তত্ত্বাবধায়ক নয়, বিএনপি সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবে

Print

খালেদা জিয়ানির্বাচনকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক হওয়া চাই-এমন দাবি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন যাতে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারে সেই উদ্দেশ্যেই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রয়োজন। আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা ভবিষ্যতে যথাসময়ে জাতির সামনে উপস্থাপন করবো।’
শুক্রবার নির্বাচন কমিশন গঠনে দলীয় প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে গিয়ে বক্তব্যের শেষে খালেদা জিয়া নতুন এই অবস্থান তুলে ধরেন। পুরো প্রস্তাবনাটির বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দুটো সংস্করণ করা হয়েছে।
তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনে এই দাবিটিই ছিল সবচেয়ে বড় কারণ। বিএনপি-জোট বরাবরই বলে এসেছে, নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষ হতে হবে এবং সেটি তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে। শুক্রবার নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিতে এসে খালেদা জিয়া জানালেন, ‘তার দল ও জোট সহায়ক সরকারপদ্ধতি নিয়ে ভাবছে।’
সংবাদ সম্মেলনের পর খালেদা জিয়ার বক্তব্যের এই দিকটি নিয়ে কয়েকজন বিএনপির নেতার সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান, শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, খালেদা জিয়া সহায়ক সরকারের ধরণ কি হবে, এ বিষয়ে পরে জানাবেন। আদৌ সহায়ক সরকার মানে তত্বাবধায়ক দাবি থেকে পিছু হটা কি না, এ নিয়ে তারা এখনই মুখ খুলতে নারাজ। জোটের নেতারাও এ বিষয়ে এখনই কথা বলতে রাজি হননি। সংবাদ সম্মেলন শেষে একাধিক জোটের শরিক দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বললে, তারা এ ব্যাপারে খালেদা জিয়ার পরিস্কার অবস্থান জেনে কথা বলা উচিৎ বলে মনে করেন।
সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া শুরুতেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বলেন, ‘গত দুটি জাতীয় নির্বাচনে এবং গত কয়েক বছরের অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এবং পক্ষপাতমূলক আচরণ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণকে হতাশ, আস্থাহীন এবং ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। বৃহত্তর জাতীয় ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এহেন পরিস্থিতি আর চলতে দেওয়া যায় না। জনগণ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন চান। তাঁরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা এবং দায়িত্বপালনে ন্যায়পরায়ন দৃঢ়তা দেখতে চায়।’
প্রস্তাবনায় খালেদা জিয়া নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, কাদের নিয়ে গঠন হবে, বাছাই কমিটি, বাছাই কমিটির কাঠামো, নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণে দলের বিস্তারিত সুপারিশ তুলে ধরেন।
খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে এবং একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রণয়ন বাঞ্ছনীয়’উল্লেখ করলেও নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন করার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।
যদিও এ নিয়ে তার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আগেই এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘ইসি গঠনে আইনের বিষয়ে এখনই কিছু বলবে না বিএনপি।’
উল্লেখ্য, সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে কমিউনিষ্ট পার্টি নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন করার দাবি করেছিলেন।
খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশনকে অধিকতর কার্যকর ও শক্তিশালীকরণসহ অন্যান্য নির্বাচনী বিধি-বিধান সময় উপযোগী ও যৌক্তিকিকরণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করার সুপারিশ করেন। তিনি বর্তমান কয়েকটি আরপিও ধারা সংশোধন করারও প্রস্তাব দেন।
মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে চলবে
সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে কমিশনের নিজস্ব সচিবালয় ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার প্রাক্কালে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় যেমন স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পররাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ- ১৯৭২ এর ৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে।’
প্রসঙ্গত, গত ৩০ জুন (তিনটি ‘নরম’ শর্তে ২০১৯ সালের নির্বাচনই টার্গেট বিএনপির) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
সীমানা পুনর্বিন্যাস ও সেনা মোতায়েনের দাবি
খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস করতে হবে। নবগঠিত নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলসমূহ কর্তৃক উত্থাপিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত অভিযোগ অথবা মামলা শুনানির ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সীমানা পুনর্বিন্যাস করবে।
খালেদা জিয়া প্রস্তাব করেন, ‘নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ ও নতুন ভোটার নিবন্ধীকরণ করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, লে জে (অব) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ড. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমদ আজম খান।
বিএনপির বাইরে আরও যারা ছিলেন- প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক, সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মোস্তাহিদুর রহমান, ২০ দলীয় জোটের মধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব) ওলি আহমদ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাপর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান টিআইএম ফজলে রাব্বী চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জে (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানী, এনডিপির চেয়ারম্যার খোন্দকার গোলম মোর্ত্তজা, এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মহিউদ্দিন ইকরাম প্রমুখ। তবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর কোনও প্রতিনিধি আসেননি বলে জানান বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 195 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ