থাইরয়েড কি ধরনের রোগ বা সমস্যা ? এর কারণ, লক্ষন ও চিকিৎসা এবং কিছু প্রশ্ন !

Print

untitledজেনে নিন আপনার থাইরয়েডের সমস্যা আছে কিনা

 

এই রোগটা সমন্ধে লিখছি কারণ আমরা অনেক সময় ই এমন কিছু সমস্যার সম্মুখীন হই যে বুঝতে পারিনা যে সমস্যা টা কেন হচ্ছে। ভালো মত টেস্ট করে জানা যায় যে এটা আসলে থাইরয়েড এর সমস্যা। তাই থাইরয়েড এর সমস্যার লক্ষন গুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরে চাই, যাতে আপনারা নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন।

থাইরয়েড হল আমাদের গলায় অবস্থিত ছোট্ট একটি গ্রন্থি। এই গ্রন্থি থাইরয়েড হরমোন তৈরীর জন্য দায়ী। প্রথমে ব্রেনের হাইপোথালামাস থেকে TRH নামে একটি হরমোন তৈরী হয়। TRH তারপর পিটুইটারি নামের অন্য একটি গ্রন্থি কে উদ্দিপীত করলে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে TSH নামে একটি হরমোন তৈরী হয়। এই হরমোন আবার থাইরয়েড গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করলে, খাবার থেকে প্রাপ্ত আয়োডিন কে ব্যবহার করে থাইরয়েড হরমোন তৈরী হয়। থাইরয়েড হরমোন দুই প্রকার-T3(০.১%) এবং T4(৯৯.৯%), এই হরমোন দুটি আমাদের শরীরের অনেক গুরত্বপূর্ণ কার্যাবলী সম্পাদনে ভূমিকা রাখে। হাইপোথালামাস, পিটুইটারি ও থাইরয়েড গ্রন্থি এই তিনটার যে কোন একটাতে সমস্যা থাকলেই, শরীরে থাইরয়েড হরমোন এর পরিমাণে বেশকম হয়ে যাবে। তাছাড়া আয়োডিন এর অভাব হলেও, থাইরয়েড হরমোনের পরিমান কমে যাবে। যদি শরীরে থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ কমে যায় তবে তাকে বলে “হাইপোথাইরয়েডিসম” আর যদি বেড়ে যায়, তাকে বলে “হাইপারথাইরয়েডিসম”।

হাইপারথাইরয়েডিসম এর লক্ষন সমূহঃ
১) অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
২) গরম সহ্য করতে না পারা
৩) হাত পা হালকা কাপা
৪) নার্ভাসনেস
৫) মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া
৫) হার্টবিট বেড়ে যাওয়া
৬) হঠাত করে ওজন কমে যাওয়া
৭) অনেক খেয়েও ওজন বাড়াতে না পারা
8) অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পরা
৫) কাজে মনোযোগের অভাব
৬) মহিলাদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব
৭) ঋতুস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
8) ঘুম কম হওয়া
৫) বড় বড় কোটর থেকে বের হয়ে আসা চোখ

যদিও এই সমস্যাগুলো সেইরকম ভাবে আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেনা। কিন্তু কারো যদি চিকিতসাবিহীন অবস্থায় অনেকদিন হাইপারথাইরয়েডিসম থাকে, তাহলে “থাইরয়েড স্ট্রম” হতে পারে। তবে এটি খুব কমন কোন ঘটনা নয় এবং সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে হয়। “থাইরয়েড স্ট্রম” বলতে বুঝায় হঠায় করে অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন তৈরী হতে যাওয়া। এর ফলে প্রচন্ড জ্বর, মাথা কাজ না করা, পেটে ব্যাথা, উচ্চরক্তচাপ, হার্ট বিট অত্যন্ত বেড়ে যাওয়া এবং হার্ট ফেইলিওর হয়। তাদক্ষনিক চিকিতসা না করলে “থাইরয়েড স্ট্রম” জীবন ঘাতি হতে পারে। সাধারণত ইনফেকশন ও স্ট্রেস হাইপারথাইরয়েডিসমের রোগীর মধ্যে “থাইরয়েড স্ট্রম” তৈরী করে।

হাইপোথাইরয়েডিসম এর লক্ষন সমূহঃ
১) দুর্বলতা
২) স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
৩) ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা
৪) কোষ্ট্যকাঠিন্য
৫) বিবর্ন ও শুস্ক ত্বক
৬) পেশি এবং জয়েন্ট গুলো তে জড়তা বা ব্যাথা অনুভব করা
৭) মহিলাদের বেশি পরিমানে অথবা বেশি সময় ধরে ঋতুস্রাব
8) ডিপ্রেশন
৯) চিকন এবং ফাটা চুল অথবা ফাটা নখ
১০) চলাফেরায় মন্থর গতি
১১) হঠাত ওজন বেড়ে যাওয়া
১২) খুব কম খেয়েও ওজন কমাতে না পারা
১৩) চুল পরা
১৪) বারন্ত ছেলেমেয়েদের ধীর উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ধীর সেক্সুয়াল ডেভেলপমেন্ট

হাইপারথাইরয়েডিসম এর মতই এই লক্ষন গুলো আপনাকে অতটা বিরক্ত করবেনা। কিন্তু অনেকদিন চিকিতসাবিহীন থাকলে আপনার “মিক্সএডেমা কোমা (Myxedema coma)” হতে পারে। মিক্সএডেমা কোমা বলতে বুঝায়ে শরীরে থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ হঠাত অতিরিক্ত কমে যাওয়া, এর ফলে আপনার ব্রেইন ঠিকমতো কাজ করবে না।। ইনফেকশন, অসুস্থতা, ঠান্ডা আবহাওয়া এবং কিছু ওষুধ এই কোমা তৈরী করতে শরীর কে উজ্জিবীত করে এবং সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে হয়। হাইপারথাইরয়েডিসম ফলে হওয়া “থাইরয়েড স্ট্রোম” এর মতই এই “মিক্সএডেমা কোমা” ও অতটা কমন না কিন্তু জীবনঘাতি।

তাছাড়া হাইপারথাইরয়েডিসম এবং হাইপোরথাইরয়েডিসম দুটোর কারণেই কারণে থাইরয়েড গ্রন্থি আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। একে বলা হয় গলগন্ড। গলগন্ড হলে শ্বাসে সমস্যা হয়, খাদ্য গ্রহনে সমস্যা হয়, ব্যথা এমনকি ক্যন্সার ও হতে পারে।

সুতরাং আপনার লক্ষনগুলো যদি “হাইপারথাইরয়েডিসম” অথবা “হাইপোথাইরয়েডিসম” সাথে মিলে যায়, একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট এর সাথে দেখা করুন। রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে আপনার রক্তে TSH, T3 এবংT4 এর পরিমাণ নির্ণয় করলেই বোঝা যাবে যে আপনার থাইরয়েড এর সমস্যা আছে কিনা। যদিও থাইরয়েড এর সমস্যা যাতে না হয়, তা আগে থেকে প্রতিরোধের উপায় নেই (যদি না আয়োডিন এর অভাবে থাইরয়েড এর রোগ হয়ে থাকে), কিন্তু যদি রোগ হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি হলেও তার চিকিতসা আছে। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই, শুধু প্রয়োজন সচেতনতার। পোস্টটি শেয়ার করুন যাতে, সবাই ই তাদের থাইরয়েড এর সমস্যা আছে কিনা সে ব্যাপারে সচেতন হতে পারে এবং বাসার কোন বৃদ্ধ মুরুব্বির থাইরয়েড এর সমস্যা থাকলে সে “থাইরয়েড স্ট্রম” বা ““মিক্সএডেমা কোমা” তে আক্রান্ত হলে বুঝতে পারে।

 

যেভাবে বুঝবেন আপনার থাইরয়েড রোগ আছে কি না? বুঝার ঘরোয়া পদ্ধতিঃ

লক্ষ করি,

  • নিচের ২ এর কম প্রশ্নের জবাব যদি হ্যাঁ হয় তাহলে আপনার থাইরয়েড ভাল আছে।
  • ২-৪ টি প্রশ্নের জবাব যদি হা হয় তাহলে আপনার থাইরয়েড রোগ আছে কিন্তু তা কম মাত্রায়।
  • ৪ এর অধিক প্রশ্নের জবাব যদি হা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আপনার থাইরয়েড এর অবস্থা খুব খারাপ।

এখন নিচের প্রশ্নগুলোর সাথে আপনার জবাব মিলিয়ে নিন।

  1. আপনার আঙ্গুলের নখগুলো কি পুরু ও ভঙ্গুর ?
  2. ত্বক কি শুষ্ক ও চোখগুলো কি প্রায়ই জ্বালা করে ?
  3. হাত পা কি ঠাণ্ডা?
  4. গলার স্বর কি ভাঙ্গা?
  5. চুল কি মোটা, চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে বা পরে যাচ্ছে?
  6. আই ভ্রুর বাইরের দিক কি পাতলা হয়ে যাচ্ছে?
  7. ঘাম কি বেশী হয়?
  8. অল্পতেই কি খুব ক্লান্ত  হয়ে যান?
  9. রজঃচক্র কি অনিয়মিত?
  10. যৌন বাসনা কি কমে গেছে?
  11. রজঃনিবিত্তি পরবর্তী অথবা PMS কি সাংঘাতিক ?
  12. হাত পা কি ঘন ঘন ফুলে যায়?
  13. রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন কি ভাল না?
  14. কোলেস্টেরল এর মাত্রা কি উচু?
  15. কোন কিছু স্মরণ করতে বা মনঃসংযোগ করতে কি আপনার সমস্যা হয়?
  16. আপাত কোন কারন ছারাই কি আপনার ওজন বারে অথবা কমে?
  17. অবসাদ,খামখেয়ালীপনা, উদ্বেগ, খিটখিটে ভাব কি আছে?
  18. পেশীর ক্লান্তি ,ব্যথা অথবা দুর্বলতা কি আছে?
  19. বিকিরন চিকিৎসার ঘটনা আছে কি?
  20. বিষের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস আছে কি?
  21. পরিবারে আরও যেমন মা- এদের কারো কি থাইরয়েড সমস্যা  আছে কি?

যদি ৪ এর অধিক প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয় তবে আর একদিন ও দেরি না করে আজই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খাওয়া শুরু করুন।

 

থাইরয়েড কি ধরনের রোগ বা সমস্যা ? এর কারণ, লক্ষন ও চিকিৎসা ;

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে সাধারণত দুই ধরণের সমস্যা দেখা যায়, গঠনগত ও কার্যগত। গঠনগত সমস্যায় থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায় যেটাকে গয়টার বল হয়। কার্যগত সমস্যা দুই রকমের হয়ে থাকে তা হল হাইপারথাইরয়ডিজম ও হাইপোথাইরয়ডিজম। হাইপারথাইরয়ডিজমে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বেশি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে পড়ে ও হাইপোথাইরয়ডিজমে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কাজ করেনা।
থাইরয়েড সমস্যা হওয়ার কারণ
১। হাইপোথাইরয়ডিজম মূলত তিনটি কারণে দেখা যায়। নবজাতক শিশুদের মধ্যে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড তৈরি না হলে কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়ডিজম দেখা যায়। এছাড়া অটোইমিউন হাইপোথাইরয়ডিজম দেখা যায়। থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি সক্রিয় হলে হাইপোথাইরয়ডিজম নষ্ট হয়ে যায়। তখন থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কাজ করেনা। চিকিৎসাজনিত কারণেও এই অসুখ হতে পারে। অপারেশনের কারণে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বাদ দিতে হলে বা অন্য কারণেও থাইরয়েড নষ্ট হয়ে গেলে এই সমস্যা হতে পারে।
২। অ্যান্টিবডি অতিরিক্ত মাত্রায় থাইরয়েডকে স্টিমুলেট করলে হাইপারথাইরয়ডিজমের সমস্যা দেখা দেয়। চূড়ান্ত পর্যায়ের পর ওষুধ এর ডোজ বেশি হলে তার থেকে হাইপারথাইরয়ডিজম হতে পারে। থাইরয়ডাইটিসে রক্তে থাইরয়েডের মাত্রা বেড়ে যায়।
৩। যেসব অঞ্চলে আয়োডিনের অভাব রয়েছে সেখানে আয়োডিনের অভাব জনিত কারণে হাইপোথাইরয়ডিজম দেখা যায়।
হাইপোথাইরয়ডিজমে যে লক্ষনগুলো দেখা দেয়
১। অবসাদগ্রস্থ হওয়া, সাথে অলসতা, ঘুম, ঘুম ভাব।
২। ত্বক খসখসে হয়ে যায়।
৩। পা অল্প ফুলে যায়।
৪। ক্ষুধা মন্দা শুরু হয়।
৫। চুল পড়তে শুরু করে।
৬। ওজন অল্প বেড়ে যায়, ৫-৬ কিলো বেড়ে যেতে পারে।
৭। স্মৃতিশক্তি কমে যায়।
৮। মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
৯। কোষ্ঠকাঠিন্য শুরু হয়।
১০। ব্লাড প্রেশার বাড়তে পারে।
১১। বন্ধ্যাত্বর সমস্যা হতে পারে।
১২। গর্ভধারণকালে গর্ভপাত হতে পারে।
১৩। কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়ডিজমে শিশুর ব্রেনের বিকাশ হয়না।
১৪। শীত শীত ভাব দেখা যায়।
১৫। পিরিয়ডের সমস্যা হতে পারে।হাইপারথাইরয়ডিজমে যে সমস্যা দেখা দেয়
১। ক্ষুধা বেড়ে গেলেও ওজন কমতে থাকে।
২। প্রচন্ড গরম লাগে।
৩। বুক ধড়ফড় করে।
৪। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
৫। পিরিয়ডের সমস্যা দেখা দেয়।
৬। ত্বক কালো হয়ে যায়।
৭। হার্টের সমস্যা হতে পারে।
৮। ব্লাড প্রেশার বেড়ে যায়।
৯। হাড়ের ক্ষয় শুরু হয়।
১০। চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসে।
১১। হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা শুরু হয়।
১২। বন্ধ্যাত্ব হতে পারে।
থাইরয়েডের চিকিৎসা::

শরীরের অন্যতম প্রধান নালিবিহীন গ্রন্থি তথা এন্ডোক্রাইন গ্লান্ড হচ্ছে থাইরয়েড গ্রন্থি যা সাধারণত গলার সামনের অংশে অবস্থিত । স্বাভাবিক প্রাপ্তবয়স্ক লোকের থাইরয়েড গ্লান্ড শরীরের প্রধান বিপাকীয় হরমোন তৈরিকারী গ্লান্ড। থাইরয়েড গ্লান্ড থেকে নিঃসৃত প্রধান হরমোনগুলো হচ্ছে ঞ৩ ও ঞ৪ । থাইরয়েড হরমোনের অন্যতম কাজ হচ্ছে শরীরের বিভিন্ন কোষে, কলায় শর্করা এবং স্নেহজাতীয় খাদ্যের তৈরি বাড়িয়ে দেওয়া। এসব ক্রিয়ার ফলাফল হচ্ছে শরীরের বিপাকীয় হার বা বি এম আর বাড়ানো। থাইরয়েড হরমোনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে স্নায়ুর পরিপক্বতা। এজন্য গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতায় গর্ভের বাচ্চা বোকা হয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত হয় না।
বিভিন্ন উদ্দীপনা যেমন, যৌবনপ্রাপ্তি, গর্ভাবস্থা, শরীরবৃত্তীয় কোনো চাপ ইত্যাদি কারণে থাইরয়েড গ্লান্ডের আকারগত বা কার্যকারিতায় পরিবর্তন হতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থির রোগগুলোকে মোটামুটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) থাইরয়েড গ্লান্ডের অতিরিক্ত কার্যকারিতা বা হাইপারথাইরয়েডিজম
খ) থাইরয়েড গ্লান্ডের কম কার্যকারিতা বা হাইপোথায়রয়েডিজম
গ) গলগণ্ড রোগ বা ঘ্যাগ
ঘ) থাইরয়েড গ্লান্ডের প্রদাহ বা থাইরয়েডাইটিস
ঙ) থাইরয়েড গ্লান্ডের ক্যান্সার
হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণ
(ক) গ্রেভস ডিজিজ (এক ধরনের অটোইমিউন প্রসেস);
(খ) মাল্টিনডিউলার গয়টার;
(গ) অটোনমাসলি ফ্যাংশনিং ছলিটারি থাইরয়েড নডিউল
(ঘ) থাইরয়েডাইটিজ
(ঙ) থাইরয়েড গ্লান্ড ছাড়া অন্য কোনো উৎসের কারণে থাইরয়েড হরমোনের আধিক্য
(চ) টিএসএইচ ইনডিউজ
(ছ) থাইরয়েড ক্যান্সার (প্রধানত ফলিকুলার ক্যান্সার)।
লক্ষণ
ক) গয়টার যা সমস্ত গ্লান্ডে ছড়ানো সমভাবে বিস্তৃত (উরভঁংব মড়রঃবৎ) গোটা আকৃতির ডিফিউজ এবং গোটা গোটা আকৃতিবিশিষ্ট গয়টার (ঘড়ফঁষধৎ মড়রঃবৎ) যাতে স্টেথোস্কোপ দিয়ে বিশেষ ধরনের শব্দ (ইৎঁরঃ) শোনা যেতেও পারে বা নাও যেতে পারে।
খ) পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা :
খাওয়ার রুচি স্বাভাবিক বা বেড়ে যাওয়ার পরও ওজন কমে যাওয়া, ঘন ঘন পায়খানা হওয়া, খাওয়ার অরুচি, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
গ) হার্ট ও ফুসফুসীয় সমস্যা :
বুক ধড়ফড় , হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অ্যাট্রিয়ার ফিব্রিলেশন , হার্ট ফেইলিওর, এনজাইনা বা বুক ব্যথা।
ঘ) স্নায়ু ও মাংসপেশির সমস্যা:
অবসন্নতা বা নার্ভাসনেস, উত্তেজনা, আবেগ প্রবণতা, সাইকোসিস বা মানসিক বিষাদগ্রস্থতা; হাত পা কাঁপা, মাংসপেশি ও চক্ষুপেশির দুর্বলতা, রিফ্লেক্স বেড়ে যাওয়া (এক ধরনের স্নায়ু)

থাইরয়েড রোগের চিকিত্সা

হরমোন নিঃসরনকারী গ্রন্থির মধ্যে থাইরয়েড একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। ইহা গলার সন্মুখভাগে ত্বক ও মাংশের গভীরে অবস্থান করলেও এ গ্রন্থিটির আকার বড় হলে গলগন্ড নামক রোগ হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ঘ্যাগও বলা হয়ে থাকে। এই গ্রন্থিনিঃসৃত হরমোন শরীরের সমস্ত বিপাক প্রক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করে বিধায় চিকিত্সা বিজ্ঞানে এর গুরুত্ব অপরিসীম। থাইরয়েডজনিত রোগীর সংখ্যাও অনেক। চিকিত্সা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের দেশেও থাইরয়েডের রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সায় ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে।

 

গত শতকের আশির দশকেও থাইরয়েডের চিকিত্সায় আধুনিক

 

প্রযুক্তির ব্যবহার সার্বজনীন ছিল না। চিকিত্সকের অভিজ্ঞতা ও পুরোনো কয়েকটি টেষ্টের মাধ্যমেই থাইরয়েডের রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সা করা হতো । এতে রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সা বিলম্বিত ও ত্রুটিপূর্ণ হবার আশংকা থাকতো। আধুনিক পদ্ধতিতে থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন নির্ণয়ের প্রচলন ক্রমান্বয়ে আমাদের দেশে আসতে শুরু করে। থাইরয়েডের রোগের ধরণও তখন ভিন্ন ছিল।  আয়োডিনের অভাবজনিত থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ গলগন্ড ও এর জটিলতার সংখ্যা এত বেশী ছিল যে এই গ্রন্থির অন্যান্য রোগ যেমন গ্রেভস ডিজিস, হাশিমোটো ডিজিস,  হাইপো ও হাইপার থাইরয়েড রোগসমূহ, থাইরয়েডের ক্যান্সার জাতীয় রোগ ইত্যাদীর আনুপাতিক হার তুলনামূলকভাবে কম মনে হতো। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায় যে  ঐ সময়ে আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে আয়োডিনের অভাবজনিত গলগন্ড রোগের প্রকোপ ছিল প্রায় শতকরা পয়ত্রিশজনের কাছাকাছি। এসব রোগের সঠিক পরিসংখ্যাণ  বিজ্ঞানসন্মত জার্ণালে প্রকাশিত ছিল না বলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে  আমাদের দেশের পরিসংখ্যান ছিল অনেকটাই অনুমান নির্ভর। জন বি ষ্টানবারী নামক এক বিশেষজ্ঞ আয়োডিন জনিত রোগ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ১৯৮১ সালেও বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগের সঠিক কোন পরিসংখাণ বা রিপোর্ট না পাবার কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৯৫ সালে তদানীন্তন পিজি হাসপাতালে আমি ও আমার প্রবীন সহকর্মীদের করা এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায় যে আয়োডিনের অভাবজনিত কারণে থাইরয়েড রোগীর সংখ্যা সকল থাইরয়েড রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশী, প্রায় ৩৫%। পত্রিকান্তরে ১৯৬৬ সালে তদানিন্তন পূর্ব বাংলায় প্রায় এক চতুর্থাংশ লোকের গলগন্ড রোগ ছিল বলে মন্তব্য করা হয়েছে। চিকিত্সক, গবেষক, স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিনির্ধারক ও সর্বস্তরের জনগণের অংশ গ্রহণে আয়োডিনযুক্ত লবণ গ্রহণ কার্যক্রম সার্বজনীনভাবে গৃহীত হবার ফলে গলগন্ড রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গেছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে আয়োডিনের ঘাটতিজনিত থাইরয়েডের রোগের চেয়ে অন্যান্য থাইরয়েড রোগের হারই বেশী। এদের মাঝে হাইপোথাইরয়েডিসম, থাইরটক্সিকসিস ও থাইরয়েডের ক্যান্সারজনিত রোগসমূহই প্রধান। উল্লেখ্য যে থাইরটক্সিকসিস জাতীয় রোগ হলে হরমোনের আধিক্যে রোগীর চঞ্চলতা বৃদ্ধিপায়, হাত পা কাপে, বুক ধড়পর করে, যথেষ্ঠ খাওয়া সত্বেও ওজন কমে যায়, শরীর ঘামে ও ক্ষেত্রবিশেষে মানসিক সমস্যাসহ নানাবিধ জটিলতা দেখা দেয়। হাইপোথাইরয়েডিসমে প্রায় উল্টোরকম সমস্যা দেখা যায়। হরমোনের মাত্রা কমে যাবার কারণে রোগী অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে, ওজন বেড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে, শরীর ব্যথা করে, মাসিক অনিয়মিত হয়, সন্তান ধারণ ক্ষমতা কমে যায়, স্মৃতিশক্তি কমে যায়, চুল পড়ে যেতে থাকে এবং নানাবিধ মানসিক উপসর্গও দেখা দেয়।

 

আজকাল ল্যাবরেটরী মেডিসিন, রেডিওলজী ও নিউক্লিয়ার মেডিসিনের উন্নতির ফলে আমাদের দেশেও থাইরয়েড রোগ বেশ আগেই সনাক্ত করা যায়। রোগের উপসর্গ দেখা দেবার আগেই শতকরা প্রায় দশভাগ লোকের রক্ত পরীক্ষায় থাইরয়েড হরমোনের মাত্রায় তারতম্য পাওয়া যায় যা এতকাল কারও জানার সুযোগ ছিল না। এসব রোগীকে সাবক্লিনিক্যাল বা সুপ্ত থাইরয়েড জনিত রোগ বলা যেতে পারে। এসব রোগীদেরকেও চিকিত্সাসেবার  আওতায় রাখা প্রয়োজন যদিও অধিকাংশেরই কোন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। এসকল সুপ্ত রোগী  ও পরিপুর্ণ উপসর্গসহ থাইরয়েডের রোগী মিলিয়ে অনুমান করা যায় যে শতকরা দশ থেকে বিশ ভাগ লোকের কোন না কোন থাইরয়েডের রোগ আছে। এদের মধ্যে বেশ কিছু রোগী থাইরয়েডাইটিস ও থাইরয়েড ক্যানসারে আক্রান্ত ।

 

থাইরয়েড চিকিত্সায় ব্যাপক উন্নতির ফলে আজকাল পূর্বের ন্যায়  অতিমাত্রার হাইপো বা হাইপারথাইরয়েড রোগী কম দেখা যায়। অন্য কোন রোগ চিকিত্সার জন্য পরীক্ষা করার সময় অনেকের থাইরয়েড জনিত রোগ প্রথমবারের মত সনাক্ত হতে দেখা যায়। চিকিত্সা আপাতঃদৃষ্টিতে সহজ মনে হওয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ  ছাড়াই অনেক রোগী  চিকিত্সা চালিয়ে যান  ফলে কখনও কখনও মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা আগের তুলনায় বেশী সহজপ্রাপ্য হবার কারণে অনেকেই টেষ্টগুলো কারণে অকারণে করে থাকেন এবং অনেকেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়াই  শুধুমাত্র টেষ্টের সামান্য তারতম্য দেখেই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে থাইরয়েডের ওষুধ দিনের পর দিন সেবন করে যাচ্ছেন। ইহা অপ্রত্যাশিত এবং রোগীর জন্য ঝুকিপূর্ণ। এর ফলে রোগীরা হার্টের অসুখ ও অষ্টিওপরোসিস নামক অস্থি রোগের ঝুকি বাড়াচ্ছেন। যথাযথ চিকিত্সার অভাবে থাইরটক্সিক ক্রাইসিস নামক জটিলতায় আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুকি প্রায় শতভাগ। থাইরয়েড রোগের চিকিত্সায় প্রভুত উন্নতি হওয়া সত্বেও অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে প্রানহানি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও যত্নবান হতে হবে। এই রোগ নির্ণয়, চিকিত্সা ও চিকিত্সাপরবর্তী পরিচর্যায় চিকিত্সা বিজ্ঞানের প্রচলিত প্রায় সব বিভাগের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। এদের মাঝে ল্যাবরেটরী মেডিসিন, শল্যবিভাগ, ইএনটি ও নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সহায়তা প্রায়ই দরকার হয়। এ রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সায় কখনও কখনও নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সহায়তা প্রয়োজন হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সঙ্গত কারণেই রেডিয়েশন ভিতি রয়েছে। অতিরিক্ত রেডিয়েশনের ফলে ভবিষ্যতে ক্যানসারসহ আরও মারাত্মক প্রতিক্রিয়া যাতে না হয় এজন্য নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের প্রচেষ্টা রয়েছে আর চিকিত্সকরাও বিশেষভাবে প্রয়োজন না হলে নিউক্লিয়ার মেডিসিনে রোগীদেরকে অহেতুক রেডিয়েশনের ঝুকিতে রাখেন না। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল  চিকিত্সকদের কে কোন রোগের বিশেষজ্ঞ তা সার্টিফিকেট যাচাই করে নির্ধারন করেন যা

 

সাধারণ জনগণ ভালভাবে অবহিত নন। এই সুযোগেই অপচিকিত্সার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয় যা থাইরয়েডের রোগের বেলায়ও দেখা যায়। কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত নয় এমন কারও চিকিত্সার মত স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রাকটিস করা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে থাইরয়েড রোগের চিকিত্সায় অর্জন কম নয়। দেশের বড় বড় চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানে  এন্ডোক্রাইনোলজী বিভাগ চালু হয়েছে। থাইরয়েড রোগীর রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সায় অনেক সময় নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সহায়তা প্রয়োজন হয়। আণবিক শক্তি কমিশনের আওতায় বেশ কয়েকটি চিকিত্সাপ্রতিষ্ঠানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের শাখা রয়েছে যা ভবিষ্যতে আরও প্রসারিত হবে আশা করা যায়। সার্জারী ও অনকোলজী বিভাগের বিভিন্ন শাখার বিস্তার ভবিষ্যতে থাইরয়েড রোগের চিকিত্সাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এ রোগ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। চিকিত্সার টার্গেট নির্ধারণে ব্যাপকভাবে বিদেশী গাইডলাইন ব্যবহারের যে রেওয়াজ চালু আছে সেসব দেশীয় গবেষণা দ্বারা আমাদের দেশের জন্য উপযোগী করা প্রয়োজন। বিশেষকরে গর্ভবতী মহিলাদের থাইরয়েড রোগের  চিকিত্সা আমাদের দেশীয় তথ্যের ভিত্তিতে হওয়া খুবই প্রয়োজন। থাইরয়েডের রোগসমূহ  মূলত: অসংক্রামক। পরিবেশদুষণের সাথে এ সকল রোগের যোগসূত্র আছে কিনা সে বিষয়েও গবেষণা করা প্রয়োজন। থাইরয়েড একটি এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি বিধায় এন্ডোক্রাইনোলজী বিভাগের প্রসারের সঙ্গেই থাইরয়েড রোগীদের চিকিত্সাসেবা আরও সম্প্রসারিত হবে। দিন দিন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তৈরী হচ্ছে এবং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে এন্ডোক্রাইনোলজী বিভাগের আরও প্রসার ঘটলে এবং রোগীরা সচেতনভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ গ্রহণ করলে থাইরয়েড রোগের চিকিত্সায় বিদেশে যাবার প্রয়োজন শুন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

গুরুত্বপুর্ন প্রশ্নঃ
প্রশ্ন : থাইরয়েড গ্রন্থি কী? এর অবস্থান কোথায় এবং এটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

উত্তর : থাইরয়েড গ্রন্থি একটি এনড্রোক্রাইন গ্ল্যান্ড। এটা মানুষের গলার সামনে অবস্থিত। এখান থেকে থাইরয়েড হরোমন তৈরি হয়। এই হরমোন শরীরের সব রেচন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি ব্যহত হয়। একজন শিশু যদি ছোট বেলা থেকে এর অভাবে ভোগে তাহলে সে প্রতিবন্ধী হয়ে বড় হবে। যদি তাকে চিকিৎসা দেওয়া না হয়। সে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাবে।

প্রশ্ন : থাইরয়েড গ্রন্থির সাধারণত কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : জন্মগতভাবেই যদি বাচ্চার থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি না হয়, অথবা ভুলভাবে তৈরি হয়, ঠিক মতো বৃদ্ধি না পায়, অথবা তৈরি হলেও ঠিকমতো কাজ না করে, তাহলে থাইরয়েড হরমোন তৈরি হবে না। সে ক্ষেত্রে বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যহত হবে।
আর বড়দের ক্ষেত্রে থাইরয়ড গ্রন্থির বিভিন্ন রকম রোগ হতে পারে। থাইরয়েড যে হরমোন তৈরি করছে এটি একটি স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে থাকবে। তবে যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম তৈরি হয়, একে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম। এতে বিভিন্ন রকম অসুবিধা হয়। আবার যদি বেশি তৈরি হয়, বলা হয় হাইপার থাইরয়েডিজম। সেখানে আবার নানা রকম সমস্যা হবে। এটি হচ্ছে কাজঘটিত সমস্যা।

এ ছাড়া যে সমস্যা হতে পারে, থাইরয়েড গ্রন্থি নিজেই বড় হয়ে যেতে পারে। যাকে আমরা বলি গলগণ্ড। এখানে থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যায়। এটি বিভিন্নভাবে বড় হতে পারে, বিভিন্ন কারণে বড় হতে পারে। আয়োডিনের অভাব আছে এমন এলাকায় যারা বাস করে তাদের হতে পারে বা যারা কম খায় তাদের হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আয়োডিন ডেফিসিয়েন্সি গয়েটার বা এনডিমিক গয়েটার হয়। গ্রন্থিটি সমানভাবে বড় হয়ে যেতে পারে।

আয়োডিন যেহেতু হরমোন তৈরির বিশেষ একটি উপাদান। আয়োডিন যদি কম থাকে গ্রন্থি চেষ্টা করবে শরীরের হরমোনকে স্বাভাবিক রাখতে। সেই ক্ষেত্রে সে আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাবে। যাকে হাইপারট্রোফি বলা হয়। গ্রন্থি বড় হয়ে যাবে। তবে হরমোন স্বাভাবিকভাবে বের করার চেষ্টা করবে। করতে করতে এক সময় আর স্বাভাবিকভাবে তৈরি করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে হাইপোথাইরয়েডিজম হয়ে যাবে। যদি লবণের মাধ্যমে আয়োডিন থাকার কারণে আমাদের দেশে এই রোগ অনেকটা কমে গেছে।

 

প্রশ্ন : এ ছাড়া আর কী সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : থাইরয়েড গ্রন্থিতে টিউমার হতে পারে। যেটাকে নডিউল বলা হয়। সিঙ্গেল (একটি) নডিউল হতে পারে, মাল্টিপল (অনেক) নডিউল হতে পারে। সিঙ্গেল নডিউল হলে একটি কারণে হয়। যেমন ফলিকুলার এডিনোমা। এটি বেনাইন ধরনের। সিস্ট হতে পারে। কলোয়েড গয়েটার হতে পারে। এগুলো সবই ক্যানসার তৈরিকারী নয়। তবে অনেক সময় ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। যাকে সাধারণত থাইরয়েড ক্যানসার বলা হয়।

প্রশ্ন : একজন মানুষের হাইপোথাইরয়েডিজম হলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে? আর হাইপার হলেই বা কী ধরনের সমস্যা হবে?

উত্তর : যেহেতু থাইরয়েড হরমোন আমাদের শরীরের বিপাকে সাহায্য করে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কাজকর্ম করতে সাহায্য করে, সেজন্য যখন থাইরয়েড হরমোন কম থাকবে বা হাইপোথাইরয়েডিজম হবে, সে ক্ষেত্রে সব কাজকর্ম ধীর গতির হয়ে যাবে। ধীর গতির হয়ে গেলে রোগী দুর্বল হবে। রোগীর ওজন বেড়ে যাবে। কোষ্টকাঠিন্য হবে। পালস রেট কমে যাবে। সহজেই তার শীত লাগবে। যদি হাইপো হয়, কাজ কমে যায় তাহলে এই ধরনের সমস্যা থাকবে।

আর যদি কাজ বেড়ে যায়, যেটা হাইপার থাইরয়েডিজম সেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি বেশি বেশি কাজ করবে, সব পদ্ধতির কাজগুলো বেড়ে যাবে। রোগী তখন অস্থির হয়ে যাবে। তার পালস রেট বেড়ে যাবে। পালপিটেশন হবে, হাত কাঁপবে। তার বাউয়েল মুভমেন্ট বেড়ে যাবে। বারেবারে পায়খানা হবে। আর তার ওজন কমে যাবে তবে ক্ষুধা বেশি থাকবে। গরম লাগবে, অস্থির ও দুর্বল লাগবে।

প্রশ্ন : এই রোগ নির্ণয়ের জন্য নিউক্লিয়ার মেডিসিনের কাজ কী?

উত্তর : নিউক্লিয়ার মেডিসিনে থাইরয়েডের যেসব পরীক্ষা করে থাকি, তার মধ্যে প্রথম হলো থাইরয়েডের হরমোন। টিথ্রি, টিফোর, ফ্রি টিথ্রি, থ্রিটিফোর এবং থাইরয়েড হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে টিএসএইচ- এই হরমোনগুলোর আমরা করে থাকি।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণ তেজস্ক্রিয় আয়োডিন রোগীকে খাওয়ানোর পরে, নির্দিষ্ট সময় পরে কত শতাংশ আপটেক হচ্ছে থাইরয়েড গ্রন্থিতে এটি দেখি। দেখে আমরা বলতে পারি এর কার্যকারিতা কম, না কি বেশি। যেমন : হাইপার থাইরয়েডিজমে আপটেকটা বেড়ে যাবে। হাইপো থাইরয়েডিজমে কমে যাবে।

তারপর আমরা থাইরয়েডের স্ক্যান করি। এখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেজস্ক্রিয় আয়োডিন আমরা রোগীকে দেই। মুখে দেই, কিছু ইনজেকশনের মাধ্যমে দেই। এটি দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় পরে আমরা গামা ক্যামেরা দিয়ে স্ক্যান করি। গামা ক্যামেরা হলো এমন একটি ক্যামেরা যে গামা-রে নিতে পারে। যেহেতু আমরা তেজস্ক্রিয় আইসোটো রোগীকে রেডিয়েশন দিয়েছি, এখান থেকে গামা-রে নির্গত হচ্ছে।

এখন এই গামা ক্যামেরা গামা-রে-কে তুলে নেবে। করে পরবর্তীকালে ছবি হিসেবে আমাদের দেবে। এখন স্ক্যানের মাধ্যমে আমরা দেখব থাইরয়েড গ্রন্থিটা বড় কি না। তার অবস্থানটা ঠিক আছে কি না। তার কার্যক্রম ঠিক আছে কি না।

আর যদি কোনো নডিউল থাকে, এর কার্যকারিতা কেমন সেটি দেখব। অর্থাৎ নিডিউলটা কাজ করছে, নাকি কাজ করছে না। এই সব কিছুই আমরা এর মাধ্যমে দেখতে পারব।

প্রশ্ন : আপনারা যেসব পরীক্ষা করে থাকেন এগুলো তো প্যাথলোজিতেও করা হয়। তাহলে প্যাথলোজির সাথে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের এই পরীক্ষাগুলোর পার্থক্য কী?

উত্তর : প্যাথলোজিতে যেটা হচ্ছে সেটাও ভালো। আমাদেরটা নিজস্বতা হলো এখানে আমরা রেডিওআইসোটোপ ব্যবহার করে পরীক্ষা করি।

প্রশ্ন : তাতে লাভ কী হচ্ছে?

উত্তর : এটি খুব স্পর্শকাতর। আমরা আয়োডিন ওয়ান টুয়েন্টিফাইভ ব্যবহার করি। অনেক পর্যায় আছে এই পরীক্ষায়। এরপর আমরা যেই ফলাফল পাই, সেটি অনেক স্পর্শকাতর ফলাফল এবং নির্ভল ফলাফল। নিউক্লিয়ার মেডিসিনের মাধ্যমে এর পরীক্ষা হলে এটি নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
প্রশ্ন : এই ক্ষেত্রে আপনি বলছিলেন যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ দেন। তেজস্ক্রিয় নাম শুনলেই তো আমাদের ভয় ভয় লাগে। এতে কোনো ক্ষতি হতে পারে কি?

উত্তর : আমরা যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করি, এটি পরিমাণে খুবই কম। যদি বলি যে, থাইরেড স্ক্যানে আমরা যেটুকু তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করছি সেটি খুবই কম। এতে ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই।

প্রশ্ন : হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপার থাইরয়েডিজমের বেলায় কী চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের কোনো প্রভাব রয়েছে?

উত্তর : হাইপোথাইরয়েডিজমে চিকিৎসা হলো থাইরয়েড হরমোন। এবং এই চিকিৎসা যেকেউই করতে পারে। একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, একজন এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট এবং একজন নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। এটা সবাই করতে পারে। এখানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের আলাদা করে কোনো ভূমিকা নেই। তবে যখন হাইপার থাইরয়েডিজমের বিষয়টি আসে, সেখানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

হাইপার থাইরয়েডিজম বিভিন্ন রকমের হয়, হাইপার থাইরয়েডিজমের চিকিৎসা হচ্ছে অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ। যেটি থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতাকে কমিয়ে দেবে। ওষুধের পাশাপাশি সার্জারি করা যেতে পারে। যেহেতু গ্রন্থিটি বেশি কাজ করছে, তাই কিছু অংশ কেটে কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে এবং রেডিও আয়োডিন থেরাপি, আমরা নিউক্লিয়ার মেডিসিনে ব্যবহার করি। এর ভূমিকা খুবই ভালো। যখন অ্যান্টি থাইরয়েড ওষুধ ব্যবহার করা হয়, এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুই বছর ব্যবহার করা হয়। তার পর এই ওষুধ তাকে বন্ধ করে দিতে হবে। রোগী যদি স্বাভাবিক থাকে, খুব ভালো কথা, তবে যদি আবারও হয় এই ওষুধ দিয়ে তাকে চিকিৎসা করার কোনো সুযোগ নেই। রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন দিয়ে হাইপার থাইরয়েডিজমের ভালো চিকিৎসা হয়।
 

 

 

 

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 78 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ