নিরাপত্তায় হিন্দু-মুসলমানের রাত জেগে পাহারা

Print

%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%ae%e0%a6%beনাসিরনগরে রাতে নিরাপত্তায় হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানরাও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। যে কোনো মূল্যে যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট না হয় তার জন্যই এ উদ্যোগ। তাদের অঙ্গীকার, ধর্মীয় উš§াদনা প্রতিহত করা হবে। নাসিরনগরে জেলেপাড়ার আতঙ্ক কাটাতে গতকাল শনিবার সকালে নাসিরপুরে আঠাউরী বিলে বার্ষিক জেলে বাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে নাসিরনগরে ঘটনায় সব তদন্ত প্রতিবেদন জনতার সামনে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা কাজী মামুনুর রশিদ। শনিবার সকালে নবীনগরের কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির পরামর্শ সভায় তিনি এ কথা বলেন।
নিরাপত্তায় রাত জগে পাহারা: চোর, ডাকাত কিংবা পুলিশের ভয়ে নয়। গ্রামবাসী দল বেঁধে লাঠি, বাঁশি ও টর্চলাইট হাতে রাত জেগে মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর পাহারা দেন সম্প্রীতি নিশ্চিত রাখতে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রাত জাগার এই ঘটনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরের বিভিন্ন গ্রাম ও পাড়া-মহল্লার। সঙ্গে প্রতিদিন রাতভর পুলিশ ও বিজিবি সদ্যরাও টহল দিচ্ছে। এটি এখন নাসিরনগরের প্রতিদিনের রাতের চিত্র।
ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র করে পোস্ট দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৩০ অক্টোবরে দুষ্কৃতকারীরা নাসিরনগর উপজেলা সদরে তাণ্ডব চালায়। এ সময় দুষ্কৃতকারীরা উপজেলার অন্তত ১০টি মন্দির ও শতাধিক ঘর-বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এরপর ৪ নভেম্বর ভোরে ও ১৩ নভেম্বর ভোরে দুষ্কৃতকারীরা আবারো উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়েরর অন্তত ৬টি ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এসব ঘটনায় নাসিরনগর থানায় পৃথক সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় এখন পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ দেখে ৯৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
স্থানীয় পাহারাদার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা সদরের বণিকপাড়ায় আটজন করে ১২টি দল, পূর্বপাড়ায় আটজনের আটটি দল, দত্তপাড়ায় দশজনের ৭টি দল, মহাকালপাড়ায় সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত ১২টা এবং ১২টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত দুই শিফটে ছয়জন করে ১২টি দল, কাশিপাড়ায় ১২ জন করে ৬টি, ঋষিপাড়ায় গৌর মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের ৮টি দল, পশ্চিম পাড়ায় আটজনের ১০টি দল, ঘোষপাড়ায় ১২ জনের আটটি দল, গাঙ্গলপাড়ায় সাত সদস্যের ১১টি দল, আনন্দপুরে ১০ সদস্যে ছয়টি ১০ দল পাহারা দিচ্ছে।
শুক্রবার রাতে দেখা যায় দত্তপাড়া মন্দিরের বাইরে পুলিশ সদস্যরা বসে আছেন। এর পাশেই বিজিবির একটি টহল দল। এদিকে গৌর মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকতেই আর্মড পুলিশের একটি তাঁবু চোখে পড়ে। আর্মড পুলিশের সদস্যরা জানান, তিনজন সদস্য বিকেল ৪টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত পাহারার দায়িত্বরত আছে। পরে অন্য দল আসবে।
শুক্রবার রাতে দত্তপাড়ায় আটজন পাহাড়ায় ছিলেন। এর মধ্যে সাতজন মুসলমান। দলের নেতৃত্ব দেয়া মো. দুলাল বলেন, রাত ১২টার পর থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত আমরা দুটি দলে ভাগ হয়ে পাহারা দেই। তারা আরো জানান, এলাকায় অপরিচিত লোক দেখলে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করি।
দাসপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় ছয়জনের একটি দল পাহারা দিচ্ছে। পালাক্রমে এখানে দল বেঁধে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত পাহারা দেয়া হয়।
দাসপাড়ার জয়নগর এলাকায় ছয়জনের একটি দল ও পশ্চিমপাড়ার চেংগাপুর মহল্লায় আটজনের একটি দলকে পাহারা দিতে দেখা গেছে। তারা বলেন, মহল্লার বিভিন্ন দিকে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ঘোরাফেরা করেন। বাঁশি বাজিয়ে সতর্কবাণী দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ নিজ নিজ উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে এসেছে। কিছু মহল্লায় প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোররাত পাঁচটা পর্যন্ত আবার কোথাও রাত এগারটা হতে থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত এলাকাবাসী পাহারা দিয়ে আসছে।
জেলেদের আতঙ্ক কাটাতে হাওরে জেলে বাইচ অনুষ্ঠিত: এদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও মন্দির ভাঙচুর ঘটনার ২৮ দিন পার হয়েছে। স্থানীয় জেলেদের কাজের উৎসাহ দিতে হাওরে গতকাল শনিবার দুপুরে বার্ষিক জেলে বাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নাসিরনগরে নাসিরপুরে আঠাউরী বিলে আয়োজিত জেলে বাইচে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান, জেলেদের সংগঠন ভিটাডুবি দিবর সমবায় সমিতির সভাপতি কালী চরণ দাসের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলী, নাসিরনগর থানার ওসি আবু জাফর ও ভিটাডুবি দিবর সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শিশির দাস প্রমুখ। জেলে বাইচে হাওরের আঠাউরী বিলে শত শত জেলে নৌকা দিয়ে মাছ ধরার উৎসব পালন করছেন। তবে স্থানীয় জেলেরা মনে করছে ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে যে তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে জেলে বাইচকে ঘিরে তাদের মনে আঘাত কিছু হলেও দূর হয়েছে।
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান সাংবাদিকদের জানান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য এই জেলে বাইচ গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পাশপাশি তিনি আরো জানান, নাসিরনগরে যে আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছি এই জেলে বাইচ তার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তদন্ত প্রতিবেদন জনতার সামনে প্রকাশ করার আহ্বান জাপার: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা কাজী মামুনুর রশিদ নাসিরনগরের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জনতার সামনে প্রকাশ করার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি আরো বলেন, তদন্ত রিপোর্ট যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার জন্যও তিনি তদন্ত কমিটিগুলোকে অনুরোধ করেন। গতকাল শনিবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে কৃষ্ণনগর ইউপি জাতীয় পার্টির পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নবীনগর উপজেলা জাতীয় পার্টি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রজব আলী মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক মুসলেহ উদ্দিন মৃধা, উপজেলা জাতীয় পার্টির সমন্বয়কারী এটিএম আবদুল্লাহ মাস্টার প্রমুখ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 42 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ