ ও দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, মহিলা লীগের কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতারা ক্ষমতা খাটিয়ে জনগণের সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার করেছেন তা কেন্দ্রীয় নেতাদের নজর এড়ায়নি। জনগণের ভোট ছাড়াই নির্বাচন হয়েও দখল, চাঁদাবাজি, লুট, সন্ত্রাস, খুনাখুনির মাধ্যমে জনগণ থেকে দলকে বিচ্ছিন্নই করে ফেলেছেন। সেই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে মানুষের সঙ্গে নেতাকর্মীদের ‘ভালো আচরণের’ পরামর্শ দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক।
এদিকে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন গঠনে ১৩ দফা সুপারিশ সম্বলিত প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। এটা দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রাথমিক পদক্ষেপ। এখন দলটির সিনিয়র নেতারা দাবি করছেন, তৃণমূলে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেই কর্মসূচি ঘিরে বিএনপির সর্বত্রই চাঙ্গাভাব চলে এসেছে। মামলার ভারে হাজার হাজার নেতা ‘হেলে’ পড়লেও কমিটি গঠনকে ঘিরে নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা চলছে। নেতারা বলছেন, তৃণমূলে বিএনপির লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। মূলত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে জেলা কমিটি গঠন শুরু করে এ পর্যন্ত বিএনপি ঘোষিত কমিটির মধ্যে অধিকাংশই আহ্বায়ক কমিটি। আহ্বায়ক কমিটিগুলোও নতুন করে দেয়ার পরিকল্পনা করছে। দলটির সাংগঠনিক জেলা ৭৫টি। এর মধ্যে ২০টি জেলায় পূর্ণাঙ্গ, আংশিক কিংবা আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে ৪০টি জেলায় কমিটির টার্গেট করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ মহানগর, ময়মনসিংহ উত্তর, ময়মনসিংহ দক্ষিণ, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ, পিরোজপুর, জামালপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মাগুরা, নওগাঁ, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা উত্তর, রাজশাহী জেলা, রাজশাহী মহানগর, শেরপুর, ঝালকাঠি, বান্দরবান, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট অন্যতম। এ সবকিছুই করা হচ্ছে নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরেই। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, ‘পুনর্গঠনকে ঘিরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃণমূলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব চলে এসেছে। শিগগিরই বিএনপির সব সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ করে নতুন বছর নতুন উদ্যমে আমরা পথ চলা শুরু করব।’
নিনিয়ান-তারানকো-মায়াদুন
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন, আইনের শাসন, ক্ষমতায় জনগণের অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক উন্নয়নে জনগণের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহল খুবই সহানুভূতিশীল। প্রভাবশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল দেখতে চাইলেও জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ চায় বাংলাদেশের মানুষের জাপিত জীবন উন্নত হোক। যার জন্যই ১৯৯৪ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুর রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারি ও বিরোধী দলের সমঝোতার লক্ষ্যে কমনওয়েলথের তৎকালীন মহাসচিব চিফ এমেকা এনিয়াওকুর বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন ওই বছরের ১৩ অক্টোবর ঢাকায় আসেন। তিনি দীর্ঘ ৪০ দিন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় সংলাপের মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফরে আসেন। সংকট সমাধানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, নাগরিক প্রতিনিধি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সবশেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন। এ ছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব কয়েক দফায় শীর্ষ দুই নেত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও শীর্ষ দুই নেত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ করে সংকট সমাধানের পরামর্শ দেন। তবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকা সফরে এসে আওয়ামী লীগ যাতে আবার ক্ষমতায় থাকতে পারে সে জন্য অন্যান্য দলগুলোকে পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরামর্শ দেন। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন গত ১৭ অক্টোবর বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন নিয়ে আগামী ২০ ডিসেম্বরে ইইউ সদর দফতরে বাংলাদেশ-ইইউ যৌথ কমিশনের গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত উপ-কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে ভবিষ্যৎ নির্বাচন কমিশনের জন্যে কারিগরি কোনো সহায়তার প্রয়োজন হবে কিনা সেটিও আলোচনা হবে। কারণ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বাংলাদেশ ও ইইউ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা থাকতে হবে। আর নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইইউ’র ব্যাপক কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় এই সময়টাকে অনেক দূরে বলে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে এটা খুব বেশি দূরে নয়। তাই এখনই এ নিয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত উপ-কমিটির বৈঠকে এটি এক নম্বর এজেন্ডা। গত ১৪ নভেম্বর ঢাকা আসেন বারন্ড লাঙ্গার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দল। ডেলিগেশন ফর কমিটি অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (আইএনটিএ)-এর পক্ষ থেকে ঢাকা সফরে আসেন। স্পিকার, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও সক্ষম নির্বাচন কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা তৈরি পোশাকের জন্য জিএসপি প্লাস সুবিধার যোগ্যতা অর্জনের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, বাংলাদেশে এমন নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন, যার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকবে। সংবাদ সম্মেলন করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের প্রধান বারন্ড লাঙ্গা বলেন, আমরা মনে করি, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গঠিত হওয়া উচিত। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আশ্বস্ত হয়েছি, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে গঠন করা হবে। তবে নির্বাচন কমিশনে দক্ষ ও যোগ্য লোকদের দেখব বলে আশা করছি। তিনি নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু মত প্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকার আহ্বান জানিয়ে নিরাপত্তার নামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা উচিত নয় বলে মত দেন।
জিএসপি প্লাস
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর জাতিসংঘ, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, মার্কিন সিনেট, কানাডা, জাপান এবং অপরাপর কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে দ্রুত আরেকটা জাতীয় সংসদ অনুষ্ঠানের জন্য তাগিদ দেয়। নির্বাচনের আগে ‘নেহায়েত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার’ ভোট প্রচার করে আওয়ামী লীগ নেতারা পরবর্তীতে দ্রুত একাদশ নির্বাচনের আয়োজনের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু নির্বাচনের পর তারা প্রতিবেশী ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বকে উল্টো বার্তা দেয়। এতে বেঁকে বসে আমেরিকা। শিশুশ্রম, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠনের অধিকার, গার্মেন্টসে কর্মপরিবেশসহ নানা অজুহাতের কথা বললেও বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক কারণে আমেরিকা জিএসপি সুবিধা বন্ধ রাখে। মার্কিন বাজারে গার্মেন্টসের তৈরি পোশাকের বাজারের জিএসপি সুবিধা বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নি¤œ আয়ের দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে গার্মেন্টস পণ্যে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। এ সুবিধার মেয়াদ শেষ হবে ২০১৮ সালের জুনে। তখন নি¤œমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের সামনে জিএসপি প্লাস সুবিধার হাতছানি। এ জন্য ৩টি শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক। শর্তগুলো হলো প্রথমত, গণতান্ত্রিক অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, দ্বিতীয়ত, কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে তৃতীয়ত, শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এগুলো করতে হলে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অপরিহার্য। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলন এ কথাই জানিয়ে দিয়েছেন। মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হওয়ার পর বাংলাদেশকে ইইউ বাজারে সুবিধা নিতে জিএসপি প্লাস-এর আওতায় যেতে হবে। তবে এজন্য গণতান্ত্রিক অবস্থা, পরিবেশের মান এবং লেবার স্টান্ডার্ড থাকতে হবে।
বাংলাদেশে রেমিটেন্স আসে শ্রমিক ও গার্মেন্টস পণ্য রফতানি করে। বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে আমেরিকার জিএসপি বন্ধ। গণতন্ত্রহীনতায় আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সামনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি-প্লাস ধরে রাখতে গণতন্ত্র চর্চাসহ তিন শর্ত পূরণ অপরিহার্য। সেটা মাথায় রেখেই দেশের রাজনৈতিক দল ও দাতাদেশ ও সংস্থাগুলোর তৎপরতা থেকে বোঝা যায় সবার টার্গেট সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 39 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ