দ্রুত ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের মজুদ

Print

%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a4-%e0%a6%ab%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%87দ্রুত ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের মজুদ। সঙ্কট মোকাবেলায় সক্ষমতার বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে বড় খনিগুলো থেকে। এতে করে ঝুঁকির মুখে রয়েছে এসব খনিগুলো। এই হারে গ্যাস উত্তোলন হলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমস্যা আরও প্রকট হবে। এমন অবস্থায় নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে একরকম ভাটাই চলছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স বিভিন্ন কারণে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে পারছে না। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানির অব্যাহত মূল্য পতনে সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোরও আগ্রহ আগের মত নেই।
পরিস্থিতি এমন যে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট গ্যাসের অর্ধেকেরও বেশি গ্যাস যে কোম্পানিটি উত্তোলন ও সরবরাহ করছে সেই মার্কিন প্রতিষ্ঠান শেভরনই তার স্বার্থ বিক্রি করে এদেশ থেকে চলে যেতে চাচ্ছে। অথচ এখনও বিদেশি কোম্পানির ওপরই অতিনির্ভর হয়ে আছে দেশের গ্যাস উৎপাদন। কুমিল্লার শ্রীকাইলে গ্যাসের অনুসন্ধান পাওয়া গেলেও তা এখনও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মত পরিস্থিতি হয়নি।
সাগরের ১১ নম্বর ব্লকে তেল পাওয়ার সম্ভাবনা পেট্রোবাংলা বলে আসছে। এ ব্লকটি চট্টগ্রামের উপকূল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। ওপারে মিয়ানমার তাদের অংশে গ্যাস উত্তোলন করছে। ভোলায় ত্রিমাত্রিক জরিপ চালালে সেখানকার পৌরসভাসহ সদর এলাকায় গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নোয়াখালীর সুন্দলপুরে গ্যাস পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও এখন পর্যন্ত গ্রিডে যুক্ত করার মত অবস্থা তৈরি হয়নি। আর ঢাকার অদূরে রূপগঞ্জের গ্যাস গ্রিডে নিতে এখন পর্যন্ত পাইপ লাইন নির্মাণের অনুমোদনই মিলেনি।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন করছে বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। শেভরন বর্তমানে বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার এবং জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। প্রতিষ্ঠানটি কেবল বিবিয়ানা থেকেই দৈনিক ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করছেÑ যা দেশের দৈনিক মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক। কিন্তু বিবিয়ানার অর্ধেক গ্যাস এর মধ্যেই তোলা হয়ে গেছে। দ্রুত কমে যাচ্ছে বিবিয়ানার মজুদ।
সরকারের হিসাবমতে, বর্তমানে দেশে ২১টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন কার্যক্রম চলছে। এগুলোর দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উত্তোলন করা হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যা মোট উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ৯৯ শতাংশ। ২১টি ক্ষেত্রের মধ্যে নয়টি থেকে আবার সক্ষমতার পুরোটা বা অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। সক্ষমতার অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে যেকোনো সময় গ্যাসক্ষেত্রগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কূপ থেকে সক্ষমতার অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করা হলে ভূ-অভ্যন্তরে গ্যাসস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে নষ্ট হয় গ্যাস উত্তোলনের স্বাভাবিক প্রবাহ। ফলে গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন মেয়াদ কমে যায়। নির্ধারিত সময়ের আগেই ক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এমনকি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলায় জাতীয় গ্রিডে যেখানে নতুন করে গ্যাস যুক্ত হওয়া প্রয়োজন, সেখানে চলছে প্রতিবন্ধকতা। রূপগঞ্জের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নিতে পাইপ লাইন নির্মাণ করা প্রয়োজন। জানা গেছে, এই পাইপ লাইনটি নির্মাণে সড়ক ও জনপথের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু মাসের পর মাস চেষ্টা করেও অনুমোদন মিলছে না। জ্বালানি বিভাগ এ নিয়ে গলদঘর্ম। একাধিক বৈঠকও করেছে। কিন্তু সুফল আসেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এজন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় চেয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
গ্যাস নিয়ে ঢাকায় যেখানে সঙ্কট দানা বেঁধেছে; সেখানে রূপগঞ্জের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে কেন অনুমোদন মিলছে নাÑ তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপটা এখন অপরিহার্যই হয়ে পড়েছে বলে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারাও মনে করেন।
এ ব্যাপারে তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মীর মসিউর রহমান বলেন, পাইপ লাইনটি নির্মাণে সড়ক ও জনপথের অনুমতি প্রয়োজন। চেষ্টা করেছি তাদের অনুমোদন আদায়ে কিন্তু তা এখনও পাওয়া যায়নি।
বাপেক্সের পরিকল্পনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের মধ্যে এই প্রকল্পর কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনও এই প্রকল্পর কাজ শেষ হয়নি। রূপগঞ্জকে ২০১৪ সালের ২২ জুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করে পেট্রোবাংলা।
আকারে খুব বেশি বড় না হলেও দেশের ২৬তম গ্যাস ক্ষেত্রটির জরিপ শেষ করে আবারও কূপ খনন করা যায় কি না তা বিবেচনা করার কথাও অতীতে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।
ঢাকার অদূরে ২০১৪ সালে গ্যাস পাওয়ায় আশার আলো দেখা দেয়। তখন বলা হয়েছিল, নারায়ণগঞ্জের গ্যাসের সংকট নিরসন করবে রূপগঞ্জ গ্যাস ক্ষেত্র। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আড়াই বছরেও রূপগঞ্জের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। বিশেষ করে, প্রকল্পের সব কাজ ঠিকঠাক শেষ হলেও পাইপ লাইন নির্মাণ নিয়ে জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, গ্যাস ক্ষেত্রটি পূর্বাচল আবাসিক এলাকায়। এখান থেকে গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণ করতে হলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন পড়বে। পাইপ লাইনটি সড়ক এবং জনপথ বিভাগের জায়গা দিয়ে নির্মাণ করা হবে। অনেক চেষ্টা করেও অনুমতি যোগাড় করতে পারেনি তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বিভাগকে বিষয়টি জানায় তিতাস।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, কোনভাবেই জ্বালানি বিভাগও অনুমতি আদায় না করতে পারায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়কে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আতিকুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের সব কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু পাইপ লাইন নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, মজুদ নিশ্চিত হওয়ার জন্য রূপগঞ্জে ভূকম্পন জরিপ করা হবে। আপাতত এখান থেকে দৈনিক এক কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বাপেক্স সূত্র জানায়, রূপগঞ্জে প্রায় তিন হাজার ৬০০ মিটার গভীর অনুসন্ধান কূপের শেষ দিক থেকে গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে তিন হাজার ৩০০ মিটার গভীরে গ্যাসের আরেকটি স্তর রয়েছে। ওই স্তরটি ছয় মিটার পুরত্বের। সেখানে আরও গ্যাসের মজুদ রয়েছে। সঙ্গত কারণে তৃতীয়মাত্রার জরিপ শেষে আরও কূপ খনন করলে বেশি পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জ শিল্প এলাকা। এখানে বড় বড় গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের শিল্প মালিকরা প্রায় গ্যাসের নিম্ন চাপের অভিযোগ করেন। রূপগঞ্জ ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হলে নিম্নচাপের সমস্যা নিরসন করা সম্ভব।
বাপেক্স ২০১০ সালে রূপগঞ্জে দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ চালায়। এতে সেখানে গ্যাসের অস্তিত্ব থাকার বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। ২০১৪ সালে অনুসন্ধান কূপ খনন করে গ্যাস আবিষ্কার করা হয়।
২০১৫ সালেই এখানে তৃতীয়মাত্রার জরিপ চালিয়ে আরও কূপ খনন করার কথা ছিল। কিন্তু আড়াই বছরেও সরবরাহের জন্য পাইপ লাইন নির্মাণ করতে না পারায় ঝুলে গেছে সব প্রকল্প।
এ ব্যাপারে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, সক্ষমতার অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন করলে গ্যাসক্ষেত্রের রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহার সম্ভব নাও হতে পারে। সক্ষমতার অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন যাতে না হয়, সে ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো উচিত। একইসাথে গ্যাসের সঙ্কট মোকাবেলায় নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করতে হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 41 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ